• বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৫:৪৪ অপরাহ্ন

ইউপি নির্বাচন ঘিরে দলগুলোতে অভ্যন্তরীণ কোন্দল

Reporter Name / ২ Time View
Update : বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬

আসন্ন অক্টোবর মাস থেকে শুরু হতে যাওয়া ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে নতুন করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দামামা বাজতে চলেছে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) এই তৃণমূল পর্যায়ের ভোট উৎসব সুচারুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে ইতিমধ্যে প্রশাসনিক ও কারিগরি স্তরে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করেছে। কেন্দ্রীয় এই তৎপরতার সাথে তাল মিলিয়ে গ্রামীণ জনপদেও সম্ভাব্য প্রার্থীদের রাজনৈতিক তৎপরতা ও দৌড়ঝাঁপ তুঙ্গে উঠেছে। কোনো কোনো প্রার্থী প্রকাশ্য জনসভার মাধ্যমে, আবার কেউ কেউ নীরবে ঘরে ঘরে গিয়ে ভোটারদের সাথে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন। রাজনৈতিকভাবে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের কিছু স্থানীয় নেতাকর্মীও নির্দলীয় আবরণে এই নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন বলে মাঠপর্যায়ে জোর আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তবে দৈবচয়নের ভিত্তিতে দেশের ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ জেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের রাজনৈতিক চিত্র খতিয়ে দেখে জানা গেছে, এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৃণমূল পর্যায়ে বড় দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও গ্রুপিং এখন পুরোপুরি প্রকাশ্যে রূপ নিয়েছে।

বিশেষ করে মাঠের প্রধান দল বিএনপির সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীদের মধ্যেকার অন্তঃকোন্দল ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বহু ইউনিয়নে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। কোথাও কোথাও জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মতো দলগুলোও এই অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বাইরে থাকতে পারছে না। যদিও আইনি কাঠামোর দিক থেকে এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনটি সম্পূর্ণ নির্দলীয় ও প্রতীকবিহীন পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তবুও স্থানীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটারদের ধারণা, পরোক্ষ দলীয় সমর্থনই এই ভোটের মূল ভাগ্য নির্ধারণ করবে। সে কারণে দলগুলোর স্থানীয় নীতিনির্ধারকেরা বলছেন, কেন্দ্রের পক্ষ থেকে কোন্দল নিরসন করে একক প্রার্থী ঘোষণা করা না গেলে ভোটের মাঠে এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং তৃণমূলের শৃঙ্খলা ধরে রাখা কঠিন হবে। এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসন ও একক প্রার্থী নিশ্চিত করা ক্ষমতাসীন দল বিএনপির জন্য এক বিশাল রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। জামায়াতও এই সম্ভাব্য বিদ্রোহী প্রার্থী সামলানোর চ্যালেঞ্জের বাইরে নেই। তবে বিএনপি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা না করলেও, জামায়াত ও এনসিপি বেশ কিছু ইউনিয়নে তাদের সমর্থিত একক প্রার্থীদের নাম ও পরিচয় আগাম ঘোষণা করে মাঠ গরম করতে শুরু করেছে।

চাঁদপুর জেলার নির্বাচনী চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এখানকার পাঁচটি সংসদীয় আসনের মধ্যে চারটিতে বিএনপির প্রার্থীরা দলীয় প্রতীকে বিজয়ী হলেও চাঁদপুর-৪ (ফরিদগঞ্জ) আসনে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়া বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী এম এ হান্নান জয়ী হন। এই ঘটনার পর তাঁকে দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয় এবং ওই আসনে বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের সমস্ত সক্রিয় কমিটি বাতিল করা হয়। এরপর থেকেই ফরিদগঞ্জ আসনে বিএনপির রাজনৈতিক বিভাজন ও চরম গ্রুপিং স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই আসনের রূপসা উত্তর ইউনিয়নে যেমন বিএনপির দুই শক্তিশালী গ্রুপ থেকে যথাক্রমে বিল্লাল হোসেন ও ফারুক হোসেন দলীয় সমর্থনের আশায় পৃথকভাবে প্রচারণা চালাচ্ছেন। অন্যদিকে, এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আওয়ামী লীগের সাবেক চেয়ারম্যান এস এম কাউছার উল আলমও স্বতন্ত্র পরিচয়ে প্রার্থী হতে তলে তলে ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। এই ইউনিয়নে জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য একক প্রার্থী কফিল উদ্দিন। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে সংসদ সদস্য এম এ হান্নান বলেন, জামায়াত ইতিমধ্যে তাদের প্রার্থী ঘোষণা করে দেওয়ায় এখন সবার আগে ফরিদগঞ্জের ১৫টি ইউনিয়নে বিএনপির জনপ্রিয় ব্যক্তিদের মধ্য থেকে একক প্রার্থী চূড়ান্ত করতে হবে। অজনপ্রিয় কাউকে চাপিয়ে দিলে কর্মীরা তা মানবে না, যা দলের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে। তবে জেলা বিএনপির সভাপতি শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক এই গ্রুপিংকে কেবলই একটি ‘সুস্থ প্রতিযোগিতা’ হিসেবে উল্লেখ করে দাবি করেন, শেষ মুহূর্তে দলের সিনিয়রদের অনুরোধে অনেকেই মাঠ থেকে সরে দাঁড়াবেন।

এদিকে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতক্ষীরা জেলার সবকটি আসনে জয়লাভ করা জামায়াতে ইসলামীর ঘাঁটিতেও ইউপি নির্বাচন ঘিরে চাপা উত্তেজনা চলছে। সাতক্ষীরা-১ আসনের কলারোয়া উপজেলার সোনাবাড়িয়া ইউনিয়নে এখন বিএনপি ও জামায়াতের তিন সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী ভোটের মাঠে সমানভাবে সক্রিয়। এখানে এনসিপির কোনো সাংগঠনিক কার্যক্রম না থাকলেও বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা দুই গ্রুপে বিভক্ত হয়ে একে অপরের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছেন, যার প্রভাব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও স্পষ্ট। স্থানীয় কর্মীদের অভিযোগ, সেখানে গ্রুপিংয়ের মাত্রা এতটাই তীব্র যে এক গ্রুপ অন্য গ্রুপের প্রার্থীকে পরাজিত করতে প্রতিপক্ষের সাথেও আঁতাত করতে পারে। এই ইউনিয়ন থেকে বিএনপির শহিদুল ইসলাম ও মোখলেসুর রহমান দলটির সমর্থনপ্রত্যাশী। সাতক্ষীরা সদর আসনের ঝাউডাঙ্গা ইউনিয়নেও বিএনপি থেকে সাবেক চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম ও কামরুজ্জামান রানাসহ চারজন হেভিওয়েট নেতা মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন, যার বিপরীতে জামায়াতের একক প্রার্থী ইকবাল হোসেন সুসংগঠিতভাবে প্রচার চালাচ্ছেন। সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আবু জাহিদ ডাবলু সতর্ক করে বলেছেন, সাতক্ষীরার প্রায় সব ইউনিয়নে বিএনপির দুটি গ্রুপ সক্রিয়। দল দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা না নিলে নির্বাচনে বড় ধরণের বিপর্যয় ঘটবে এবং প্রতিপক্ষরা এই সুযোগের পূর্ণ ফায়দা তুলবে।

কিশোরগঞ্জ ও জামালপুর জেলার স্থানীয় রাজনীতিতেও এই ইউপি নির্বাচনকে ঘিরে বহুমুখী মেরুকরণ দেখা যাচ্ছে। কিশোরগঞ্জের ১০৮টি ইউনিয়নে প্রতি পদের বিপরীতে বিএনপির একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী মাঠে সক্রিয় থাকায় দলের চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এছাড়া এখানে এনসিপি প্রায় ৬০ থেকে ৭০টি ইউনিয়নে একক প্রার্থী দেওয়ার জন্য কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে। জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার মাহমুদপুর ও ঘোষেরপাড়া ইউনিয়নেও বিএনপির ৫ থেকে ৬ জন করে শীর্ষ স্থানীয় নেতা চেয়ারম্যান পদের জন্য নিজেদের প্রার্থী ঘোষণা করে ব্যানার-ফেস্টুন টানিয়েছেন। অন্যদিকে, নরসিংদী জেলার ৭১টি ইউনিয়নের চিনিশপুরসহ প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নেই বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থীরা নিজেদের শক্তির জানান দিচ্ছেন। চিনিশপুর ইউনিয়নে স্বয়ং জেলা বিএনপির সভাপতি সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকনের নির্বাচনী এলাকা হওয়ায় এখানে কোন্দল নিরসনে বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। খায়রুল কবির খোকন এ বিষয়ে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বিগত দীর্ঘ এক দশকে ফ্যাসিবাদের কারণে যেহেতু বিএনপির কেউ স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেননি, তাই এবার অনেকেরই আগ্রহ রয়েছে। তবে কেন্দ্র থেকে একক প্রার্থী ঘোষণার পর যদি কেউ দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হন, তবে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

তথ্যসূত্র: কালের কন্ঠ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category