• শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৩২ অপরাহ্ন
Headline
এআই নজরদারিসহ নতুন অবকাঠামোয় বদলে যাচ্ছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে ২০২৭ সালের হজ নিবন্ধন কার্যক্রম সারাদেশে ৩ মাসব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ অভিযান শুরু কাল, উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী প্রতিরক্ষায় ৪২ হাজার কোটি টাকার বাজেট: অবকাঠামোগত জৌলুস বনাম আধুনিক যুদ্ধপ্রযুক্তির সক্ষমতা সংকট জাপানি ঋণে সুদ ৫ বছরে ৪ গুণ কী লুকাচ্ছে রূপপুর? ২২০ আশ্রয়কেন্দ্রেই বিকল সোলার সিস্টেম: অবহেলায় নষ্ট শত শত কোটি টাকার সৌর প্রযুক্তি বিহারের আপত্তি বনাম ঢাকার অধিকার: কোন পথে গঙ্গাচুক্তি? টুইন টাওয়ারের ছাই থেকে ভূরাজনীতির নতুন মানচিত্র: নাইন ইলেভেনের ২৫ বছর রাজপথে নতুন মেরুকরণ: বিভাগীয় লংমার্চে জামায়াত ও এনসিপির শক্তি পরীক্ষার রাজনীতি

জাপানি ঋণে সুদ ৫ বছরে ৪ গুণ

Reporter Name / ০ Time View
Update : শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বাংলাদেশের প্রধান প্রধান ভৌত অবকাঠামো বিনির্মাণের ক্ষেত্রে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) দীর্ঘদিন ধরে ছিল নির্ভরতা ও স্বল্প সুদের এক অনন্য প্রতীক| মাত্র শূন্য দশমিক ছয় শতাংশের মতো নামমাত্র সুদ, দীর্ঘ কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা এবং কাজের গুণগত মানের কারণে নীতিনির্ধারকদের কাছে জাপানি ঋণই ছিল প্রথম পছন্দ| তবে গত পাঁচ বছরে সেই সমীকরণ নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে| যে ঋণের খরচ একসময় এক শতাংশেরও নিচে ছিল, তা আজ পাঁচ গুণেরও বেশি বেড়ে তিন শতাংশের মাইলফলক ছাড়িয়ে গেছে| চলতি বছরের শেষ নাগাদ সুদের এই পারদ সাড়ে তিন শতাংশ স্পর্শ করতে পারে বলে খোদ অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরাই আশঙ্কা করছেন| জাইকা প্রতি ছয় মাস পরপর তাদের অর্থায়নের সুদের হার পুনর্মূল্যায়ন করে থাকে এবং চলতি সেপ্টেম্বর মাসের শেষে অনুষ্ঠেয় নতুন পর্যালোচনায় এই খরচ আরও বেড়ে যাওয়ার জোরালো ইঙ্গিত মিলছে| ফলে দেশের সামগ্রিক বৈদেশিক ঋণের বাজারে দীর্ঘদিনের ‘সবচেয়ে সস্তা ও নিরাপদ’ বলে পরিচিত জাপানি অর্থায়ন এখন নজিরবিহীন আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়েছে|
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২০ সাল নাগাদও জাপানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত আটটি উন্নয়ন ঋণ চুক্তির মধ্যে সাতটিতেই সুদের হার নির্ধারিত ছিল মাত্র ০.৬ শতাংশ| বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু নির্মাণ, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মেট্রোরেল লাইন-৫-এর মতো মেগা প্রকল্পগুলোর প্রাথমিক অর্থায়ন হয়েছিল এই সুবিধাজনক সুদের কাঠামোর আওতায়| তবে মহামারি-পরবর্তী বিশ্ব অর্থনীতি ও সুদের হারের বৈশ্বিক ঊর্ধ্বগতির ধাক্কায় ২০২২ সাল থেকেই শুরু হয় খরচের উল্টো গণনা| ২০২২ সালে এই ঋণের সুদ বেড়ে ০.৭ শতাংশে দাঁড়ায়, যা ২০২৩ সালে লাফিয়ে ১.২ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ১.৭ শতাংশে উন্নীত হয়| গত বছর এই হার ২ শতাংশ অতিক্রম করে এবং চলতি বছরের জুন মাসে বাজেট সহায়তার জন্য নেওয়া ৩১ কোটি ৪০ লাখ ডলারের ঋণে সুদের হার ধরা হয়েছে রেকর্ড ৩.০৫ শতাংশ| অর্থাৎ মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে জাপানি ঋণের সুদ চার গুণেরও বেশি বেড়েছে, যা বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ভবিষ্যৎ চাপকে বহুগুণ ভারী করে তুলেছে|
সুদের হার বাড়লেও জাপান থেকে ঋণ নেওয়া কি সরাসরি আর্থিক ক্ষতি—এমন প্রশ্নের উত্তর কেবল সুদের হারের অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়| আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ক্ষেত্রে ঋণের সামগ্রিক ব্যয়ভার নির্ভর করে মূলত গ্রেস পিরিয়ড বা রেয়াতকাল এবং চূড়ান্ত পরিশোধের মোট সময়সীমার ওপর| এই দিক থেকে বিচার করলে জাপানি ঋণের কাঠামো এখনো বেশ কিছু সুবিধাজনক দিক ধরে রেখেছে| জাইকার ঋণের গড় মেয়াদকাল সাধারণত ৩০ বছর বা তারও বেশি হয়ে থাকে, যার ফলে বার্ষিক কিস্তির তাৎক্ষণিক চাপ অন্যান্য আন্তর্জাতিক ঋণের তুলনায় বেশ সহনীয় থাকে| তদুপরি জাপান ঋণ মওকুফ তহবিলের (জেসিডিএফ) মাধ্যমে পরিশোধিত সুদের একটি নির্দিষ্ট অংশ পুনরায় অন্য কোনো জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে অনুদান হিসেবে ব্যবহারের বিরল সুযোগ থাকে| এর বিপরীতে চীন বা ভারতের মতো দ্বিপক্ষীয় উৎস থেকে কখনো কখনো তুলনামূলক কম সুদে ঋণ পাওয়া গেলেও সেগুলোর পরিশোধের মেয়াদ থাকে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত—সাধারণত ১০ থেকে ১৫ বছর| ফলে নামমাত্র সুদ কম হলেও স্বল্প সময়ে বড় অঙ্কের আসল পরিশোধের তীব্র তারল্য চাপে পড়তে হয় সরকারকে|
তবে জাপানি অর্থায়নের এই স্বস্তিদায়ক দিকটির উল্টো পিঠে রয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয়বৃদ্ধির এক মারাত্মক অন্ধকার দিক| সুদের হার বাড়ার পাশাপাশি জাপানি অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রতিটি মেগাপ্রকল্পের ব্যয় লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, যা রাষ্ট্রের জন্য দ্বিগুণ বোঝা তৈরি করছে| উদাহরণস্বরূপ, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পের প্রাথমিক বাজেট ১৩ হাজার ৬১০ কোটি টাকা থেকে প্রায় ৫৭ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকায়| একইভাবে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের জন্য নেওয়া মেট্রোরেল লাইন-১-এর মূল ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা, যা বর্তমানে সংশোধনের মাধ্যমে প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়ে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকায় নেওয়ার প্রস্তাব টেবিলে রয়েছে| পিছিয়ে নেই মেট্রোরেল লাইন-৫ প্রকল্পটিও; ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকার এই প্রকল্পের ব্যয় সংশোধন করে ৯৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকায় উন্নীত করার প্রক্রিয়া চলছে| অর্থাৎ কেবল সুদের হার বৃদ্ধিই নয়, কাজের ধীরগতি, বারবার পরামর্শক ফি বৃদ্ধি এবং নকশা পরিবর্তনের ফাঁদে পড়ে সামগ্রিক প্রকল্প ব্যয়ের অস্বাভাবিক স্ফীতিই এখন মূল উদ্বেগের কারণ|
বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে এই পরিবর্তনটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর, কারণ জাপান কোনো বিচ্ছিন্ন ঋণদাতা নয়| সদ্য সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত জাপান থেকে বাংলাদেশের নেওয়া মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৪ বিলিয়ন বা ২ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে| বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) পরেই জাপান বর্তমানে বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম বহুপক্ষীয় ঋণের উৎস| ফলে হঠাৎ করে জাপানি অর্থায়ন থেকে সরে আসা কিংবা অন্য কোনো বিকল্পে এক লাফে রূপান্তর হওয়া প্রায় অসম্ভব| কিন্তু একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ঋণের বাজার যখন ক্রমশ কঠিন ও ব্যয়বহুল হচ্ছে, তখন একটি নির্দিষ্ট দেশের উন্নয়ন সংস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সামগ্রিক অর্থনীতিকে গভীর বৈদেশিক ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিতে পারে|
অর্থনীতিবিদরা স্পষ্টভাবে সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, সস্তা ঋণের সোনালি অতীতকে আঁকড়ে ধরে বসে থাকার আর কোনো অবকাশ নেই| সুদের হার চার গুণ বৃদ্ধি পাওয়া মূলত নীতি-নির্ধারকদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা| বাংলাদেশকে এখন আর শুধু একটি দেশের সস্তা ঋণের আশায় বসে না থেকে বিকল্প আন্তর্জাতিক অর্থায়নের নতুন উৎসগুলোর অনুসন্ধান জোরদার করতে হবে| বিশেষ করে বিদেশি সরাসরি ইকুইটি বিনিয়োগ আকর্ষণ, আন্তর্জাতিক সার্বভৌম গ্রিন ও টেকসই বন্ড মার্কেটে প্রবেশ এবং বৈশ্বিক কার্বন ট্রেডিংয়ের মতো উদ্ভাবনী আর্থিক সরঞ্জামগুলো ব্যবহার করে প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে হাঁটতে হবে| সর্বোপরি, শুধু কম সুদের ঋণ খোঁজার চেয়েও এখন সবচেয়ে বড় জাতীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত মেগাপ্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে অপচয় রোধ করা এবং একটি টেকসই ও আধুনিক ‘স্মার্ট ঋণ ব্যবস্থাপনা’ গড়ে তোলা|
তথ্যসূত্র: দ্যা প্রেস ও প্রথম আলো


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category