দীর্ঘ চার মাস ধরে চলা ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ঐতিহাসিক যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে অনুষ্ঠিত জি৭ সম্মেলনের অবসরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারকে (MoU) আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর করেন। তেহরানের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও এই চুক্তিতে সই করেছেন। মূলত ১৪ দফার এই চুক্তিটি একটি পারফরম্যান্স বা কর্মসম্পাদনভিত্তিক সমঝোতা, যার অর্থ হলো ইরান তার প্রতিশ্রুতিগুলো অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করলেই কেবল চুক্তির সুফল ও সুবিধাগুলো ভোগ করতে পারবে। এই চুক্তির আওতায় ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জন করবে না বলে সম্মত হয়েছে এবং এর বিনিময়ে বন্ধ থাকা কৌশলগত হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া সহ ইরানের পুনর্গঠনে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল তহবিল গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
চুক্তির প্রথম ও প্রধান শর্ত অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং তাদের নিজ নিজ মিত্র রাষ্ট্র বা গোষ্ঠীগুলো লেবাননসহ ‘সব ফ্রন্টে’ সমস্ত ধরনের সামরিক ও বিমান অভিযান অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে বন্ধ করবে। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হেজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা যেন এই ঐতিহাসিক চুক্তিকে ভেস্তে না দেয়, তা নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। চুক্তিতে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, এখন থেকে কোনো পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেবে না বা সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করার হুমকি দেবে না। সেই সাথে লেবাননের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও পূর্ণ সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। চুক্তির দ্বিতীয় দফায় দুই দেশই একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ না করার এবং পারস্পরিক সার্বভৌমত্বের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শনের অঙ্গীকার করেছে।
এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মুহূর্ত থেকে সর্বোচ্চ ৬০ দিনের একটি সময়সীমা বা ডেডলাইন নির্ধারণ করা হয়েছে। এই ৬০ দিনের মধ্যে উভয় পক্ষকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য আনুষ্ঠানিক আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। চুক্তির চতুর্থ দফা অনুযায়ী, আগামী ৩০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ অবরোধ এবং সমস্ত ধরনের বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেবে। এর পাশাপাশি, চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের ৩০ দিনের মধ্যে ওয়াশিংটন ‘ইরানের নিকটবর্তী অঞ্চল’ থেকে তাদের অতিরিক্ত সামরিক বাহিনী ও যুদ্ধজাহাজ সরিয়ে নেবে। বাস্তবে এর অর্থ হলো, গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরু হওয়ার আগে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর অবস্থান যেখানে ছিল, তারা আবার সেই আগের অবস্থানে ফিরে যাবে।
যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলা হরমুজ প্রণালি অবিলম্বে খুলে দেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে তেহরান। পঞ্চম দফা অনুযায়ী, ইরান তার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা দিয়ে কোনো ধরনের শুল্ক বা ফি ছাড়াই এই আন্তর্জাতিক জলপথ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করবে। কারিগরি ত্রুটি ও মাইন অপসারণের কাজ শেষ হওয়া মাত্রই এই জাহাজ চলাচল শুরু হবে। দীর্ঘমেয়াদে ওমান এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য প্রতিবেশীদের সাথে মিলে হরমুজ প্রণালি পরিচালনার জন্য ইরান আরও বিস্তৃত একটি যৌথ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করবে।
চুক্তির অন্যতম আলোচিত দিক হলো ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ৩০০ বিলিয়ন (৩০ হাজার কোটি) ডলারের একটি বিশাল তহবিল গঠন। তবে মার্কিন প্রশাসন বারবার স্পষ্ট করেছে যে, এই তহবিলে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি অর্থায়নের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই এবং তারা ইরানকে “এক পয়সাও” দেবে না। এটি মূলত একটি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের পরিকল্পনা। উদাহরণস্বরূপ, ইরান যদি পারমাণবিক চুক্তি মেনে চলে, তবে মার্কিন লাইসেন্স ও ছাড়পত্র নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো আঞ্চলিক অংশীদাররা ইরানে বিদ্যুৎকেন্দ্র বা অবকাঠামো নির্মাণে এই অর্থ বিনিয়োগ করতে পারবে।
এর পাশাপাশি, চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবসহ যুক্তরাষ্ট্রের একতরফাভাবে আরোপিত সব ধরনের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করা হবে। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আগ পর্যন্ত একটি ‘স্থিতাবস্থা’ বজায় থাকবে, যার অধীনে যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেবে না এবং ইরানের তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যাংকিং লেনদেনের বিশেষ ছাড়পত্র বা ওয়েভার জারি রাখবে।
চুক্তির অষ্টম দফা অনুযায়ী, ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক অস্ত্র সংগ্রহ বা তৈরি না করার আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তেহরানের কাছে বর্তমানে গচ্ছিত থাকা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবস্থাপনার বিষয়টি পরবর্তী দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় নির্ধারণ করা হবে। তবে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (IAEA)-এর কঠোর তত্ত্বাবধানে এই ইউরেনিয়ামের মান বা তীব্রতা হ্রাস (ডাউনব্লেন্ড) করা হবে। ট্রাম্প প্রশাসন একে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি ‘বিরাট সাফল্য’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। যেহেতু এটি একটি কর্মসম্পাদনভিত্তিক চুক্তি, তাই ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া বা অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়া সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করবে পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে ইরানের বিরত থাকার ওপর।
আলোচনার অন্যতম কঠিন শর্ত ছিল ইরানের জব্দকৃত বা আটকে থাকা বিপুল রাষ্ট্রীয় অর্থ ফেরত দেওয়া। চুক্তির একাদশ দফায় বলা হয়েছে, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর ধাপে ধাপে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জব্দকৃত সব অর্থ ব্যবহারের পূর্ণ সুযোগ করে দেবে। ইরান যাতে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিষ্ক্রিয় করার মতো কঠিন শর্তগুলো দ্রুত পূরণ করতে উৎসাহিত হয়, সেজন্য এই অন্তর্বর্তীকালীন আলোচনার সময়ই কিছু সম্পদ বা অর্থ অবমুক্ত করা শুরু হবে।
চুক্তির শেষ কয়েকটি দফায় বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করার জন্য একটি যৌথ নজরদারি ব্যবস্থা বা বিশেষ কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছে, যা দুই দেশের প্রতিশ্রুতি রক্ষার বিষয়টি নিয়মিত মনিটরিং করবে। এই সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নের পরপরই দুই দেশ চূড়ান্ত চুক্তির জন্য আনুষ্ঠানিক টেবিলে বসবে এবং সবশেষে এই চূড়ান্ত চুক্তিটিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি বাধ্যতামূলক ও স্থায়ী প্রস্তাবের মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে অনুমোদন দেওয়া হবে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা