• রবিবার, ১৭ মে ২০২৬, ১২:০০ পূর্বাহ্ন
Headline
পায়ের নিচে পৃথিবী বিদ্যুৎ সঞ্চালনে ধারাবাহিক লোকসান: ঋণ ৬০ হাজার কোটি, সংকটে পাওয়ার গ্রিড সুপার এল নিনোর ছায়া ও জলবায়ুর খামখেয়ালিপনা: চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়ার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ নাইজেরিয়ায় স্কুলে বন্দুকধারীদের তাণ্ডব: ক্লাস চলাকালে বহু শিক্ষার্থী অপহরণ হরমুজ প্রণালী নিয়ে জাতিসংঘের প্রস্তাবে ইরানের তীব্র ক্ষোভ, বিশ্ববাসীকে ‘কঠোর বার্তা’ তেহরানের ট্রাম্প ফিরতেই বেইজিং যাচ্ছেন পুতিন: দুই পরাশক্তির বৈঠকে নজর বিশ্ব মহলের নগরের দায়িত্ব পেলে নাগরিক সেবাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবো: সাদিক কায়েম আস্থার চরম সংকটে দেশের আর্থিক খাত: ৬৬% ব্যাংকই দুর্বল, আসল টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে শঙ্কা নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দল ঘোষণা পাকিস্তানের, পাঁচ নতুনের অভিষেক বিসিবির অ্যাডহক কমিটি বাতিলের দাবিতে এবার বুলবুল-ফারুকদের রিট

সুপার এল নিনোর ছায়া ও জলবায়ুর খামখেয়ালিপনা: চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়ার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক প্রতিবেদক | ঢাকা / ৪ Time View
Update : শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬

বাংলাদেশের চিরচেনা ষড়ঋতুর ঋতুচক্র এখন কেবলই খাতা-কলমে। জলবায়ু পরিবর্তনের অমোঘ আঘাতে এ দেশের আবহাওয়ার চরিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। শীতকাল সংকুচিত হলেও তার তীব্রতা বাড়ছে, গ্রীষ্মকাল দীর্ঘায়িত হয়ে পারদ চড়ছে রেকর্ড উচ্চতায়। আবার বর্ষার আগেই আকস্মিক বন্যা কিংবা তীব্র অনাবৃষ্টির ফলে দেখা দিচ্ছে খরা। প্রকৃতির এই টানাপোড়েনের মাঝেই বিশ্বজুড়ে নতুন আতঙ্ক হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে ‘সুপার এল নিনো’। প্রশান্ত মহাসাগরের এই বৈশ্বিক জলবায়ু চক্রের প্রভাবে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি থেকে বাংলাদেশের আবহাওয়ায় এক চরম ভাবাপন্ন রূপ দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন আবহাওয়াবিদ ও বিশেষজ্ঞরা।

এল নিনো কী এবং বাংলাদেশের সাথে এর ‘টেলিকানেকশন’

এল নিনো (El Niño) হলো প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র, যা সাধারণত ২ থেকে ৭ বছর পরপর ফিরে আসে। স্বাভাবিক অবস্থায় প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিমাংশ উষ্ণ এবং পূর্বাংশ ঠান্ডা থাকে। কিন্তু এল নিনো সক্রিয় হলে দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠ অস্বাভাবিক উষ্ণ হয়ে ওঠে, যা বৈশ্বিক বায়ুপ্রবাহের স্বাভাবিক ভারসাম্যকে ওলটপালট করে দেয়।

যদিও বাংলাদেশ প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে অবস্থিত নয়, তবুও দক্ষিণ এশিয়ার মৌসুমি বায়ু এই বৈশ্বিক ব্যবস্থার সাথে গভীরভাবে যুক্ত। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের সিনিয়র আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক জানান, একে বলা হয় ‘টেলিকানেকশন’ বা দূরবর্তী জলবায়ুগত সম্পর্ক। প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব ও পশ্চিম অংশের তাপমাত্রার পার্থক্য কমে গেলে এবং বাণিজ্যিক বায়ু (Trade Winds) দুর্বল হলে দক্ষিণ এশিয়ার বৃষ্টিপাতের ধরন পুরোপুরি বদলে যায়। এর ফলে বাংলাদেশে বর্ষাকাল আসতে যেমন দেরি হতে পারে, তেমনি সামগ্রিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণও আশঙ্কাজনকভাবে কমে যেতে পারে।

২০২৪-এর ভয়াবহ স্মৃতি এবং দীর্ঘায়িত তাপপ্রবাহের শঙ্কা

বাংলাদেশে এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের মূল কারণ ২০২৪ সালের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। ওই বছর দেশ ইতিহাসের দীর্ঘতম দাবদাহের সাক্ষী হয়েছিল, যেখানে টানা ৩৬ দিন দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘরে ছিল। চুয়াডাঙ্গা, যশোর, রাজশাহী, ঢাকাসহ পুরো দেশ তখন পুড়েছিল তীব্র গরমে, বন্ধ রাখতে হয়েছিল স্কুল-কলেজ।

আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশিদ সতর্ক করে বলেন, এবার যদি এই জলবায়ু চক্র ‘সুপার এল নিনো’ বা শক্তিশালী রূপ ধারণ করে, তবে মৌসুমি তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেড়ে যাবে এবং ২০২৪ সালের চেয়েও দীর্ঘ ও তীব্র তাপপ্রবাহের সৃষ্টি হতে পারে।

উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে খরার প্রকোপ, উপকূলে লবণাক্ততা

তীব্র দাবদাহের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসবে দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খরাপ্রবণ জেলাগুলোতে। রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও দিনাজপুর অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে গেলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ তীব্র হবে, যা সেচনির্ভর কৃষির ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও জলবায়ু সহনশীলতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. মারুফুর রহমান বলেন, এল নিনোর কারণে সমুদ্র থেকে স্বাভাবিক আর্দ্রতার প্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় দীর্ঘ শুষ্ক সময় বা খরা দেখা দিতে পারে।

একই সাথে, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুছ ছালাম জানান, নদীতে মিঠাপানির প্রবাহ কমে গেলে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট ও পটুয়াখালীর মতো উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা মারাত্মকভাবে বেড়ে যাবে; যা কৃষি ও সুপেয় পানির সংকটকে আরও ঘনীভূত করবে।

বৃষ্টিপাতের ধরন বদল: সংকটে প্রকৃতিনির্ভর কৃষি

বাংলাদেশের আমন ও বোরো চাষ পুরোপুরি আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এল নিনো সক্রিয় হলে তিন ধরনের ঝুঁকি একসঙ্গে দেখা দেবে—বর্ষা দেরিতে শুরু হওয়া, বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া এবং হঠাৎ অতিবৃষ্টি।

চলতি বছরের এপ্রিলেই আবহাওয়ার এই খামখেয়ালিপনা দেখা গেছে। যেখানে এপ্রিল সাধারণত শুষ্ক থাকে, সেখানে এবার স্বাভাবিকের চেয়ে ৭৫.৭% বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। কিশোরগঞ্জের নিকলিতে এক দিনেই ১৬০ মিলিমিটার এবং সিলেট বিভাগে পুরো মাসে ৬০৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এই অসময়ের অতিবৃষ্টিতে সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের নিচু জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) মহাপরিচালক ড. শরিফুল হক ভূঞা বলেন, “প্রয়োজনের সময় আমরা বৃষ্টি পাচ্ছি না, আবার অসময়ে অতিবৃষ্টি হচ্ছে। আমরা যদি দ্রুত জলবায়ুসহিষ্ণু ফসলের জাত উদ্ভাবন করতে না পারি, তবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।”

পরিবেশগত সংকট থেকে এখন ‘জনস্বাস্থ্য সংকট’

জলবায়ুর এই চরম রূপ এখন আর কেবল প্রকৃতির ক্ষতি করছে না, তা সরাসরি রূপ নিয়েছে জনস্বাস্থ্য সংকটে। দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের কারণে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, ডায়রিয়া, হৃদরোগ ও কিডনি রোগের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে; যার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন শিশু, বৃদ্ধ ও শ্রমজীবী মানুষ। আবার স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির ফলে ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় শহরগুলোতে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে, যা ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া এবং পানিবাহিত সংক্রামক ব্যাধি ছড়িয়ে দিচ্ছে।

একই সাথে দুই চরম দুর্যোগ: আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কতা

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মমিনুল ইসলাম বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিটি চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেন, দেশের মূল সংকট হলো একই সময়ে দুই ধরনের চরম আবহাওয়া দেখা দেওয়া—একদিকে দীর্ঘ খরা ও তাপপ্রবাহ, অন্যদিকে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যা। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতা ধারণক্ষমতা বেড়ে গেছে। ফলে শুষ্ক ভাব যেমন দীর্ঘ হচ্ছে, তেমনি বৃষ্টি যখন হচ্ছে, তখন তা অল্প সময়ে মুষলধারে ঝরে বন্যা সৃষ্টি করছে।

উত্তরণের পথ: বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

প্রখ্যাত জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের এই ধাক্কাকে আরও জটিল করে তুলছে দেশের অপরিকল্পিত নগরায়ণ। এই বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় তিনি বেশ কিছু জরুরি পদক্ষেপের তাগিদ দিয়েছেন:

  • খরা ও লবণাক্ততা সহনশীল ফসলের জাতের দ্রুত সম্প্রসারণ।

  • বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের (Rainwater Harvesting) ব্যবস্থা জোরদার করা।

  • উন্নত ও আধুনিক আবহাওয়া পূর্বাভাস ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

  • শহরের খাল, জলাশয় রক্ষা এবং টেকসই ড্রেনেজ অবকাঠামো নির্মাণ।

  • স্বাস্থ্য খাতে তাপপ্রবাহ ও ডেঙ্গু মোকাবিলায় আগাম বিশেষ প্রস্তুতি রাখা।

‘সুপার এল নিনো’র এই বছরে প্রকৃতির রুদ্ররূপ রুখতে কেবল বৈশ্বিক জলবায়ু তহবিলের দিকে চেয়ে না থেকে, নিজস্ব দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় পরিকল্পনা ও টেকসই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই বাংলাদেশকে তার ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে হবে।

সূত্র: সমকাল


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category