• বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ০৩:১১ অপরাহ্ন

বেইজিংয়ে কি মিলবে তিস্তা প্রতীক্ষার সমাধান?

Reporter Name / ১ Time View
Update : বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চারদিনের গুরুত্বপূর্ণ চীন সফরকে ঘিরে ভূ-রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা। যদিও এই সফরের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে প্রকল্পটির নাম সরাসরি অন্তর্ভুক্ত নেই, তবুও বেইজিংয়ে চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে প্রকল্পটি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসতে পারে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে। তিস্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সংকট এবং এই অঞ্চলকে ঘিরে ভারত ও চীনের কৌশলগত অবস্থানের কারণে পুরো সফরটি এখন বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।

দীর্ঘদিন ধরেই তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে চীনের আগ্রহ রয়েছে। তবে ভারতের জন্য এই এলাকা অত্যন্ত সংবেদনশীল। তিস্তা অববাহিকা ভারতের ভূ-কৌশলগত ‘চিকেন নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডোরের অত্যন্ত কাছাকাছি হওয়ায়, সেখানে চীনের বড় কোনো উপস্থিতি বা প্রকল্প ভারতকে নিরাপত্তার খাতিরে উদ্বেগের মুখে ফেলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভারত কখনোই চায় না চীনের অর্থায়নে বা কারিগরি সহায়তায় এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হোক। অন্যদিকে, বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে ভারতের কাছ থেকে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়ার অপেক্ষায় থেকেও ব্যর্থ হয়েছে। এমন বাস্তবতায় তিস্তা প্রকল্প এখন কেবল উন্নয়নের ইস্যু নয়, বরং তা ভূ-রাজনৈতিক কৌশল ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

তিস্তা মহাপরিকল্পনার অর্থায়ন নিয়ে বর্তমানে সরকার ও বিশেষজ্ঞ মহলে দ্বিধাবিভক্ত মত রয়েছে। সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আগ্রহের কথা জানানো হয়েছে। তবে চীন বরাবরই অর্থায়নের প্রস্তাব দিয়ে আসছে। সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান সতর্ক করে দিয়ে বলেন, যদি প্রকল্পটি বিদেশি ঋণ নিয়ে বাস্তবায়িত হয় এবং তা থেকে সরাসরি আয় না আসে, তবে তা দেশের রিজার্ভ ও অর্থনীতির জন্য ঋণের বোঝা হয়ে উঠতে পারে। এছাড়া, প্রকল্পটির কারিগরি সক্ষমতা এবং পরিবেশগত প্রভাব নিয়েও গভীর পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চীনের ‘পাওয়ার চায়না’ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা হলেও ভারতের আপত্তির কারণে তা আলোর মুখ দেখেনি। তবে বর্তমান সরকারের কঠোর অবস্থান ও আত্মবিশ্বাস ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি জানিয়েছেন, বর্তমানে তিস্তা নদীতে ড্রেজিং, পানি সংরক্ষণ এবং নদী ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে কারিগরি সমীক্ষা চলমান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় গঠিত নয় সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটি প্রকল্পের কারিগরি ও বাস্তবায়নযোগ্য দিকগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সফরের সময় তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত হলেও, পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারের বিরোধিতার কারণে তা আজও স্বাক্ষরিত হয়নি। নরেন্দ্র মোদির সরকার একাধিকবার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা কার্যকর না হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা পরিণত হয় মরুভূমিতে, আর বর্ষায় দেখা দেয় বিধ্বংসী বন্যা। এই দীর্ঘ বঞ্চনা ও অনিশ্চয়তাই বাংলাদেশকে নতুন করে নিজস্ব মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে ঠেলে দিয়েছে।

চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ আব্দুর রহিম মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরে চীনের পক্ষ থেকে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে নতুন কোনো নিশ্চয়তামূলক প্রস্তাব আসতে পারে। তবে প্রকল্পটি কি শেষ পর্যন্ত চীনের সহায়তায় হবে, নাকি বাংলাদেশ নিজস্ব শক্তিতে তা বাস্তবায়ন করে দীর্ঘদিনের পানির সমস্যার স্থায়ী সমাধান করবে—সেই উত্তরের অপেক্ষায় আছে দেশবাসী। বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদও মনে করেন, অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নিজস্ব অর্থায়নেই তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা উচিত, কারণ নদীর ওপর যাদের স্বার্থ জড়িত, তাদের ওপর ভরসা করাটা ঝুঁকিহীন নয়।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই চীন সফর শেষ পর্যন্ত তিস্তা প্রকল্পের বিষয়ে কোনো ঐতিহাসিক চুক্তিতে পৌঁছায়, নাকি বহুপাক্ষিক আলোচনার পথ প্রশস্ত করে—সেই কৌতূহল এখন সর্বত্র। সবাই এখন তাকিয়ে আছে বেইজিংয়ের দিকে, যেখানে বাংলাদেশের জল-স্রোত ও সার্বভৌমত্বের ভবিষ্যৎ নিহিত।

তথ্যসূত্র: যুগান্তর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category