• শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ০৮:৩১ অপরাহ্ন

সংকটে থাকা ব্যাংক খাতের ওপর নতুন বাজেটের বোঝা

Reporter Name / ৪ Time View
Update : শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পেশ হতে যাচ্ছে জাতীয় সংসদে। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি যখন মূল্যস্ফীতির চাপ, ডলার সংকট এবং নানামুখী অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন এই নতুন বাজেটকে ঘিরে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার শেষ নেই। তবে এবারের বাজেটের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে এর বিশাল ঘাটতি এবং তা মেটাতে সংকটে জর্জরিত ব্যাংকিং খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা। অর্থ মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সরকারের বিশাল ব্যয়ের তুলনায় রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি থাকায় ব্যাংক থেকে বিপুল অংকের ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী মহল আশঙ্কা করছেন, দুর্বল ব্যাংক খাতের ওপর এই বড় বাজেটের বোঝা চাপানো হলে তা সামগ্রিক অর্থনীতিকে আরও গভীর সংকটে ফেলতে পারে।

বিশাল বাজেটের রূপরেখা ও ঘাটতির খতিয়ান

আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হচ্ছে প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি থেকে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল ব্যয়ের বিপরীতে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে কেবল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকেই (এনবিআর) সংগ্রহ করতে হবে প্রায় ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। ফলে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে এক বিশাল ব্যবধান বা ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

হিসাব অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরের সামগ্রিক বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি থেকে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশের কাছাকাছি। কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ মনে করছেন, বছর শেষে এই ঘাটতির পরিমাণ পৌনে ৩ লাখ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

ঘাটতি মেটাতে ঋণের উৎস ও পরিকল্পনা

এই বিশাল বাজেট ঘাটতি সামাল দিতে সরকারকে অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক উভয় উৎসের ওপরই ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হতে হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘাটতি পূরণে ঋণের প্রধান উৎসগুলো হবে নিম্নরূপ:

  • ব্যাংক খাত থেকে ঋণ: ১,১২,০০০ কোটি টাকা

  • ব্যাংক বহির্ভূত খাত (সঞ্চয়পত্র ইত্যাদি): ১৫,০০০ কোটি টাকা

  • বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ: ১,১৬,০০০ কোটি টাকা

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা প্রথমে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হলেও পরবর্তীতে তা বাড়িয়ে ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসেই সরকার ব্যাংক থেকে ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ফেলেছে। ফলে আগামী বছরেও যে সরকার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ঋণ ব্যাংক থেকে নেবে, তা সহজেই অনুমান করা যায়।

দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান নাজুক দশা

যে ব্যাংকিং খাতের ওপর ভর করে সরকার এই বিশাল ঘাটতি মেটানোর স্বপ্ন দেখছে, সেই খাতের নিজস্ব ভিত্তিই এখন চরম নড়বড়ে। খেলাপি ঋণের পাহাড়, তীব্র তারল্য সংকট এবং গ্রাহকদের আস্থাহীনতা দেশীয় ব্যাংকগুলোকে কোণঠাসা করে ফেলেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের মার্চ প্রান্তিকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম তিন মাসেই ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। এর ফলে দেশের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। এটি ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত মোট ঋণের প্রায় ৩২.২৬ শতাংশ। অর্থাৎ, ব্যাংক থেকে দেওয়া প্রতি তিন টাকা ঋণের মধ্যে প্রায় এক টাকাই এখন চরম ঝুঁকিপূর্ণ বা খেলাপি।

খেলাপি ঋণ জ্যামিতিক হারে বাড়ার কারণে ব্যাংকগুলোর নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণে বড় ধস নেমেছে। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন রাখার কথা থাকলেও দেশের অধিকাংশ ব্যাংক তা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে মোট প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা, যা গত ডিসেম্বরে ছিল ১ লাখ ৯১ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা। বিশেষ করে ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়, যেখানে দৈনন্দিন লেনদেন সচল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রতিদিন রেপো বা বিশেষ সহায়তার আশ্রয় নিতে হচ্ছে।

বেসরকারি খাতে ঋণের খরা ও বিনিয়োগ মন্দা

সরকার যখন বাজেট ঘাটতি মেটাতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টাকা তুলে নেয়, তখন ব্যাংকগুলো সাধারণ ব্যবসায়ী বা বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার চেয়ে সরকারকে ঋণ দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। কারণ সরকারি ঋণ সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত এবং বর্তমানে এর সুদের হারও বেশ চড়া।

এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের বেসরকারি খাতের ওপর। বর্তমানে ব্যক্তি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪.৬ শতাংশে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ও বাজারভিত্তিক সুদহারের কারণে এমনিতেই ঋণের সুদ চড়া, তার ওপর তহবিলের অভাবে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনগুলোর নেতারা আশঙ্কা করছেন, নতুন বিনিয়োগ না হলে শিল্পায়নের গতি থমকে যাবে, যার সরাসরি আঘাত আসবে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর। প্রতি বছর শ্রমবাজারে যে লাখ লাখ তরুণ যুক্ত হচ্ছে, বেসরকারি খাতের বিকাশ না হলে তাদের চাকরি পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর এ প্রসঙ্গে বলেন:

“সরকার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, কেবল সেখানে থেমে থাকতে পারবে না। বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থ আসার ইতিবাচক লক্ষণ না থাকায় সরকারকে আরও বেশি পরিমাণ ঋণ ব্যাংক খাত থেকেই নিতে হবে। ফলে অবধারিতভাবেই বেসরকারি খাত চরম চাপে পড়বে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য মোটেও ভালো ফল আনবে না।”

অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি

বাজেটের এই বিশাল ব্যয়ের একটি বড় অংশই চলে যাচ্ছে অনুৎপাদনশীল খাতে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বোঝাটি হলো অতীতের নেওয়া ঋণের সুদ পরিশোধ। আগামী অর্থবছরে কেবল অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ মেটাতেই সরকারের ব্যয় হবে রেকর্ড ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা

পাশাপাশি সরকারের রাজনৈতিক ও নির্বাচনী ইশতেহারের বেশ কিছু বড় ফ্ল্যাগশিপ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে গিয়েও ব্যয় বাড়ছে। এর মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, দেশব্যাপী খাল খনন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মতো প্রকল্পগুলো অন্যতম। শুধুমাত্র ৪১ লাখ পরিবারকে প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা করে নগদ অর্থ দেওয়ার ‘ফ্যামিলি কার্ড’ স্কিমেই প্রথম বছরে প্রায় ১২ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে। এছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ধরা হচ্ছে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কাঠামোগত সংস্কারের তাগিদ

সরকার আগামী অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬ থেকে ৬.৫ শতাংশ ধরার পরিকল্পনা করলেও বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলছে ভিন্ন কথা। তাদের মতে, বেসরকারি খাতের ঋণ সংকোচন এবং চলমান জ্বালানি সংকটের কারণে প্রবৃদ্ধি ৪ থেকে ৪.৭ শতাংশের বেশি হওয়া সম্ভব নয়।

এই বিপজ্জনক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দেশের অন্যতম শীর্ষ গবেষণা সংস্থা সিপিডি এবং পিআরআই-এর অর্থনীতিবিদরা সরকারকে সতর্ক করেছেন। তাদের মতে, ব্যাংক খাতের ওপর চাপ না বাড়িয়ে সরকারের উচিত রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে প্রকৃত সংস্কার আনা।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান এ বিষয়ে বলেন:

“কর অব্যাহতি ও কর রেয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময় অর্থনৈতিক যুক্তির চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাব, কর্পোরেট লবিং এবং ক্ষমতা কেন্দ্রিক স্বার্থ ভূমিকা রাখে। বাজেট এমনভাবে তৈরি করা উচিত যা একদিকে চলমান অর্থনৈতিক চাপ সামাল দিতে পারে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে সাহায্য করে। সরকারি উন্নয়ন ও পরিচালন ব্যয় বাড়াতে হলে শুধু বাজেট বড় করাই যথেষ্ট নয়, বরং এর বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়ানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category