• শুক্রবার, ০৮ মে ২০২৬, ০৪:১৩ অপরাহ্ন
Headline
ভর্তুকির মরণফাঁদ ও ৬৮ বিদ্যুৎকেন্দ্র: ‘গলার কাঁটা’ সরাতে বিদ্যুৎ বিভাগের কূটনৈতিক অপারেশন শব্দের গতির ২৫ গুণ বেগে ছুটবে তুরস্কের নতুন আন্তর্মহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র ‘ইয়িলদিরিমহান’ দেশের পথে ফ্লোরিডায় নিহত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বৃষ্টির মরদেহ, শনিবার পৌঁছাবে ঢাকায় নেত্রকোণায় মাদরাসাছাত্রী ধর্ষণ: গণমাধ্যমে কথা বলায় নারী চিকিৎসককে গণধর্ষণ ও হত্যার হুমকি গণ-অভ্যুত্থান নয়, হাসনাত-সারজিসের চাওয়া ছিল আওয়ামী লীগের টিকে থাকা: রাশেদ খান পশ্চিমবঙ্গে নজিরবিহীন রাজনৈতিক অচলাবস্থা: বিধানসভা বিলুপ্ত, মমতার সামনে বিকল্প কী? ট্রাম্প প্রশাসনের বড় ধাক্কা: ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ককে ‘অবৈধ’ ঘোষণা মার্কিন আদালতের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের প্রস্তুতি: ব্যাংককে ১৫ দিনের ক্যাম্পে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল হরমুজ প্রণালিতে আটকা ১৬০০ বাণিজ্যিক জাহাজ: সংকটে বাংলাদেশমুখী জ্বালানি সরবরাহ সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এআই ক্যামেরা: আইন ভাঙলেই স্বয়ংক্রিয় মামলা

কারাগারে বিপন্ন শৈশব: মায়েদের সঙ্গে বন্দি ৩০০ শিশু

Reporter Name / ৫ Time View
Update : শুক্রবার, ৮ মে, ২০২৬

একটি শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন উন্মুক্ত আকাশ, রঙিন খেলার সাথী আর সমাজের বিচিত্র রূপ। কিন্তু বাংলাদেশের অন্ধকার প্রকোষ্ঠের ভেতরে এমন একদল শিশু বেড়ে উঠছে, যাদের কাছে ‘পৃথিবী’ মানেই চার দেয়ালের সীমানা, আর ‘সমাজ’ মানেই কয়েদি ও রক্ষীদের ভিড়। কোনো অপরাধ না করেও জন্ম থেকে কিংবা অতি শৈশবে মায়ের সঙ্গে কারাগারে নিক্ষিপ্ত এই শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক বিকাশে তৈরি হচ্ছে অপূরণীয় ক্ষত। দেশের বিভিন্ন কারাগারে বর্তমানে ২৯৯ জন শিশু মায়েদের সঙ্গে জীবন কাটাচ্ছে, যাদের শৈশব চার দেয়ালের ঘেরাটোপে পিষ্ট হচ্ছে।

অন্ধকার প্রকোষ্ঠে শৈশবের মনস্তাত্ত্বিক বিনাশ

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, শিশুর তিন থেকে ছয় বছর বয়স পর্যন্ত সময়টি তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক বিকাশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে তারা পরিবেশ থেকে ভাষা, সামাজিক সম্পর্ক এবং নৈতিকতা শেখে। কিন্তু কারাগারের রুদ্ধ পরিবেশে এই শিশুদের জগত অত্যন্ত সংকীর্ণ। তারা বাইরের জগত সম্পর্কে কোনো ধারণা পায় না। তারা জানে না ঘাস কী, রিকশা কেমন কিংবা সাধারণ একটি পরিবার কীভাবে চলে। তাদের একমাত্র জগত হলো মা এবং পাশের সেলের অন্য অপরাধীরা।

কারাগারে দীর্ঘস্থায়ী বসবাসের ফলে এই শিশুদের মধ্যে ‘ইনস্টিটিউশনালাইজড সিনড্রোম’ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তারা বাইরের জগতের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে ভয় পায় এবং অপরাধী চক্রের সংস্পর্শে থাকায় তাদের অবচেতন মনে অপরাধমূলক আচরণের প্রতি এক ধরনের স্বাভাবিকতা তৈরি হয়। কারাগারের রুদ্ধ কক্ষ, লোহার গারদ আর বন্দিদের হাহাকার তাদের কোমল মনে স্থায়ী ট্রমা তৈরি করছে, যা ভবিষ্যতে তাদের স্বাভাবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

পরিসংখ্যানের আয়নায় কারাবন্দি শিশুরা

কারা অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান (২৬ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত) অনুযায়ী, দেশের ৭৪টি কারাগারে ২৯৯ জন শিশু মায়েদের সঙ্গে অবস্থান করছে। এদের মধ্যে কন্যাশিশুর সংখ্যা ১৫৩ এবং ছেলেশিশু ১৪৬। বিভাগওয়ারী বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে ১৮টি কারাগারে সর্বোচ্চ ১০০ জন শিশু রয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগে ৯০ জন, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে যথাক্রমে ২৫ জন করে এবং সিলেট বিভাগে ১৯ জন শিশু কারাবন্দি। খুলনা ও বরিশাল বিভাগে যথাক্রমে ২০ ও ৪ জন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ১৩ জন শিশু রয়েছে।

বিশেষ করে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারে শিশুদের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি। সেখানে ৫১ জন শিশু মায়েদের সঙ্গে বসবাস করছে। এই শিশুদের মায়েদের বেশিরভাগই মাদক অথবা হত্যা মামলার আসামি। মায়েদের শাস্তির সমান্তরালে এই শিশুরা যে দণ্ড ভোগ করছে, তা কেবল আইনি নয়, বরং মানবিক কাঠামোর চরম ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।

ফাঁসির সেলে বেড়ে ওঠা: একটি করুণ দৃষ্টান্ত

সোনাগাজীর কামরুন নাহার মনির উদাহরণটি এখানে প্রণিধানযোগ্য। মাত্র ১৯ বছর বয়সে ২০১৯ সালে তিনি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। সেই সময় তাঁর কোলে ছিল মাত্র এক মাসের এক শিশুকন্যা। আজ ছয় বছর কেটে গেছে, কিন্তু মনির আপিল মামলা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। শিশুটি এখন ছয় বছরে পা দিয়েছে এবং তার পুরো জীবনটিই কেটেছে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারের ফাঁসির সেলে (কনডেম সেল)।

জেল কোড অনুযায়ী, ছয় বছর বয়সের পর কোনো শিশু আর কারাগারে থাকতে পারে না। কিন্তু যে শিশুটি বাইরের রোদ-বৃষ্টির বদলে কেবল অন্ধকূপ চিনে বড় হয়েছে, তাকে হঠাৎ সমাজসেবা অধিদপ্তর বা কোনো অজানা স্বজনের হাতে সোপর্দ করা হলে তার মানসিক অবস্থা কী দাঁড়াবে—সে উত্তর কারোরই জানা নেই। এই শিশুটি কারাগারে কেবল তার মা নয়, অন্য এক ফাঁসির আসামিকে ‘ছোট মা’ বলে ডাকে। এই বিকৃত সামাজিক কাঠামোতেই তার শৈশবের ভিত তৈরি হচ্ছে।

বিকাশে বাধার পাহাড়: শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বিনোদনের অভাব

কারা কর্তৃপক্ষ দাবি করে যে, তারা শিশুদের পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেয়। জেল কোড অনুযায়ী শিশুদের জন্য ডিম, দুধ, কলা ও বিশেষ খাবার দেওয়া হয়। কিন্তু একটি শিশুর বিকাশে কেবল খাবারই যথেষ্ট নয়।

১. শিক্ষার অভাব: কারাগারে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্কুলের ব্যবস্থা নেই। অধিকাংশ জেলা কারাগারে কোনো শিক্ষক নেই। শিক্ষিত কয়েদিরা মাঝে মাঝে শিশুদের পাঠদান করেন, যা কোনোক্রমেই মানসম্মত শিক্ষার বিকল্প হতে পারে না।

২. বিনোদনের সংকট: কেন্দ্রীয় কারাগারগুলোতে ছোট ডে-কেয়ার সেন্টার থাকলেও জেলা কারাগারগুলোতে শিশুরা গাদাগাদি করে সেলের ভেতরে থাকে। খেলাধুলার কোনো পর্যাপ্ত মাঠ বা সরঞ্জাম সেখানে নেই।

৩. পেশাদার অপরাধীর সংস্পর্শ: শিশুদের থাকতে হয় এমন সব ওয়ার্ডে যেখানে হত্যা, ডাকাতি বা মাদক কারবারের আসামিরা থাকে। বড়দের এসব নেতিবাচক কথাবার্তা ও আচরণ শিশুদের মনে গভীর রেখাপাত করে।

৪. চিকিৎসা সংকট: শিশুরা অসুস্থ হলে কারাগারের সীমাবদ্ধ চিকিৎসার মধ্যে তাদের জীবন বিপন্ন হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য বাইরের হাসপাতালে নেওয়ার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত দীর্ঘ ও জটিল।

পারিবারিক ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা

কারাগারে থাকা শিশুদের নানি বা দাদিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় এক দীর্ঘশ্বাসের গল্প। কামরুন নাহার মনির মা নুর নাহার জানান, মামলার খরচ চালাতে গিয়ে তাঁরা আজ নিঃস্ব। ঋণের জালে জর্জরিত পরিবারটি নাতনিকে দেখতে যাওয়ার সামর্থ্যও হারিয়ে ফেলেছে। শিশুটি বাইরের সমাজ সম্পর্কে কিছুই জানে না। যখন এই শিশুরা ছয় বছর বয়সে কারাগার থেকে বের হবে, তখন তাদের জন্য কোনো সঠিক পুনর্বাসন পরিকল্পনা রাষ্ট্রের নেই। অনেক শিশু স্বজনদের কাছে আশ্রয় পায় না, ফলে তাদের জায়গা হয় এতিমখানায় বা সরকারি শিশুনিবাসে। মায়ের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং অপরিচিত পরিবেশে নিক্ষিপ্ত হওয়া এই শিশুদের জীবনের দ্বিতীয় ট্রমা হয়ে দাঁড়ায়।

আইনি জটিলতা ও বিকল্পের সন্ধান

বাংলাদেশে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৭ ধারায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, নারী, শিশু এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের জামিন দেওয়ার ক্ষেত্রে আদালত নমনীয় হতে পারেন। এমনকি গর্ভবতী নারী বা দুগ্ধপোষ্য সন্তানের মায়েদের ক্ষেত্রেও বিশেষ বিবেচনার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু উচ্চতর আদালতের নির্দেশনা সত্ত্বেও মাঠ পর্যায়ে এর প্রয়োগ খুবই নগণ্য।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা শিশুদের এই ‘নিষ্পাপ কারাবাস’-এর প্রধান কারণ। একটি মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে যদি দুই দশক সময় লাগে, তবে সেই শিশুর শৈশব ও কৈশোর কারাগারেই বিলীন হয়ে যায়। ১৯৬১ সালের ‘প্রবেশন অফেন্ডার্স অ্যাক্ট’ অনুযায়ী লঘু অপরাধে অপরাধীদের কারাগারে না পাঠিয়ে প্রবেশনে নিজ বাড়িতে রাখার বিধান থাকলেও আমাদের বিচারিক ব্যবস্থায় এর চর্চা অত্যন্ত কম।

বিশ্লেষকদের অভিমত

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও শিশু অধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসানের মতে, এটি রাষ্ট্রের মানবিক দায়বদ্ধতার একটি বড় প্রশ্ন। শুধুমাত্র মায়ের অপরাধের জন্য একটি শিশুকে কারাগারের কালকুঠুরিতে রাখা আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সনদের (CRC) পরিপন্থী। তিনি প্রস্তাব করেন, মায়েদের বিচার চলাকালীন শিশুদের জন্য আলাদা ‘হাফ-ওয়ে হোম’ বা বিশেষায়িত আবাসস্থলের ব্যবস্থা করা উচিত, যেখানে মায়ের সংস্পর্শও থাকবে আবার শিশুটি একটি স্বাভাবিক পরিবেশে বড় হতে পারবে।

ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান মনে করেন, প্রথমবার অপরাধী হওয়া মায়েদের ক্ষেত্রে জামিনের ব্যবস্থা করা এবং জেলা কারাগারগুলোর পরিবেশ আমূল পরিবর্তন করা জরুরি। অন্যথায় আমরা কারাগারের ভেতরে একদল ‘ভবিষ্যৎ অপরাধী’ তৈরি করছি, যাদের মনে সমাজের প্রতি কেবল ঘৃণাই জমা হবে।

কারাগারে বন্দি এই ২৯৯টি শিশু কেবল একটি সংখ্যা নয়, এরা এক একটি হারানো সম্ভাবনা। রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থার ত্রুটি এবং সামাজিক কাঠামোর দুর্বলতার বলি হচ্ছে এই নিষ্পাপ প্রাণগুলো। অপরাধের বিচার হোক, কিন্তু সেই বিচারের ছায়া যেন শিশুর শৈশবকে গ্রাস না করে। কারাগারগুলোকে সত্যিকার অর্থে ‘সংশোধন কেন্দ্র’ হিসেবে গড়ে তোলা এবং শিশুদের জন্য কারাগারের বাইরে বিকল্প কোনো নিরাপদ ব্যবস্থার কথা ভাবা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, ‘বিপন্ন শৈশব’ এক সময় ‘বিপজ্জনক নাগরিক’ হিসেবে সমাজে ফিরে আসতে পারে।

তথ্যসূত্র: দেশ রূপান্তর, কারা অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট কারাগারগুলোর প্রশাসনিক ডাটাবেস।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category