রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বাসডুবির মর্মান্তিক ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এই হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনাটি ফেরিঘাটের চরম অব্যবস্থাপনা, জরাজীর্ণ পন্টুন এবং অরক্ষিত যাতায়াত ব্যবস্থার নগ্ন চিত্রকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করা এবং ঘাটের অবকাঠামোগত ত্রুটিই মূলত এই বিশাল প্রাণহানির প্রধান কারণ।
দুর্ঘটনার পর থেকে টানা অভিযানে বাসের ভেতর ও নদী থেকে ২৬ জনের নিথর দেহ উদ্ধার করেছেন ফায়ার সার্ভিস, নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের ডুবুরিরা। নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের একাধিক সদস্য থাকার খবর পাওয়া গেছে, যা পুরো এলাকায় শোকের ছায়া ফেলেছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে তাৎক্ষণিক ২৫ হাজার টাকা এবং আহতদের ১৫ হাজার টাকা করে সহায়তার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে জেলা প্রশাসন ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে পৃথক দুটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, যাদের তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
সরেজমিনে তদন্ত এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় দুর্ঘটনার বেশ কিছু ভয়াবহ কারণ উঠে এসেছে:
অরক্ষিত ও রেলিংবিহীন পন্টুন: ৩ নম্বর ঘাটের পন্টুনটি অত্যন্ত পুরোনো এবং এতে কোনো নিরাপত্তা বেষ্টনী বা রেলিং নেই। ফলে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর সরাসরি নদীতে পড়ে যায়। চালক ও শ্রমিকদের দাবি, রেলিং থাকলে হয়তো বাসটি আটকে যেত এবং এত মানুষের মৃত্যু হতো না।
বিপজ্জনক সংযোগ সড়ক: ঘাট এলাকা ও পন্টুন পর্যন্ত সংযোগ সড়কগুলো অত্যন্ত ঢালু এবং খানাখন্দে ভরা। ভারী যানবাহন নিয়ে এই ঢালু পথে নামার সময় অনেক সময় ব্রেক নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
ঘাট পরিচালনায় বিশৃঙ্খলা: নিয়ম অনুযায়ী ফেরি থেকে গাড়ি নামার পর নতুন গাড়ি ওঠার কথা থাকলেও, অনেক সময় আগে ওঠার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় যানবাহনগুলো। দুর্ঘটনার দিনও ‘হাসনাহেনা’ ফেরিটি প্রস্তুত হওয়ার আগেই বাসটি পন্টুনে চলে আসে এবং একটি ফেরির ধাক্কায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সরাসরি নদীতে তলিয়ে যায়।
বিআইডব্লিউটিসি-এর চেয়ারম্যান মো. সলিম উল্লাহ ঘাট পরিদর্শন শেষে জানান, পন্টুনগুলোতে দ্রুত রেলিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে এবং দায়িত্বরত কর্মীদের আধুনিক প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে। তবে স্থানীয় কর্মকর্তাদের কেউ কেউ একে ‘চালকের ভুল’ বা ‘ব্রেক ফেইল’ হিসেবে অভিহিত করছেন। অন্যদিকে, নিখোঁজদের স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে আছে দৌলতদিয়া ঘাট। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, নতুন করে কেউ নিখোঁজের তথ্য দিলে তাৎক্ষণিক উদ্ধার অভিযান আবারও শুরু করা হবে।