ব্যাংক খাতের সংস্কার প্রক্রিয়ায় নতুন মোড়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পাশ হওয়া ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ’ সংশোধন করে সংসদে নতুন বিল পাশ হওয়ায় একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংক পুনরায় আগের মালিকদের অধীনে ফেরার আইনি সুযোগ তৈরি হয়েছে। গত শুক্রবার সংসদে ১৮(ক) ধারা সংযুক্ত করে এই বিলটি পাশ হয়।
নতুন আইনের বিধান অনুযায়ী, একীভূত ব্যাংক পরিচালনার জন্য এ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকার যে পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছে, তার সাড়ে ৭ শতাংশ (৭.৫%) অর্থ পরিশোধ করে আগের মালিকরা এর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে পারবেন। আবেদনের সময় এই অর্থ পে-অর্ডারের মাধ্যমে জমা দিতে হবে এবং অবশিষ্ট ৯২.৫ শতাংশ অর্থ পরবর্তী দুই বছরের মধ্যে ১০ শতাংশ হারে সুদসহ ফেরত দিতে হবে।
ব্যাংক পুনরায় বুঝে নিতে আগ্রহী শেয়ারহোল্ডারদের বাংলাদেশ ব্যাংক বরাবর আবেদন করতে হবে এবং একটি পৃথক অঙ্গীকারনামা জমা দিতে হবে। অঙ্গীকারের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি শর্ত হলো:
আমানতকারীদের দায় নিষ্পত্তি করা।
সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সব পাওনা যথাসময়ে পরিশোধ।
ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ ও কমপ্লায়েন্স কাঠামো পুনর্গঠন ও শক্তিশালী করা।
রেজল্যুশন কার্যক্রম চলাকালে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া।
ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ-২০২৫-এর আওতায় গত বছর শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংক— এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, ইউনিয়ন ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়েছিল। তবে ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা বর্তমানে বেশ নাজুক:
খেলাপি ঋণ: এই পাঁচটি ব্যাংকের মোট ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৯৬ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা, যার মধ্যে খেলাপি হয়ে পড়েছে ১ লাখ ৬৯ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা (অর্থাৎ প্রায় ৮৬.২৭%)।
মূলধন ঘাটতি: ব্যাংক খাতের মোট মূলধন ঘাটতির অর্ধেকের বেশি এই ৫ ব্যাংকের। এর মধ্যে ইউনিয়ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ সর্বোচ্চ ৯৭.৬৪ শতাংশ।
জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক অভ্যন্তরীণ বৈঠকে এই ধারা সংযোজনের বিপক্ষে মত দিয়েছিল। সংসদ অধিবেশনেও বিরোধী দল এই বিলের ওপর আপত্তি জানিয়েছিল। বিশেষ করে, ব্যাংকগুলোকে দেউলিয়া হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে বিপুল অর্থ (যেমন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি মেটাতে ২০ হাজার কোটি টাকা) দিয়েছে, তার মাত্র ৭.৫ শতাংশ দিয়ে মালিকানা ফেরত দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম মনে করেন, কেন এই তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে তা পরিষ্কার নয় এবং এর ফল ভালো নাও হতে পারে।
আবেদন মঞ্জুর হওয়ার তিন মাসের মধ্যে পূর্ববর্তী শেয়ার ও সম্পদ-দায়ের দখল হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হবে। তবে মালিকানা ফিরে পাওয়ার পরও নিয়ন্ত্রক সংস্থার আরোপিত শেয়ার হস্তান্তর বা বিক্রির ওপর বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে।