সম্প্রতি দেশের আকাশসীমায় মিয়ানমারের একটি সামরিক ড্রোন প্রায় দশ মিনিট ধরে অবাধে উড়ে যাওয়ার ঘটনা জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে| আকাশ প্রতিরক্ষার আধুনিক রাডার সেই অনুপ্রবেশ শনাক্ত করতে সক্ষম হলেও ড্রোনটিকে ভূপাতিত বা অকার্যকর করার মতো সময়োপযোগী প্রযুক্তির ঘাটতি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে আমাদের কৌশলগত সীমাবদ্ধতা| কাকতালীয়ভাবে ঠিক সেই সময়েই জাতীয় সংসদে সদ্যঘোষিত অর্থবছরের জন্য প্রতিরক্ষা খাতে ৪২ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকার বিশাল বাজেট প্রস্তাব অনুমোদন পেয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বেশি| কিন্তু সাধারণ নাগরিক ও সামরিক বিশেষজ্ঞদের মনে এখন বড় প্রশ্ন—এই বিপুল অঙ্কের জাতীয় অর্থ কি আকাশসীমা সুরক্ষার আধুনিক ড্রোন-প্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক ওয়্যারফেয়ারের পেছনে ব্যয় হবে, নাকি বরাবরের মতো নতুন কোনো সেনানিবাসের সীমানা প্রাচীর ও প্রশাসনিক ভবন নির্মাণের ইট-পাথরেই সীমাবদ্ধ থাকবে|
বাজেটের আকার টাকায় ক্রমাগত বাড়লেও বৈশ্বিক সামরিক সক্ষমতার নিরিখে বাংলাদেশ যে প্রতিনিয়ত পিছিয়ে পড়ছে, তার প্রমাণ মেলে বৈদেশিক মুদ্রার মানদণ্ডে| আন্তর্জাতিক অস্ত্র বা আধুনিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দেশীয় মুদ্রায় কেনা যায় না, তার জন্য প্রয়োজন হয় বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার| গত পাঁচ বছরের আর্থিক গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রতিরক্ষা বাজেট যখন ৩০ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা ছিল, তখন ডলারের হিসাবে তার পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলার| অথচ মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে সাম্প্রতিক ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাজেট স্ফীত হয়ে ৩৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়ালেও ডলারে তা নেমে এসেছে মাত্র ২ দশমিক ৮ বিলিয়নে| অর্থাৎ দেশীয় মুদ্রায় বরাদ্দ বাড়লেও ডলারে প্রকৃত সামরিক ক্রয়ক্ষমতা কমেছে প্রায় ২১ শতাংশ| আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপরি) তথ্যও এর সত্যতা নিশ্চিত করে| সিপরির হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২২ মেয়াদে বাংলাদেশের সামরিক অস্ত্র আমদানি তার আগের পাঁচ বছরের তুলনায় ৪৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে; যেখানে ২০১৯ সালে ৭১ কোটি ডলারের সমরাস্ত্র কেনা হয়েছিল, ২০২২ সালে এসে তা নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৮ কোটি ডলারে|
অস্ত্র ক্রয়ের সক্ষমতা যখন এভাবে সংকুচিত হচ্ছে, তখন প্রতিরক্ষা বরাদ্দের বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে মূলত নানাবিধ দৃশ্যমান নির্মাণকাজে| গত কয়েক বছরে রামু, বরিশাল ও মিঠামইনে নতুন সেনানিবাস গড়ে তোলা হয়েছে, রাজধানীতে নির্মিত হয়েছে ১৪ তলা আধুনিক হাসপাতাল ভবন এবং সুবিশাল মিলনায়তন| অবকাঠামো উন্নয়ন নিশ্চয়ই প্রয়োজনীয়, তবে একবিংশ শতাব্দীর যুদ্ধের রূপরেখা এখন অনেকটাই বদলে গেছে| আজকের যুদ্ধ আর শুধু দীর্ঘ পরিখা বা সেনানিবাসের সুরক্ষায় সীমাবদ্ধ নয়; যুদ্ধ পরিচালিত হচ্ছে মনুষ্যবিহীন ড্রোন ঝাঁক, সাইবার স্পেসের গুপ্তচরবৃত্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ক্ষিপ্রতায়| দেশের সাবেক শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারাই এখন এই ‘সামরিক চাকচিক্য বনাম কৌশলগত দুর্বলতা’ নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলছেন| অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ফজলে এলাহী আকবর স্পষ্টভাবে মন্তব্য করেছেন যে, সামরিক বাহ্যিক জৌলুসে অতিরিক্ত নজর দিতে গিয়ে প্রকৃত যুদ্ধসক্ষমতা বাড়ানো হয়নি| একইভাবে অবসরপ্রাপ্ত এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদ হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, বিমানবাহিনীর বহরে নতুন প্রজন্মের বহুমুখী যুদ্ধবিমান যুক্ত না হওয়ায় বাধ্য হয়ে পুরোনো প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সুরক্ষাব্যবস্থায় এখনো কার্যকর মনযোগই দেওয়া হয়নি| ফলে ভেতরের মানুষের এই আত্মসমালোচনাই প্রমাণ করে যে, অবকাঠামোগত জাঁকজমকের আড়ালে আধুনিক যুদ্ধের ময়দানে এক ধরনের বড় ফাঁক তৈরি হচ্ছে|
বাজেটের এই বিপুল ব্যয়ের বিপরীতে স্বচ্ছতা ও আর্থিক জবাবদিহির অভাব দীর্ঘদিনের এক জটিল সমীকরণ| গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের করের টাকার প্রতিটি পাই-পয়সার হিসাব নেওয়া সাংবিধানিক সংস্থা মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব| অথচ প্রতিরক্ষা ব্যয়ের অডিট কার্যক্রম নিয়ে ঐতিহাসিকভাবেই অস্বচ্ছতা রয়ে গেছে| অতীতে সংসদীয় প্রতিবেদনে সিএজি তুলে ধরেছিল যে, ১৯৯৭ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত প্রতিরক্ষা কেনাকাটায় অন্তত ৩১টি ক্ষেত্রে ৪৮ কোটি টাকারও বেশি অনিয়ম ও ক্ষতি হয়েছে| সেখানে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল এমন নিম্নমানের গোলাবারুদ কেনা হয়েছিল যা পরবর্তীতে ব্যবহারের অনুপযোগী হিসেবে বাতিল করতে গিয়ে দশ কোটি টাকা লোকসান হয়| এছাড়া প্রায় নয় কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা ট্যাঙ্ক পরিবহনের গাড়ি অলস ফেলে রাখা হয়েছিল, সেনাদের জন্য ভেজাল গুঁড়োদুধ কিনে দুই কোটি টাকার অপচয় হয়েছিল এবং দরপত্রের জামানতের কোটি কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা পড়েনি| দুই দশক পেরিয়ে গেলেও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সেই অডিট আপত্তির কোনো সুরাহা মেলেনি| এমনকি সরকারি ব্যয় ও রাজস্ব কমিশন একদা মন্তব্য করেছিল যে, প্রতিরক্ষা খাত কৃষির চেয়েও বেশি সরকারি ভর্তুকি পায়, অথচ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে এই অর্থের বিস্তারিত গতিপথ প্রায় অজানা থাকে|
বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দার বাস্তবতায় যখন জাতীয় বাজেট ঘাটতি রয়েছে এবং অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন যে সার্বিক সংকট কাটিয়ে উঠতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে, তখন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের মতো মৌলিক জায়গায় বরাদ্দ কমিয়ে প্রতিরক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানোর যে কোনো সিদ্ধান্ত আরও নিবিড় পর্যালোচনার দাবি রাখে| অডিট বা হিসাব চাওয়া মানে সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত বা খাটো করা নয়, বরং পেশাদার এই বাহিনীকে আরও সুসংগঠিত ও আধুনিক করার এটিই একমাত্র পথ| ভারত বা তুরস্কের মতো দেশগুলো এই ভারসাম্য বজায় রাখতে তাদের প্রতিরক্ষা বাজেটকে দ্বৈত কাঠামোতে বিভক্ত করেছে| একদিকে থাকে বেতন-ভাতা, রেশন ও সেনানিবাসের রুটিন পরিচালনা ব্যয়; অন্যদিকে সংরক্ষিত থাকে ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির বিশেষ তহবিল—যেখান থেকে কেবল ড্রোন, সাইবার সিকিউরিটি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা সংগ্রহ করা হয়| ফলে জনগণ স্পষ্ট দেখতে পায় তাদের অর্থের কত ভাগ ভবিষ্যৎ সুরক্ষার পেছনে বিনিয়োগ হচ্ছে|
সব সামরিক তথ্যের বিবরণ উন্মুক্ত ময়দানে প্রকাশ করা সম্ভব নয় এবং নিরাপত্তার স্বার্থে তা কাম্যও নয়| তবে সংসদের স্থায়ী প্রতিরক্ষা কমিটির মতো বিশেষায়িত ফোরামে সব রাজনৈতিক দলের জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্যদের উপস্থিতিতে সিএজি যদি বছরে অন্তত একবার গোপনীয় ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে কেনাকাটার হিসাব দেয়, তবে গোপনীয়তা রক্ষা করেই পূর্ণ জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব| ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশও (টিআইবি) একটি স্বাধীন নিরীক্ষা ব্যবস্থার ওপর বারবার জোর দিয়েছে| এর পাশাপাশি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অনন্য অবদান রেখে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রতি বছর যে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে, তার কতটা অংশ সরাসরি বাহিনীর আধুনিক প্রযুক্তিতে পুনঃবিনিয়োগ হচ্ছে—তা প্রকাশ্যে এলে সাধারণ মানুষও আরও গর্বিত হবে| চূড়ান্ত বিচারে, স্বচ্ছতা কখনোই একটি দক্ষ ও দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে দুর্বল করে না, বরং তা বাহিনীকে জনগণের সত্যিকারের ভরসাস্থল হিসেবে আরও অপরাজেয় শক্তিতে রূপান্তর করে|