• বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ০৪:০১ অপরাহ্ন

অলস অর্থ নিয়ন্ত্রণে সরকারি কৌশলী উদ্যোগ

Reporter Name / ২ Time View
Update : বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬

সরকারি অর্থের প্রবাহে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং দীর্ঘদিনের সমন্বয়হীনতা দূর করতে বড় ধরনের সংস্কারের পথে হাঁটছে সরকার। বর্তমানে সরকারি বিভিন্ন দপ্তর, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা এবং স্থানীয় সরকারের অধীনে থাকা প্রায় ১৯ হাজার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট কেন্দ্রীয় ট্রেজারি সিঙ্গেল অ্যাকাউন্ট (টিএসএ) কাঠামোর বাইরে রয়ে গেছে। প্রত্যক্ষ নজরদারির বাইরে থাকা এসব অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে লেনদেনে স্বচ্ছতার অভাব এবং অর্থ অপচয়ের ঝুঁকি থাকায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শে সরকার এসব অর্থ একক কাঠামোর আওতায় আনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের এই বিশাল সংখ্যক অ্যাকাউন্ট কেন্দ্রীয় ট্রেজারি কাঠামোর বাইরে থাকায় সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। একদিকে সরকারের মূল ট্রেজারিতে তারল্য সংকট থাকায় সরকারকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে বছরের পর বছর ধরে বিপুল পরিমাণ অর্থ অলস পড়ে থাকছে। এই বৈপরীত্য দূর করতে এবং করদাতার অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে অর্থ বিভাগ থেকে সম্প্রতি কঠোর পরিপত্র জারি করা হয়েছে।

নির্দেশনা অনুযায়ী, সব সরকারি দপ্তরকে তাদের বাণিজ্যিক ব্যাংক অ্যাকাউন্টে থাকা পুরো অর্থ আগামী ৩০ জুনের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল ‘টিএসএ’ অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করতে হবে। এছাড়া আগামী ১ জুলাই থেকে ম্যানুয়াল বা সনাতন চালান পদ্ধতি পুরোপুরি বাতিল করে শতভাগ ‘এ-চালান’ ব্যবস্থা কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব ও প্রাপ্তি সরাসরি কেন্দ্রীয় আইবাস প্লাস প্লাস প্ল্যাটফর্মে রিয়েল টাইমে যুক্ত হবে, যা অর্থ বিভাগকে প্রতিদিনের লেনদেন ও তারল্য পর্যবেক্ষণে সক্ষম করে তুলবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, কেবল ডিজিটাল সিস্টেমে লেনদেনের হিসাব রাখলেই হবে না, বরং অর্থের প্রকৃত মূল্যায়ন বা ‘ভ্যালু ফর মানি’ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি স্থানীয় সরকারের মাঠ পর্যায়ের তথ্যের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ডেটার মেলবন্ধন ঘটানোর ওপর জোর দিয়েছেন, যাতে খরচের কোনো বিচ্যুতি ঘটলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।

সাবেক মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী মনে করেন, দাতা সংস্থাগুলোর প্রজেক্টভিত্তিক আলাদা অ্যাকাউন্ট খোলার প্রথা বন্ধ করা জরুরি। তিনি বলেন, “বর্তমানে দাতারা বাজেট সহায়তার অর্থ মূল ট্রেজারিতে দিচ্ছে, যা ইতিবাচক। কিন্তু বিভিন্ন প্রকল্পের নামে এখনও যেসব আলাদা অ্যাকাউন্ট চালু আছে, তা সরকারের নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকে দুর্বল করছে।” তার মতে, ধাপে ধাপে সব সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার লেনদেন একক ট্রেজারি কাঠামোর আওতায় আনা গেলে সরকারি ঋণের বোঝা কমানো এবং আর্থিক শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব।

সরকার মূলত তিন ধাপে এই সংস্কার বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করেছে। প্রথম ধাপে সরকারের নিজস্ব অফিসগুলোর (মন্ত্রণালয় ও ফিল্ড অফিস) অ্যাকাউন্ট টিএসএতে আনা হচ্ছে। দ্বিতীয় ধাপে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর অ্যাকাউন্টের প্রয়োজনীয়তা যাচাই করে অপ্রয়োজনীয়গুলো বন্ধ করে দেওয়া হবে। তৃতীয় ও চূড়ান্ত ধাপে দাতা সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পগুলোর বিশেষ অ্যাকাউন্টগুলোকে টিএসএ কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসার জন্য ইআরডি-এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দাতা সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া হবে।

অর্থ বিভাগের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ রাশেদুল আমীন জানিয়েছেন, প্রতি বছর এসব অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়ে থাকে। এই বিপুল অংকের অর্থ কেন্দ্রীয় ট্রেজারিতে চলে এলে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা কমে আসবে এবং মুদ্রাবাজারের ওপর চাপ হ্রাস পাবে। দীর্ঘদিনের এই বিচ্ছিন্ন আর্থিক কাঠামো ভেঙে একটি সমন্বিত ও শক্তিশালী আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আরও সুসংহত হবে বলে মনে করছেন নীতি-নির্ধারকরা। এখন দেখার বিষয়, ৩০ জুনের বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে সব দপ্তর এই নির্দেশনা কতটা কার্যকরভাবে পালন করে।

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category