• বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ০৩:১৬ অপরাহ্ন

কাগুজে মুদ্রার পরিবর্তে ক্যাশলেস লেনদেনের পথে দেশ

Reporter Name / ০ Time View
Update : বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬

ঘুষ, দুর্নীতি এবং কর ফাঁকি রোধে নগদ টাকার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে একটি আধুনিক ক্যাশলেস বা নগদবিহীন অর্থনীতির দিকে হাঁটছে বাংলাদেশ। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে বাংলাদেশ ব্যাংক সব ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার উদ্যোগ নিয়েছে। ‘বাংলা কিউআর’ নামে পরিচিত এই প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা গেলে একজন গ্রাহক কোনো ধরনের নগদ টাকা বহন না করেই দৈনন্দিন সব ধরনের লেনদেন সম্পন্ন করতে পারবেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় চলতি জুন মাসের মধ্যেই সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে এই বিশেষ ব্যবস্থার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, একটি দেশের অর্থনীতির স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা নিশ্চিত করতে ক্যাশলেস ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। বর্তমানে লেনদেনের জন্য সরকার প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কাগুজে নোট ছাপিয়ে বাজারে ছাড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এই নোট ছাপানো ও ব্যবস্থাপনার পেছনে সরকারকে অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়। যদি দেশের অধিকাংশ লেনদেন ক্যাশলেস বা ডিজিটাল মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, তবে এই বিশাল অঙ্কের অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। সেই অর্থ দেশের অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করা যাবে। তবে এই মহৎ উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করছে এর ব্যবহারিক সহজলভ্যতা এবং জনসাধারণের সচেতনতার ওপর।

বাংলা কিউআর ব্যবস্থায় লেনদেনের জন্য দুটি শর্ত বাধ্যতামূলক। প্রথমত, গ্রাহকের একটি সক্রিয় ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিক্রেতাকে ব্যাংক বা এমএফএস-এর মাধ্যমে নিবন্ধিত ‘বাংলা কিউআর’ এজেন্ট হতে হবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মুদি দোকান থেকে শুরু করে সবজি বাজার এবং বড় শপিং মল পর্যন্ত এই সেবা ছড়িয়ে দেওয়া গেলে ধীরে ধীরে ক্যাশলেস বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানকে আহ্বায়ক করে এ লক্ষ্যে একটি স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। গত সোমবার এই কমিটির প্রথম বৈঠকে গভর্নর সরকারি বিভিন্ন ফি ও চার্জ বাংলা কিউআরের মাধ্যমে গ্রহণ করার প্রস্তাব দিয়েছেন, যা এই উদ্যোগকে আরও জনপ্রিয় করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে এই ডিজিটাল বিপ্লবের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বৈষম্য। বর্তমানে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ এখনো প্রথাগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টের আওতার বাইরে। যদিও ব্যাংক খাতে ৪২ কোটির বেশি অ্যাকাউন্ট ও মোবাইল ওয়ালেট রয়েছে, কিন্তু এটি এক ধরনের পরিসংখ্যানগত বৈপরীত্য। প্রকৃতপক্ষে অনেক গ্রাহকের একাধিক অ্যাকাউন্ট থাকার কারণে এই সংখ্যাটি বড় মনে হয়। আবার এসব অ্যাকাউন্টের একটি বড় অংশ নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পড়ে আছে। গ্রাহকদের আর্থিক লেনদেনে অভ্যস্ত করানো এবং বিশেষ করে দিনমজুর ও প্রান্তিক মানুষকে ডিজিটাল প্রযুক্তির আওতায় আনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি অবশ্য কিছুটা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। রাজধানীর শপিং মলগুলোতে বিকাশ, নগদ বা রকেটের নিজস্ব কিউআর কোড দেখা গেলেও ‘বাংলা কিউআর’-এর উপস্থিতি এখনো সীমিত। এমনকি অতীতে যেসব ছোট ছোট চায়ের দোকান বা স্টেশনারি দোকানে বাংলা কিউআর কোড স্থাপন করা হয়েছিল, সেগুলোর অধিকাংশ এখন আর ব্যবহৃত হচ্ছে না। মতিঝিলের নূরুন্নবী স্টোরের মালিক জানালেন, একসময় কিছু গ্রাহক কিউআর কোড স্ক্যান করে বিল দিতেন, কিন্তু এখন সেই প্রবণতা প্রায় শূন্যের কোঠায়। দোকানের সাথে লাগানো পোস্টারটি ছিঁড়ে যাওয়ায় সেটি আর নতুন করে লাগানো হয়নি। একই চিত্র পাশের ছোট হোটেলগুলোতেও। মালিকরা বলছেন, তাদের কাছে আসা দিনমজুর শ্রেণির মানুষের ব্যাংক অ্যাকাউন্টই নেই, ফলে তারা এই প্রযুক্তিতে লেনদেন করতে পারে না।

এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো অবশ্য দাবি করছে, তারা সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিকাশের জনসংযোগ বিভাগের প্রধান শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম জানান, তারা নতুন করে কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা কিউআর কোড তৈরি করছেন না, বরং পুরনো কিউআর কোডগুলোকে দ্রুত ‘বাংলা কিউআর’-এ রূপান্তরের কাজ করছেন। আশা করা হচ্ছে, জুন মাসের মধ্যেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব প্রস্তুতি শেষ হবে। তারা চাইছেন দেশের প্রতিটি প্রান্তে যেন একটি কিউআর কোড দিয়ে সব ধরনের সেবা পাওয়া যায়।

ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরফান আলীর মতে, বাংলা কিউআর একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী উদ্যোগ। তিনি বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন সেবার জন্য গ্রাহককে নির্দিষ্ট এজেন্টের কাছে ছুটতে হয়। কিন্তু নতুন এই ব্যবস্থায় একজন এজেন্ট থেকেই সব প্রতিষ্ঠানের সেবা নেওয়া সম্ভব হবে। এটি গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি আনবে এবং ছোট ব্যবসায়ীদের নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করবে। একটি সাধারণ কিউআর কোড স্ক্যান করে গ্রাহক যেকোনো ব্যাংক বা এমএফএস থেকে টাকা পরিশোধ করতে পারবেন, যা গ্রাহকের ভোগান্তি কমিয়ে সেবার বিস্তৃতি ঘটাবে। তবে এর সফলতার জন্য শুধু কিউআর কোড স্থাপন করলেই চলবে না, বরং ব্যাপক প্রচারণার প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আর্থিক ডিজিটাল রূপান্তরের জন্য কেবল প্রযুক্তি সরবরাহ করাই যথেষ্ট নয়, বরং জনসচেতনতা তৈরি করা সমান জরুরি। গ্রাহক ও বিক্রেতা উভয়কেই এই প্রযুক্তির সুফল ও ব্যবহারবিধি সম্পর্কে শিক্ষিত করতে হবে। বিশেষ করে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগে মাঠ পর্যায়ে প্রচারণা চালাতে হবে। গভর্নর আগামী সপ্তাহে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শনের মাধ্যমে ছোট ব্যবসায়ীদের সচেতন করার পরিকল্পনা নিয়েছেন, যা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলা কিউআর ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো আর্থিক অন্তর্ভুক্তির হার বাড়ানো এবং নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা কমানো। যদি সরকার প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত ইন্টারনেট ও মোবাইল প্রযুক্তির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে পারে এবং এই ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা অর্জন করতে পারে, তবেই ক্যাশলেস অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে যাবে। দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের দুর্নীতিমুক্ত অর্থনীতি ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এক যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে। তবে এ পথে টিকে থাকতে হলে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা দূর করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

 

তথ্যসূত্র: কালের কণ্ঠ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category