দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী ও প্রধান অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম অঞ্চলকে কেন্দ্র করে গত দেড় দশকে বাস্তবায়িত একাধিক মেগা প্রকল্পের বড় অংশই জাতীয় অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত সুফল দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। গভীর সমুদ্রবন্দর, নদী, পাহাড় ও উপকূলীয় সম্ভাবনাকে পুঁজি করে গৃহীত এসব অবকাঠামোগত প্রকল্পে হাজার হাজার কোটি টাকা ঢালা হলেও বাস্তবে সেগুলো এখন রাষ্ট্রের দেনার বোঝা বাড়াচ্ছ। পর্যাপ্ত ও সঠিক সমীক্ষার অভাব, সমন্বয়হীনতা, অতিরঞ্জিত অর্থনৈতিক পূর্বাভাসের ওপর ভিত্তি করে প্রকল্প গ্রহণ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অর্জনের মানসিকতাই এই চরম ব্যর্থতার মূল কারণ বলে মনে করছেন বুয়েটের অধ্যাপক, নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থানীয় বিশেষজ্ঞরা। ফলে হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের পরও কর্মসংস্থান, বাণিজ্য বৃদ্ধি বা নাগরিকদের মৌলিক সুবিধার স্থানগুলোতে শূন্যতা রয়ে গেছে।
বাস্তবতার সাথে পূর্বাভাসের বিশাল ব্যবধানের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত শেখ মুজিবুর রহমান টানেল। চট্টগ্রামকে ‘ওয়ান সিটি, টু টাউন’ মডেলে রূপান্তর করার সুউচ্চ স্বপ্ন দেখিয়ে ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই টানেলে দৈনিক ১৮ হাজার যান চলাচলের হিসাব দেখানো হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে দিনে গড়ে ৪ হাজারের মতো গাড়ি চলায় উসূল হওয়া টোল দিয়ে রক্ষণাবেক্ষণ খরচের চার ভাগের এক ভাগও তোলা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে চাইনিজ এক্সিম ব্যাংকের বিশাল অঙ্কের ঋণের কিস্তি যখন শুরু হয়েছে, তখন শাহ আমানত সেতুর চেয়ে অতিরিক্ত টোল ধরা এবং আনোয়ারা প্রান্তে অপ্রয়োজনীয় রিসোর্ট তৈরির মতো বিলাসিতা নিয়ে জনমনে চরম ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরঞ্জিত লাভের হিসাব দেখিয়ে ‘উন্নয়ন প্রদর্শনী’র আমলাতান্ত্রিক বিলাসের বলি হয়েছে এটি, অথচ টানেলের এক-চতুর্থাংশ খরচে কর্ণফুলীতে একাধিক সেতু নির্মাণ করলে ১২ লেনের কার্যকর সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেত।
একই চিত্র ধরা পড়েছে নগরের প্রথম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ক্ষেত্রেও। দিনে ৬৬ হাজার গাড়ি চলাচলের হিসাব ধরে ডিপিপি তৈরি করা হলেও বাস্তবে প্রতিদিন ৭ হাজারের কম গাড়ি চলাচল করছে, যার ফলে দৈনিক পরিচালন ব্যয়ের তিন ভাগের এক ভাগও টোল থেকে উঠছে না। সংযোগ সড়কের অভাব, তড়িঘড়ি নকশা পরিবর্তন এবং অপরিকল্পিত গন্তব্যের কারণে এটি মূলত বিমানবন্দরগামী সীমিত সংখ্যক যাত্রীর ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। অন্যদিকে, প্রায় ৩৩ হাজার ৮০৫ একর বিশাল এলাকায় গড়ে তোলা মিরসরাই জাতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং বিভিন্ন উপজেলার বিসিক শিল্পনগরীগুলোতে ১২ বছর ধরে সাড়ে ১৩ লাখ গাছ কেটে পরিবেশের অসং hisাবনীয় ক্ষতি করা হলেও এখন পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত শিল্পায়ন শুরু করা যায়নি। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির নিশ্চয়তা না থাকায় বৃহৎ উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না, ফলে কোটি কোটি টাকার সরকারি পরিকাঠামো অন অব্যবহৃত পড়ে আছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন মহাসড়ক ওভারলোডিংয়ের কারণে আগেই আয়ু হারিয়েছে, অন্যদিকে চট্টগ্রাম-ঢাকা রেলপথে পণ্য পরিবহন সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মিত দোহাজারী-কক্সবাজার নতুন রেলপথেও পণ্যবাহী কোনো ট্রেন চালু করা সম্ভব হয়নি, কেবল দুটি যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনা করা হচ্ছে। মহেশখালীর প্রায় ৫৭ হাজার কোটি টাকার মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১৪ কিলোমিটার চ্যানেল রক্ষণাবেক্ষণে প্রতি বছর বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, যা পায়রা বন্দরের মতো ভবিষ্যতে গভীর নাব্য সংকটে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এর বাইরে নগরীর চার-চারটি ভিন্ন মেগা প্রকল্পে ১৪ হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ করেও জোয়ার-ভাটা ও খাল-নালা নিয়ে ভুল নকশার কারণে সম্প্রতি সামান্য বৃষ্টিতেই চট্টগ্রামজুড়ে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ ও অভূতপূর্ব জলাবদ্ধতা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রাম অঞ্চলের এসব উন্নয়ন কর্মকাণ্ড মূলত দূরদর্শী সমন্বিত ভিশন বা মাস্টারপ্ল্যানের ভিত্তিতে না হয়ে রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার ব্যবহারে অসম্পূর্ণ ‘অ্যাডহক’ ভিত্তিতে করা হয়েছে। এমনকি পাহাড় কেটে সড়ক নির্মাণ করায় পলি জমে নদী-নালার নাব্য সংকট তৈরি হয়েছে এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো বড় ঝুঁকির বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। তবে বিগত সময়ে পতেঙ্গার ইস্টার্ন রিফাইনারি, বে টার্মিনাল, কালুরঘাট নতুন সেতু এবং সিডিএ কর্তৃক ২৫ বছর মেয়াদী ‘চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টারপ্ল্যান (২০২০-২০৫০)’ গ্রহণের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সুশীল সমাজ। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন অদূরদর্শী উন্নয়নকে লুটপাটের হাতিয়ার হিসেবে উল্লেখ করে চট্টগ্রামকে সচল করতে সুশাসন, কার্যকর সমন্বয় ও পূর্ণাঙ্গ ‘সিটি গভর্নমেন্ট’ ব্যবস্থা চালু করার দাবি জানিয়েছেন।