বড় দুলাভাইয়ের একজন সহকারী ছিলেন। আমরা ডাকতাম ‘জহির ভাই’। তিনি আমাদের খুব আদর করতেন। আমরাও তাঁকে খুব পছন্দ করতাম।
মেজ আপা তখন এইচএসসি পাশ করেছেন। একদিন জহির ভাই দুলাভাইকে বললেন, ‘ভাইজান, আমাদের গ্রামের একটি ছেলে আছে। আগে ব্যাংকে চাকরি করত, এখন ঢাকায় ব্যবসা করে। খুব ভালো ছেলে। তাদের পরিবারও খুব শিক্ষিত। এক ভাই বড় সরকারি অফিসার, আরেকজন ব্যাংকে ভালো চাকরি করে। আজুর জন্য ওকে দেখবেন নাকি? ( ‘আজু’-মেজ আপার ডাকনাম)
দুলাভাই তেমন পাত্তা দিলেন না। কিন্তু দেখা গেলো, জহির ভাই নাছোড়বান্দা। তিনি দুদিন পর পর একই কথা বলেন।
শেষ পর্যন্ত দুলাভাই জহির ভাইয়ের চাপাচাপিতে ছেলেকে দেখতে গেলেন এবং ফিরে এলেন অসম্ভব খুশি হয়ে। ছেলে নাকি খুব স্মার্ট এবং তার ব্যবহার অসাধারণ।
তিনি আব্বাকে প্রস্তাবটি দিয়ে বললেন, ‘ছেলে বিয়ের পর আজুকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াবে বলেছে।’
এভাবেই আমাদের পরিবারে মেজ দুলাভাইয়ের আগমন।
তাঁর যে ব্যাপারটি আমাদের খুব মুগ্ধ করেছিল, তা হলো, তিনি প্রথম দেখায় আব্বাকে বলেছিলেন, ‘আপনি অনুমতি দিলে, আমি শুধু পাঁচ থেকে ছয়জন পরিবারের সদস্যকে নিয়ে আপনার বাসায় আসব। সেদিনই বিয়ে হবে। বড় আয়োজনের বিয়ে আমার কাছে অপচয় মনে হয়।’
কয়েক দিন পর সত্যি সত্যি আমাদের বাসার একটি খাটকে স্টেজ বানিয়ে পাঁচ-ছয়জন বরযাত্রীর উপস্থিতিতে মেজ আপার বিয়ে হয়ে গেলো। কোনো যৌতুকও দেওয়া হলো না।
মেজ দুলাভাইকে আমরা ‘মেজ ভাই’ ডাকা শুরু করলাম।
২) আপার পড়াশোনা শেষে ১৯৮২ সালের দিকে মেজ ভাই ঢাকার জমজমাট ব্যবসা গুটিয়ে চট্টগ্রাম চলে এলেন। সিদ্ধান্তের কারণ, মেজ আপা নাকি সেখানে সারাক্ষণ আমাদের জন্য মন খারাপ করেন!
চট্টগ্রামে আসার পর মেজ আপার চাকরি হলো। তাই মেজ ভাই ঢাকার তুলনায় অনেক লো প্রোফাইল ব্যবসা বেছে নিলেন। তাঁর মনে হয়েছিল, বাবা-মা দুজনেই ব্যস্ত হয়ে গেলে ছেলেমেয়েদের ঠিকভাবে দেখাশোনা হবে না।
স্ত্রীর ক্যারিয়ারের জন্য এমন আত্মত্যাগ কয়জন করতে পারে?
মেজ ভাইয়ের ছেলেমেয়েরা তাদের বাবার ত্যাগের মর্যাদা রেখেছে। সবার দুর্দান্ত রেজাল্ট! দুর্দান্ত প্রতিষ্ঠা!
৩) ১৯৮৬ সালে আব্বা রিটায়ার করার পর মেজ ভাই বলতে গেলে আমাদের পরিবারে প্রায় সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। আমাদের সব আবদার তিনি এবং মেজ আপা পূরণ করতেন।
শুধু আমরা না, আমাদের বর্ধিত পরিবারের সবার দিকে খেয়াল রাখা ছিল তাঁদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তাই আমার কাজিন হারুন তাঁদের নাম দিলো, ‘সেন্ট্রাল মেজভাই’ এবং ‘সেন্ট্রাল মেজ আপা’। যাদের কেন্দ্র করে আমরা সবাই ঘুরতাম।
৪) কয়েক বছর আগে মেজ আপা রিটায়ার করলেন। ছেলেমেয়েরাও প্রতিষ্ঠিত। তাই আমরা মেজ ভাইকে অনুরোধ করেছিলাম ব্যবসা গুটিয়ে নিতে। কিন্তু তিনি তা করলেন না। কারণ তাঁকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে একটি বিশাল আড্ডা তৈরি হয়েছে। ছেলে-বুড়ো সবার কাছেই তিনি ছিলেন অসম্ভব প্রিয় দুলাভাই। আড্ডার সঙ্গীরা ছিলেন তাঁর হৃদয়ের অংশ। তাই ক্রমাগত লোকসান দিয়েও তিনি ব্যবসা ছাড়লেন না। ওটা ছাড়লে ওই আড্ডা তিনি পাবেন কোথায়?
৫) ২২ আগস্ট, ২০২৬
গতকাল শেষ পর্যন্ত মেজ ভাই অবসরে গেলেন। চির অবসর!
আমি জানি না, আমরা এই অবসরকে কীভাবে মেনে নেব?
৬) সব মিলিয়ে মেজ ভাই খুব সফল জীবন কাটিয়েছেন বলে আমার ধারণা। গতকাল থেকে পুরো আগ্রাবাদ যেন তাঁর মৃত্যুশোকে স্তব্ধ হয়ে আছে।
আমি আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠার এলাকাটিকে এমন স্তব্ধ হতে খুব কম দেখেছি।
এমন সাফল্য কয়জন পায়?
দয়া করে মেজ ভাইয়ের জন্য দোয়া করবেন।
• আসুন মায়া ছড়াই