২০২৩ সালে বিশ্বের ১৯৮টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে ৫৫টিতে ধর্মকে ঘিরে সামাজিক সংঘাত বা বিরোধের মাত্রা ছিল উচ্চ বা খুবই উচ্চ। এর মধ্যে ছিল বেসরকারি ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও সংগঠনের মাধ্যমে হয়রানি, হামলা কিংবা সংঘবদ্ধ সহিংসতার মতো ঘটনা। ২০২২ সালে এমন দেশের সংখ্যা ছিল ৪৫।
সে বছর ধর্মকে ঘিরে সামাজিক সংঘাতের মাত্রা সবচেয়ে বেশি ছিল ছয়টি দেশে। দেশগুলো হলো—নাইজেরিয়া, ভারত, ইসরায়েল, সিরিয়া, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান। জরিপ-গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ গত ১৫ জুন প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
ইসরায়েল ও বাংলাদেশ ২০২৩ সালে সামাজিক সংঘাতের ‘খুবই উচ্চ’ শ্রেণিতে উঠে আসে দুই দেশেই বড় ধরনের সহিংসতার কারণে। এসব ঘটনার মধ্যে ছিল ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাসের হামলা এবং ৩-৪ মার্চ বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হামলা ও সহিংসতা।
অন্যদিকে, ২০২৩ সালে ৫৮টি দেশ ও অঞ্চলে ধর্মের ওপর সরকারি বিধিনিষেধের মাত্রা ছিল উচ্চ বা খুবই উচ্চ। আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ৫৯, অর্থাৎ প্রায় একই ছিল। ২০২৩ সালে ২৫টি দেশে ধর্মের ওপর সরকারি বিধিনিষেধের মাত্রা ছিল খুবই উচ্চ। এসব দেশের মধ্যে ছিল—চীন, ইরান, আফগানিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, সিরিয়া ও উজবেকিস্তান।
তবে বিশ্বের বেশির ভাগ দেশেই ধর্মকে ঘিরে সামাজিক সংঘাতের মাত্রা ছিল নিম্ন বা মাঝারি। একইভাবে বেশির ভাগ দেশে ধর্মের ওপর সরকারি বিধিনিষেধও ছিল নিম্ন বা মাঝারি পর্যায়ের।
এ তথ্যগুলো দুটি সূচকের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। প্রথমত, সামাজিক সংঘাত সূচক বা সোশ্যাল হসটিলিটি ইনডেক্সে (Social Hostilities Index–SHI) ধর্মসম্পর্কিত ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত ও সংগঠনভিত্তিক শত্রুতার ১৩টি সূচক অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে সন্ত্রাসী সংগঠনের কর্মকাণ্ডও রয়েছে। অন্যদিকে, সরকারি বিধিনিষেধ সূচকে (Government Restrictions Index–GRI) সরকার, সরকারি কর্মকর্তা, আইন ও নীতির মাধ্যমে ধর্মের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের ২০টি সূচক অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দুই সূচকেরই স্কোর শূন্য থেকে ১০ পর্যন্ত।
এই গবেষণার এই অংশে যেসব দেশ যেকোনো একটি সূচকে উচ্চ বা খুবই উচ্চ স্কোর করেছে, সেগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বছরভিত্তিক পরিবর্তনও দেখা হয়েছে, অর্থাৎ কতটি দেশের অবস্থান কোনো সূচকে উন্নত বা অবনতি হয়েছে।
ধর্ম নিয়ে সামাজিক সংঘাত-সহিংসতা
সামাজিক সংঘাত সূচকে (এসএইচআই) ৭ দশমিক ২ থেকে ১০ পর্যন্ত স্কোরকে ‘খুবই উচ্চ’ এবং ৩ দশমিক ৬ থেকে ৭ দশমিক ১ পর্যন্ত স্কোরকে ‘উচ্চ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০২৩ সালে ধর্ম নিয়ে সামাজিক সংঘাতের মাত্রা সবচেয়ে বেশি থাকা ছয় দেশ হলো—নাইজেরিয়া, ভারত, ইসরায়েল, সিরিয়া, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান। প্রতিটি দেশের স্কোর ছিল অন্তত ৭ দশমিক ৫, অর্থাৎ তারা ‘খুবই উচ্চ’ শ্রেণিতে ছিল। এর আগের বছর ইসরায়েল ও বাংলাদেশ ‘উচ্চ’ শ্রেণিতে ছিল।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ২০২২ সালে যেখানে এসএইচআই স্কোর ছিল ৬ দশমিক ১, সেখানে ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৮-এ। এই বৃদ্ধির পেছনে ২০২৩ সালে সংঘবদ্ধ সহিংসতায় মৃত্যুর ঘটনাও আংশিকভাবে দায়ী। ৩-৪ মার্চ উত্তরাঞ্চলের পঞ্চগড় জেলার আহমেদনগর গ্রামে বার্ষিক সমাবেশ চলাকালে শত শত মানুষ আহমদিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর হামলা চালায়।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ২০২৩ সালের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতাবিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় ‘দুজন নিহত এবং কয়েক ডজন মানুষ আহত’ হন। হামলাকারীরা বহু আহমদিয়া বাড়ি, একটি আহমদিয়া মসজিদ ও একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে লুটপাট চালায় এবং সেগুলো ধ্বংস করে।
এর আগে, একই বছরের শুরুতে গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া গ্রামের এক হিন্দু ব্যক্তির বাড়িতেও কয়েক শ মানুষ হামলা চালায়। অভিযোগ ছিল, ওই ব্যক্তি ফেসবুকে মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-কে অবমাননা করে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন। ওই পোস্টের প্রতিশোধ হিসেবে হামলাটি চালানো হয়।