পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ক্ষমতার অলিন্দে যে বড় ধরনের রদবদল ঘটে গেছে, তা কেবল একটি দল পরিবর্তন বা সরকার গঠনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে ২০৬টি আসনে অভাবনীয় জয়লাভ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটিয়েছে বিজেপি। এরপর গত ৯ মে রাজ্যের নবম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। আর দায়িত্ব গ্রহণের সপ্তাহ না পেরোতেই নতুন কট্টরপন্থী সরকার এমন এক সংবেদনশীল বিষয়ে হাত দিয়েছে, যা রাজ্যের সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর এক বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করেছে।
গত ১৩ মে (বুধবার) রাজ্যের স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং নজিরবিহীন ‘পাবলিক নোটিশ’ বা বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। এই নির্দেশিকায় সুপ্রিম কোর্ট এবং কলকাতা হাইকোর্টের পুরনো রায়ের দোহাই দিয়ে ‘পশ্চিমবঙ্গ পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৫০’ (West Bengal Animal Slaughter Control Act, 1950) অত্যন্ত কঠোরভাবে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আপাতদৃষ্টে এটিকে একটি সাধারণ প্রশাসনিক নিয়ম মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা শর্তগুলো আসন্ন ঈদুল আজহায় ওপার বাংলার মুসলিমদের ঐতিহ্যগত কোরবানি দেওয়াকে পরোক্ষভাবে এক প্রকার অসম্ভব করে তুলেছে।
সরকারি ওই বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, এখন থেকে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের দেওয়া ‘ফিটনেস সার্টিফিকেট’ বা বৈধ অনুমোদনপত্র ছাড়া কোনোভাবেই গরু, ষাঁড়, বলদ, বাছুর, পুরুষ বা স্ত্রী মহিষ এবং মহিষের বাচ্ছা জবাই করা যাবে না।
কিন্তু সবচেয়ে বড় লমহর্ষক এবং ধর্মীয় সংকটের জায়গাটি তৈরি হয়েছে এই সার্টিফিকেট পাওয়ার শর্তগুলো নিয়ে। নির্দেশিকা অনুযায়ী, কোনো পশুকে তখনই জবাইয়ের উপযুক্ত (Fit for slaughter) বলে ঘোষণা করা হবে এবং সার্টিফিকেট দেওয়া হবে, যখন:
১. পশুটির বয়স অন্তত ১৪ বছরের বেশি হবে এবং এটি কাজ বা প্রজননের অনুপযুক্ত হয়ে পড়বে।
২. অথবা, পশুটি বার্ধক্য, বড় কোনো আঘাত, বিকৃতি বা অন্য কোনো দুরারোগ্য ব্যাধির কারণে স্থায়ীভাবে অক্ষম বা পঙ্গু হয়ে যাবে।
এই সার্টিফিকেটটি যৌথভাবে স্বাক্ষর করে প্রদান করবেন সংশ্লিষ্ট পৌরসভার চেয়ারম্যান অথবা পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি এবং একজন সরকারি পশু চিকিৎসক (Veterinary Surgeon)। তাঁদের লিখিত ও সন্তোষজনক মতামতের ভিত্তিতেই কেবল এই ফিটনেস সার্টিফিকেট ইস্যু করা হবে।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই নতুন নিয়ম মূলত ইসলামি শরিয়তের কোরবানির মৌলিক রীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ইসলাম ধর্মের অমোঘ বিধান এবং রীতিনীতি অনুযায়ী, ঈদুল আজহায় কোরবানি করার জন্য একটি নিখুঁত, সুস্থ, সবল এবং ত্রুটিমুক্ত পশু নির্বাচন করা বাধ্যতামূলক। কোনো অন্ধ, খোঁড়া, রোগাক্রান্ত, বিকলাঙ্গ, স্থায়ীভাবে জখম বা অত্যন্ত বৃদ্ধ (দাঁতহীন বা জীর্ণ) পশু দিয়ে কোরবানি দেওয়া ইসলামি আইনে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
ঠিক এই জায়গাতেই শুভেন্দু অধিকারীর সরকার এক ভয়ংকর আইনি ফাঁদ পেতেছে। সরকারের আইন বলছে—সুস্থ, সবল ও নিখুঁত পশু কোরবানি দেওয়া যাবে না; কোরবানি করতে হলে পশুকে বিকলাঙ্গ, মারাত্মক অসুস্থ কিংবা ১৪ বছরের বুড়ো হতে হবে। অথচ ইসলামি নিয়ম অনুযায়ী তেমন পশু দিয়ে কোরবানিই হয় না। এর সোজা এবং পরিষ্কার অর্থ হলো—সরাসরি বা মুখে ‘কোরবানি নিষিদ্ধ’ কথাটি উচ্চারণ না করেও, আইনের এমন এক গোলকধাঁধা তৈরি করা হয়েছে যার ফলে পরোক্ষভাবে এবং আইনগতভাবে পশ্চিমবঙ্গে গরু বা মহিষ কোরবানি দেওয়া সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
আইনের কড়াকড়ি এখানেই শেষ নয়। বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়েছে যে, যদি কোনো পশুর জন্য অত্যন্ত অলৌকিকভাবে সার্টিফিকেট বা অনুমতি পাওয়াও যায়, তাহলেও সেই পশুকে কোনো খোলা জায়গায়, রাস্তায়, সাধারণের চোখের সামনে বা মহল্লায় জবাই করা যাবে না। কোরবানি দিতে হবে শুধুমাত্র সরকার অনুমোদিত নির্দিষ্ট কসাইখানায় (Municipal Slaughter House)।
যদি কেউ এই অদ্ভুত এবং অসম্ভব নিয়ম ভাঙার সাহস দেখায়, তবে তার বিরুদ্ধে ১৯৫০ সালের আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। এই নিয়ম অমান্য করলে অভিযুক্ত ব্যক্তির সর্বোচ্চ ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড, এক হাজার রুপি জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার স্পষ্ট বিধান রাখা হয়েছে। উপরন্তু, এই আইন ভঙ্গ করাকে ‘আমলযোগ্য অপরাধ’ (Cognizable Offence) হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, যার অর্থ পুলিশ ওয়ারেন্ট ছাড়াই যে কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারবে।
কোরবানির দিনগুলোতে যেকোনো বাড়িতে বা স্থানে পৌরসভার চেয়ারম্যান, পঞ্চায়েত সভাপতি বা সরকারি পশু চিকিৎসকের অনুমোদিত প্রতিনিধিরা যেকোনো সময় তল্লাশি চালাতে পারবেন। এই পরিদর্শন বা তল্লাশিতে কোনোভাবেই বাধা দেওয়া যাবে না। এর অর্থ হলো, কোরবানির দিনগুলোতে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে পুলিশ ও প্রশাসনের সাইরেনের শব্দ এবং আকস্মিক তল্লাশি এক চরম মনস্তাত্ত্বিক ভীতি তৈরি করবে।
যদিও সরকার একটি আপিলের সুযোগ রেখেছে যে, কেউ সার্টিফিকেট না পেলে ১৫ দিনের মধ্যে রাজ্য সরকারের কাছে আবেদন করতে পারবেন। কিন্তু ঈদের মাত্র বাকি কয়েকদিন, সেখানে ১৫ দিনের আপিল প্রক্রিয়ার কোনো কার্যকারিতা যে থাকবে না—তা সাধারণ মানুষও বোঝে।
কলকাতা হাইকোর্টের ২০১৮ সালের একটি মামলা এবং ২০২২ সালের কিছু নির্দেশিকাকে হাতিয়ার করে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার যে খেলায় মেতে উঠেছে, তা বাংলার দীর্ঘদিনের ধর্মীয় সম্প্রীতি ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতির ওপর এক বড় আঘাত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সমালোচকদের মতে, এই কঠোর নির্দেশিকা শুধুমাত্র পশুক্লেশ নিবারণের জন্য নয়; বরং এটি একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়কে মানসিকভাবে কোণঠাসা করার এবং তাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার রাজনৈতিক কৌশল।
একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশে ধর্মের মৌলিক অনুভূতির ওপর প্রশাসনের এমন পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞা বাংলার বুকে এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করছে। এই তীব্র গুমোট পরিস্থিতির শেষ কোথায়, তা এখনো নিশ্চিত নয়। ওপার বাংলার সংখ্যালঘু মুসলিম সমাজ কি এই অসম্ভব আইনের কাছে মাথা নত করবে, নাকি নতুন কোনো আইনি ও সামাজিক প্রতিবাদের জন্ম হবে—তা আগামী কয়েক দিনের অন্ধকার ও শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির ভেতরেই লুকিয়ে রয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি দেখে এটুকু স্পষ্ট যে, স্বাধীন ভারতে আজ পশ্চিমবঙ্গে নিজের ধর্মীয় সত্তা ধরে রাখা এক কঠিনতম পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।