আমাদের দৈনন্দিন জীবনে দুর্ঘটনা এক অপ্রত্যাশিত কিন্তু নিয়মিত ঘটনা। রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস কিংবা নিজ ঘরে যেকোনো মুহূর্তে মানুষ অজ্ঞান হওয়া, কেটে যাওয়া, পুড়ে যাওয়া, সাপে কাটা, পানিতে ডোবা বা হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়ার মতো আকস্মিক বিপদে পড়তে পারে। এসব ক্ষেত্রে রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার আগে তাৎক্ষণিক যে সেবা দেওয়া হয়, তা-ই ‘প্রাথমিক চিকিৎসা’ বা ফার্স্ট এইড। জীবন রক্ষা, অবস্থার অবনতি রোধ এবং পুনরুদ্ধারে এর গুরুত্ব অপরিসীম। তবে বাংলাদেশে স্কুল পর্যায়ে এই অত্যন্ত জরুরি বিষয়ে প্রশিক্ষণের মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে।
সঠিক প্রশিক্ষণ ছাড়া প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে গেলে রোগীর উপকারের চেয়ে ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। একজন প্রশিক্ষিত ব্যক্তি শুধু নিজের পরিবার নয়, বরং আশেপাশের মানুষের জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রাখতে পারেন। প্রাথমিক চিকিৎসা কাউকে চিকিৎসক বানায় না, বরং রক্তক্ষরণ বন্ধ করা, ক্ষতস্থান পরিষ্কার করা বা সিপিআর (CPR) দেওয়ার মতো মৌলিক কৌশলগুলো শেখায়, যা দুর্ঘটনার প্রথম কয়েক মিনিটে (যা অনেক সময় হাসপাতালে পৌঁছানোর আগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়) রোগীর জীবন বাঁচাতে পারে।
উন্নত বিশ্ব যখন স্কুল পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক চিকিৎসার পাঠ দিচ্ছে, তখন বাংলাদেশে এর চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। দেশের অধিকাংশ স্কুল-কলেজে এই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ অত্যন্ত সীমিত। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম একটি ‘ফার্স্ট এইড বক্স’ পর্যন্ত নেই। আর যেখানে আছে, সেখানে হয়তো ওষুধের মেয়াদ উত্তীর্ণ অথবা তা ব্যবহারের সঠিক নিয়ম কারও জানা নেই।
২০১০ সালে বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের অধীনে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ‘শারীরিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য’ নামে একটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু সঠিক ক্লাস ও ব্যবহারিক (প্র্যাকটিক্যাল) প্রশিক্ষণের অভাবে বিষয়টি কেবল নামমাত্র পাঠ্যপুস্তকের অংশ হয়েই রয়ে গেছে, বাস্তব জীবনে শিক্ষার্থীদের কোনো কাজে আসছে না।
‘বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি’-এর মতো কিছু সংস্থা প্রাথমিক চিকিৎসা বিষয়ে সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালিয়ে গেলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এর কাঙ্ক্ষিত প্রভাব দৃশ্যমান নয়। সঠিক জ্ঞানের অভাবে আজও দেশে অনেক মানুষ দুর্ঘটনা ঘটলে কুসংস্কার বা ভুল পদ্ধতির আশ্রয় নেয়, যা রোগীর অবস্থাকে অনেক সময় আরও সংকটাপন্ন করে তোলে।
প্রতিদিন প্রাথমিক চিকিৎসার অভাবে যে অসংখ্য অমূল্য প্রাণ ঝরে যাচ্ছে, তা রোধ করতে স্কুল পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের জন্য বাস্তবমুখী ও ব্যবহারিক প্রাথমিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগই পারে এই সংকট মোকাবিলা করতে।