রাজধানী ঢাকায় মশার উপদ্রব আবারও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ঘরে-বাইরে কোথাও স্বস্তিতে থাকতে পারছেন না নগরবাসী। সন্ধ্যার পর তো বটেই, দিনেও মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ মানুষ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতিতে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়ছে।
নগরবাসীর অভিজ্ঞতা
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা মশার এই উপদ্রব নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন:
ফুটপাত থেকে বাসা, কোথাও স্বস্তি নেই: গত শুক্রবার সন্ধ্যায় গুলশান পুলিশ প্লাজার সামনে কেনাকাটা করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী গাজী শফিক মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হয়ে বলেন, “ফুটপাত থেকে বাসা—কোথাও বসে স্বস্তি নেই।”
উত্তরায় অসহনীয় পরিস্থিতি: উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা সালাম জোয়াদ্দার জানান, দিনে পরিস্থিতি কিছুটা সহনীয় হলেও সন্ধ্যার পর তা অসহনীয় হয়ে ওঠে। “ঘরের বাইরে এক মিনিট দাঁড়ালে শত শত মশা ঘিরে ধরে। ঘরের ভেতরেও মশারি ছাড়া থাকা কঠিন,” বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মশার বর্তমান চিত্র ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা
সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে প্রকৃতিতে থাকা মশার প্রায় ৯২ শতাংশই ‘কিউলেক্স’ প্রজাতির। দীর্ঘদিন ড্রেন, ডোবা ও নর্দমা পরিষ্কার না করা এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
কীটতত্ত্ববিদদের গবেষণায় ঢাকার যে এলাকাগুলোতে মশার ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে, সেগুলো হলো: কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, শনির আখড়া, শ্যামপুর, রায়েরবাজার, বাড্ডা, মান্ডা, মুগদা, কেরানীগঞ্জ, খিলক্ষেত, মোহাম্মদপুর, বেড়িবাঁধ ও সাভার এলাকা।
পরিসংখ্যানে মশার ভয়াবহতা
কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার জানান, বিশ্বমানে এক ঘণ্টায় ৫টি মশা কামড়াতে এলেই তা বেশি ধরা হয়। কিন্তু ঢাকায় গবেষণায় দেখা গেছে এই সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে!
বিশেষ ফাঁদ পদ্ধতি: রাজধানীর পাঁচটি এলাকায় (উত্তরা, মিরপুর-২, গুলশান-১, মিরপুর-১ ও মোহাম্মদপুর) ফাঁদ পেতে দেখা গেছে, জানুয়ারিতে মশা ধরা পড়ে ১৭,১৫৯টি। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২২,৩৬২টিতে এবং মার্চের প্রথম সপ্তাহে এই সংখ্যা ২৬ হাজার ছাড়িয়ে যায়।
হিউম্যান ল্যান্ডিং ক্যাচ পদ্ধতি (Human Landing Catch): একজন মানুষের হাঁটু পর্যন্ত পা ও বাহু খোলা রেখে মশা গণনার পদ্ধতিতে দেখা যায়, জানুয়ারিতে এক ঘণ্টায় ৪০০-৬০০টি মশা কামড়াতে আসে। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়ায় গড়ে ৮৫০টিতে এবং মার্চে এই সংখ্যা ১,০০০ ছাড়িয়ে গেছে। এটি একটি বড় ধরনের বিপৎসংকেত।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও উদ্যোগ
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী জানান, শহরের ড্রেন, ডোবা ও খালে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকায় শুধু কীটনাশক ছিটিয়ে বা ক্র্যাশ প্রোগ্রাম করে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না।
তবে আসন্ন ডেঙ্গু মৌসুমের আগে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ডিএনসিসি আজ শনিবার থেকে ‘শনিবারের অঙ্গীকার—বাসাবাড়ি করি পরিষ্কার’ শীর্ষক একটি বিশেষ ক্যাম্পেইন শুরু করেছে। এর আওতায়:
প্রতি শনিবার সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলবে।
পরিত্যক্ত পাত্র অপসারণ, জমে থাকা ময়লা পরিষ্কার এবং সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করা হবে।
মোট ৫৩টি এমন ক্যাম্পেইন পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, মার্চের শেষে কালবৈশাখী ঝড় ও বৃষ্টিপাত হলে কিউলেক্স মশা কিছুটা কমতে পারে। তবে হালকা বৃষ্টিতে এডিস মশা (ডেঙ্গুর বাহক) বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এডিস মশা যেহেতু বাসাবাড়ির পরিষ্কার জমানো পানিতে (যেমন: ফুলের টব, পানির ট্যাংক, পরিত্যক্ত টায়ার) জন্মায়, তাই এপ্রিল-মে মাস থেকে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের কার্যক্রম শুরু করা জরুরি। এ বিষয়ে বাসাবাড়ির মালিকদের সচেতন হওয়া সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।