• বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬, ০৭:৪১ পূর্বাহ্ন
Headline
বার্ধক্য বুড়ো বয়সে নয়- শুরু হয় আজ: সাতটি সতর্কবার্তা রেলযাত্রায় আসছে বৈদ্যুতিক ট্রেন, মেগা সেতুসহ মহাসড়কে এক্সপ্রেসওয়ে গ্রিডের ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর শুভেন্দুর ‘ডিপোর্ট’ নীতি মানবাধিকারের লঙ্ঘন: এইচআরডব্লিউ চালের বাজারে কোনো ঊর্ধ্বগতি নেই: বাণিজ্যমন্ত্রী দেশের ৭৫টি কারাগারে ধারণক্ষমতার ১.৭ গুণ বন্দি রয়েছে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জনগণের অর্থ পাচার হতে দেওয়া হবে না, সতর্ক করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে দেশব্যাপী ক্রিয়েটিভ হাবের পরিকল্পনা সরকারের ভিকটিম ব্লেমিং বন্ধ ও সাইবার সুরক্ষার তাগিদ প্রভার এআই ট্রাফিক মামলার আড়ালে ভয়ঙ্কর সাইবার জালিয়াতি ১৫ কোটি রুপি ও প্রাইভেট জেটে এমপি ‘বিক্রি’ হচ্ছে ভারতে: সঞ্জয় রাউত

আগামী ৫ বছরেই শোধ করতে হবে ২৬ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি ঋণ!

Reporter Name / ৮১ Time View
Update : সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনীতি এক অভূতপূর্ব ও কঠিন চাপের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। একদিকে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়ের নাজুক অবস্থা, অন্যদিকে আগামী পাঁচ বছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পাহাড়সম চাপ—সব মিলিয়ে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে এক অশনিসংকেত দেখা দিয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছর থেকে শুরু করে ২০২৯-৩০ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশকে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি ঋণ পরিশোধ করতে হবে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে একটি ঐতিহাসিক পরিসংখ্যানই যথেষ্ট: ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর থেকে গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশ মোট বিদেশি ঋণ শোধ করেছে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার। আর এখন সেই টাকার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই পরিশোধ করতে হবে মাত্র ৫ বছরের সংক্ষিপ্ত নোটিশে!

কেন হঠাৎ ঋণের এত চাপ?

এই বিপুল পরিমাণ ঋণ পরিশোধের চাপ হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে বেশ কিছু কাঠামোগত ও কৌশলগত কারণ:

  • গ্রেস পিরিয়ড শেষ: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পদ্মা রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল এবং ঢাকা মেট্রোরেলের মতো মেগা প্রকল্পগুলো বিদেশি ঋণে করা হয়েছে। এসব ঋণের ‘গ্রেস পিরিয়ড’ (কিস্তি শুরুর আগের সময়) এখন শেষের পথে বা শেষ হয়ে গেছে। ফলে এখন ঋণের আসল টাকা পরিশোধ শুরু হয়েছে।

  • প্রকল্পের ধীরগতি: অনেক প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি। রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র বা সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিংয়ের মতো মেগা প্রকল্পগুলো থেকে এখনো প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল আসা শুরু হয়নি। ফলে আয়ের আগেই ঋণের কিস্তি গুনতে হচ্ছে।

  • কোভিডকালীন ঋণ: মহামারি মোকাবিলার জন্য নেওয়া বাজেট সহায়তার ঋণগুলোরও পরিশোধকাল শুরু হয়ে যাওয়ায় চাপ আরও ঘনীভূত হয়েছে।

পরিসংখ্যান কী বলছে?

ইআরডির সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিদেশি ঋণের চিত্র বেশ উদ্বেগজনক:

  • মোট ঋণ: আগামী ৩০ জুন ২০২৫ পর্যন্ত দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ৭৭.২৮ বিলিয়ন ডলারে (যা এক বছর আগে ছিল ৬৮.৮২ বিলিয়ন ডলার)।

  • সর্বোচ্চ চাপের বছর: ২০২৯-৩০ অর্থবছর হবে ঋণ পরিশোধের সবচেয়ে কঠিন সময়। ওই বছর একাই ৫.৫ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হবে।

  • দীর্ঘমেয়াদি দায়: যদি আজ থেকে নতুন করে আর কোনো ঋণ নাও নেওয়া হয়, তবুও বর্তমান ঋণ পুরোপুরি শোধ করতে বাংলাদেশের সময় লাগবে অন্তত ৩৭ বছর (২০৬২-৬৩ অর্থবছর পর্যন্ত)।

অর্থনীতির দুর্বল ভিত্তি ও ঝুঁকি

ঋণ শোধের এই পাহাড়সম চাপের বিপরীতে সরকারের হাত বেশ খালি। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানে ৭ শতাংশের নিচে, যা সমমানের অর্থনীতিগুলোর মধ্যে বৈশ্বিকভাবে সর্বনিম্ন। এছাড়া কোভিড মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্সের প্রবাহও বারবার হোঁচট খাচ্ছে।

আইএমএফ-এর মতে, রাজস্বের তুলনায় ঋণের অনুপাত ১৮ শতাংশের নিচে থাকা নিরাপদ। কিন্তু বাংলাদেশে এই অনুপাত ১৬.৫৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৬.৯২ শতাংশে পৌঁছে গেছে, যা বিপৎসীমার খুব কাছাকাছি। ইআরডি সতর্ক করেছে যে, জরুরি ভিত্তিতে রাজস্ব আয় না বাড়ালে বাংলাদেশ ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে তার বর্তমান “স্বস্তিকর অবস্থান” হারাতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের সতর্কতা ও উত্তরণের পথ

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন এই পরিস্থিতিকে ‘অনিবার্য বাস্তবতা’ আখ্যা দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ এখনো কোনো ঋণে খেলাপি হয়নি ঠিকই, কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক মন্দা এবং স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের এই সন্ধিক্ষণে এই রেকর্ড ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। তিনি জ্বালানি খাতে ঋণনির্ভর প্রকল্প বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কঠোর হওয়ার পরামর্শ দেন।

অন্যদিকে, ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক মুস্তফা কে মুজেরী পরিস্থিতি সামাল দিতে চারটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন:

১. রপ্তানি বহুমুখীকরণ: শুধু পোশাক খাতের ওপর নির্ভর না করে কৃষিপণ্য, চামড়া ও হালকা প্রকৌশল খাতে জোর দেওয়া।

২. দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি: বৈশ্বিক চাহিদার সাথে মিল রেখে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা, যাতে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ে।

৩. কর ব্যবস্থার সংস্কার: কর ফাঁকি রোধ করে রাজস্ব আয় বাড়ানো।

৪. জ্বালানি নিরাপত্তা: শিল্পের চাকা সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা।

সামনের দিনগুলোতে এই বিপুল ঋণ পরিশোধ করে অর্থনীতিকে সচল রাখাই হবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সরকার এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কীভাবে রাজস্ব আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ায়, তার ওপরই নির্ভর করছে দেশের আগামী দশকের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category