• শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ০৮:৪৮ অপরাহ্ন
Headline
আলিয়ঁসে আজ শুরু হলো যৌথ চিত্রপ্রদর্শনী ‘ত্রিবন্ধন’ পুশ-ইন ইস্যুতে বাংলাদেশ-ভারত আলোচনা চলছে: ভারতীয় হাইকমিশনার দিল্লিতে যৌথ সংবাদ সম্মেলন ছাড়াই শেষ বিজিবি-বিএসএফ বৈঠক আকাশচুম্বী টিকিটের দাম: বিশ্বকাপের ফাঁকা গ্যালারি নিয়ে উদ্বেগ শ্রমিকের হাহাকারে মালিকদের বিপুল ভাগ্য ট্রাম্পের যুদ্ধ থামানোর সিদ্ধান্তে হতবাক নেতানিয়াহু, জানতেন না কিছুই! ট্রাম্পের নতুন মধ্যপ্রাচ্য শান্তি পরিকল্পনা ও সমঝোতার নেপথ্য কথা ইরানের সঙ্গে কাতারের গোপন আঁতাত! ফাঁস করল ওয়াশিংটন পোস্ট ছুটির দিনের বিকেলে রাজধানীতে স্বস্তির বৃষ্টি, ভোগান্তিতে পথচারী সম্মিলিত পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীদের আশ্বস্ত করলেন গভর্নর

ভরাডুবির পর তৃণমূল কংগ্রেসে ভাঙন-সংকেত

Reporter Name / ১৭ Time View
Update : বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে অনাকাঙ্ক্ষিত ও শোচনীয় ভরাডুবির এক মাস পার হতে না হতেই রাজ্য রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। প্রায় দেড় দশক ধরে একটানা পশ্চিমবঙ্গের শাসনক্ষমতায় থাকা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) অন্দরে চরম অসন্তোষ, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং ভাঙনের স্পষ্ট আলামত দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায় ও শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে একাধিক নেতার প্রকাশ্য বিদ্রোহ এবং প্রভাবশালী দুই বিধায়ককে বহিষ্কারের ঘটনা দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

বিধায়ক বহিষ্কার ও অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের জন্য তৈরি একটি প্রস্তাবনা পত্রে বিধায়কদের স্বাক্ষর নিয়ে এক জটিল বিতর্কের সূত্রপাত হয়। উক্ত নথিতে বিধায়কদের সইয়ের ক্ষেত্রে চরম অসন্তোষ ও জালিয়াতির মতো গুরুতর অসঙ্গতির অভিযোগ তোলেন দলেরই দুই নবনির্বাচিত বিধায়ক ঋতব্রত ব্যানার্জী ও সন্দীপন সাহা। এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব কঠোর অবস্থান নেয় এবং ‘দলবিরোধী কার্যকলাপে’ লিপ্ত থাকার অভিযোগে সোমবার এই দুই বিধায়ককে দল থেকে সরাসরি বহিষ্কার করে।

তবে দল থেকে এই বহিষ্কারের পর তৃণমূলের ভেতরে চাপা থাকা ক্ষোভ ও অসন্তোষ আরও প্রকট রূপ ধারণ করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলের একটি বড় অংশ এখন প্রকাশ্যেই নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ‘বিদ্রোহী’ হয়ে উঠছে। এই অনুমানের বড় প্রমাণ মেলে গত রবিবার মমতা ব্যানার্জীর ডাকা এক জরুরি বৈঠককে কেন্দ্র করে। নির্বাচনের পর দলের ভেতরের পরিস্থিতি সামাল দিতে মমতা ব্যানার্জী নবনির্বাচিত ৮০ জন বিধায়ককে নিয়ে এক বিশেষ সভা আহ্বান করেছিলেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সেই বৈঠকে ৮০ জনের মধ্যে মাত্র ২০ জন বিধায়ক উপস্থিত হন, যা দলের অভ্যন্তরে শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি চরম অনাস্থা ও বড় ধরনের ফাটলের ইঙ্গিত দেয়।

‘সই বিতর্ক’ ও সিআইডি তদন্ত

তৃণমূলের অন্দরের এই সংকটের মূল সূত্রপাত গত ৬ মে মমতা ব্যানার্জীর বাসভবনে আয়োজিত বিধায়কদের একটি বৈঠককে কেন্দ্র করে। নিয়ম অনুযায়ী, বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা, উপ-দলনেতা এবং মুখ্য সচেতকের নাম চূড়ান্ত করে সমস্ত বিধায়কের স্বাক্ষরসহ একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবনাপত্র স্পিকারের কাছে জমা দেওয়ার কথা ছিল। পরবর্তীতে ১৯ মে কালীঘাটে পুনরায় একটি বৈঠক ডাকা হয়, যেখানে অনেক বিধায়কই অনুপস্থিত ছিলেন。 অভিযোগ উঠেছে, দলের পক্ষ থেকে বিধায়কদের চাপ দেওয়া হয়েছিল যেন তারা ১৯ মে-র বৈঠকে উপস্থিত না থাকলেও প্রস্তাবনাপত্রে পেছনের তারিখ অর্থাৎ ৬ মে লিখে স্বাক্ষর করেন।

বহিষ্কৃত বিধায়ক ঋতব্রত ব্যানার্জী এ প্রসঙ্গে জানান যে, সংবিধানে শপথ নেওয়া একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি এই অনৈতিক কাজ মেনে নিতে পারেননি। তাঁর দাবি, নথিতে এমন অনেক বিধায়কের সই ব্লক লেটারে করা ছিল, যাঁরা আদতে ওই বৈঠকে উপস্থিতই ছিলেন না। এই সই জালিয়াতির বিষয়টি ঋতব্রত ও সন্দীপন সাহা সরাসরি বিধানসভার স্পিকারের কাছে গিয়ে লিখিতভাবে অভিযোগ আকারে জানান।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কলকাতার হেয়ার স্ট্রিট থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়, যার তদন্তের দায়িত্ব পরবর্তীতে রাজ্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) দেওয়া হয়েছে। এই মামলার সূত্র ধরে সিআইডি তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক ও মমতা ব্যানার্জীর ভাইপো অভিষেক ব্যানার্জীকে তলব করলেও সোমবার তিনি ‘শারীরিক অসুস্থতার’ অজুহাতে হাজিরা এড়িয়ে যান।

নেতৃত্বের দিকে ওঠা আঙুল ও নেত্রীর প্রতিক্রিয়া

নির্বাচনে পরাজয়ের পর থেকেই তৃণমূলের সাধারণ কর্মী থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরের মুখপত্র, প্রভাবশালী নেতা ও বিধায়কেরা দলের শীর্ষ পরিচালনা পর্ষদ এবং বিশেষ করে অভিষেক ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন। দলের অনেক নেতারই অভিযোগ, অভিষেক ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে অতীতে ওঠা বিভিন্ন অনিয়ম ও স্বৈরাচারী সিদ্ধান্তের বিষয়ে খোদ মমতা ব্যানার্জী কোনো পদক্ষেপ নেননি এবং পরিবারের স্বার্থে চোখ বন্ধ রেখেছিলেন।

বিদ্রোহী নেতাদের এই আক্রমণের জবাবে দলটির প্রধান মমতা ব্যানার্জী ফেসবুক লাইভে এসে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি দাবি করেন, তৃণমূল কংগ্রেসকে বাইরে থেকে ভেঙে ফেলা কখনোই সম্ভব নয়। বহিষ্কৃত নেতা ঋতব্রত ব্যানার্জীর অতীত মনে করিয়ে দিয়ে তিনি কটাক্ষ করে বলেন যে, তিনি একসময় সিপি(আই)এম করতেন এবং দল থেকে বহিষ্কারের পর তৃণমূলের পায়ে এসে পড়েছিলেন。 তাঁকে প্রার্থী করা তৃণমূলের একটি মস্ত বড় ভুল ছিল। দলের অপর এক নেতা কুণাল ঘোষও কড়া সমালোচনা করে বলেন, দল যখন ক্ষমতায় ছিল তখন সব ভালো ছিল, আর আজ ক্ষমতা চলে যেতেই দল খারাপ হয়ে গেল—এমন মানসিকতার নেতাদের দলে কোনো প্রয়োজন নেই।

বিপরীতে, বহিষ্কৃত বিধায়ক সন্দীপন সাহা জানিয়েছেন, দলে নৈতিকতার কথা বললেই দলবিরোধী তকমা দেওয়া হয়। তবে নৈতিক ও সঠিক কাজ করার জন্য দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ায় তাঁর কোনো আক্ষেপ নেই। অন্যদিকে ঋতব্রত ব্যানার্জী জানান, দল তাঁকে বহিষ্কার করলেও নেত্রী হিসেবে মমতা ব্যানার্জীর প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা অটুট থাকবে।

মহারাষ্ট্রের মতো পরিস্থিতির জল্পনা ও বিজেপির অবস্থান

তৃণমূলের এই করুণ অবস্থার সুযোগ নিয়ে বিরোধী দলগুলো তীব্র আক্রমণ শুরু করেছে। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, তৃণমূল কংগ্রেস কার্যত এখন একটি অস্তিত্বহীন এবং বিলুপ্তপ্রায় রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন তীব্র জল্পনা চলছে যে, তৃণমূলের একটি বড় অংশ দলত্যাগ করে নতুন কোনো মঞ্চ তৈরি করতে পারে।

পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতা তাপস রায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক বিস্ফোরক পোস্টে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তৃণমূল কংগ্রেসের অবস্থা বর্তমান ভারতের মহারাষ্ট্রের রাজনৈতিক দলগুলোর মতো হতে যাচ্ছে, যেখানে মূল দল ভেঙে নতুন সরকার বা গোষ্ঠী তৈরি হয়েছিল। তিনি দাবি করেন, প্রায় ৫০ জন তৃণমূল বিধায়ককে সঙ্গে নিয়ে ঋতব্রত ব্যানার্জী স্পিকারের কাছে পৌঁছে গেছেন এবং দল এখন পুরোপুরি চুরমার হওয়ার পথে। তবে ঋতব্রত ব্যানার্জী এই জল্পনাকে উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন যে, তিনি এবং সন্দীপন সাহা কেবল নিজেদের নৈতিক অবস্থান থেকে স্পিকারের কাছে গিয়েছিলেন, অন্য কোনো বিধায়ক ভাঙনের উদ্দেশ্যে তাঁদের সাথে ছিলেন না।

তৃণমূলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোন পথে?

দুই বিধায়ককে বহিষ্কারের পর বিধানসভায় তৃণমূলের বিধায়ক সংখ্যা ৮০ থেকে কমে বর্তমানে ৭৮-এ এসে দাঁড়িয়েছে। দলত্যাগ বিরোধী আইন এড়াতে এবং বিধানসভায় নতুন করে শক্তিশালী কোনো দল গঠন বা বিরোধী দলনেতার পদ দাবি করতে হলে তৃণমূলের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ৫৩ জন বিধায়কের একযোগে দল ছাড়তে হবে।

কলকাতার প্রবীণ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূলের এই সংকটের পেছনে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শগত লড়াই নেই। দলটি সম্পূর্ণভাবে নেত্রী মমতা ব্যানার্জী-কেন্দ্রিক এবং তাঁর একক জনপ্রিয়তার ওপর ভর করেই এত বছর টিকে ছিল। কিন্তু নিজের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ভবানীপুর আসনে খোদ মমতা ব্যানার্জীর শোচনীয় পরাজয়ের পর দলের কর্মীরা সম্পূর্ণ দিশেহারা ও মনোবলহীন হয়ে পড়েছেন।

যদিও তৃণমূলের ৪২ জন সংসদ সদস্য এবং রাজ্যে ৪১ শতাংশের বিশাল ভোট ব্যাংক এখনো রয়েছে, তবুও নেত্রীর ব্যক্তিগত পরাজয় দলের ভেতরের এই ভাঙনকে চরমভাবে উস্কে দিয়েছে। বিজেপির পক্ষ থেকে অবশ্য জানানো হয়েছে যে, অন্য দল থেকে আসা কোনো ‘বিদ্রোহী’ নেতাকে তারা এই মুহূর্তে নিজেদের দলে স্থান দেবে না। ফলে তৃণমূলের ক্ষুব্ধ বিধায়কেরা দল ছেড়ে নতুন কোনো আঞ্চলিক জোট তৈরি করেন নাকি মমতা ব্যানার্জী তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিশমা দিয়ে এই মহাবিপর্যয় সামাল দিতে পারেন, তা-ই এখন দেখার বিষয়।

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category