কর্মসংস্থান ও উন্নত জীবনযাত্রার আশায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমানো হাজার হাজার কর্মী চরম আইনি ও কনস্যুলার সুরক্ষাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। সরকারের নিজস্ব কোনো দূতাবাস বা কনস্যুলার সেবা না থাকায় বর্তমানে বিশ্বের ২৭টি দেশে অবস্থানরত অন্তত ৫৬ হাজার ৪৩০ জন বাংলাদেশি কর্মী কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, বেতন না পাওয়া, আইনি জটিলতা এবং স্থানীয় নিয়োগকর্তা ও দালালের প্রতারণার শিকার হয়েও কোনো প্রত্যক্ষ কূটনৈতিক সহায়তা পাচ্ছেন না। বিপদকালে নিজস্ব কোনো অভিভাবক না থাকায় তৃতীয় কোনো দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনের ওপর নির্ভর করতে গিয়ে সীমাহীন ভোগান্তি ও দীর্ঘসূত্রিতার শিকার হতে হচ্ছে এই প্রবাসীদের। জাতিসংঘের অন্তর্ভুক্ত ১৯৩টি দেশের মধ্যে মাত্র ৮২টিতে বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক কূটনৈতিক উপস্থিতি থাকায়, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নতুন মিশন গঠন এবং ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে কঠোর মনিটরিং চালুর জোর দাবি জানিয়েছেন জাতীয় অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা।
জনশক্তি ও তথ্যের সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, যেসব দেশে বাংলাদেশের কূটনৈতিক উপস্থিতি নেই, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রবাসী গোষ্ঠী রয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ কম্বোডিয়ায়। দেশটিতে বর্তমানে প্রায় ১৫ হাজার ৯২৩ জন বাংলাদেশি কর্মরত আছেন। এরপরেই মধ্য এশিয়ার দেশ কিরগিজস্তানে ছয় হাজার ৬৬৩ জন, সার্বিয়ায় পাঁচ হাজার ৯৯১ জন, লাওসে পাঁচ হাজার ৭৭৮ জন এবং আফ্রিকান দেশ কঙ্গোতে প্রায় পাঁচ হাজার ১২০ জন কর্মী রয়েছেন। এ ছাড়া ফিজি, বেলারুশ, উত্তর মেসিডোনিয়া, ব্রাজিল, মঙ্গোলিয়াসহ ইউরোপের গ্রিস, মাল্টা, মলদোভা, ক্রোয়েশিয়া, বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড ও ফিনল্যান্ডের মতো দূরবর্তী দেশগুলোতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রবাসী বাস করছেন। এই বিপুল শ্রমশক্তি বিদেশে থেকে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠালেও বিপদের সময় তাদের পাসপোর্টের নবায়ন, আইনি লড়াই বা মৃতদেহের সৎকারের মতো প্রাথমিক নাগরিক সুবিধা পেতে চরম নাজেহাল হতে হচ্ছে।
সম্প্রতি কম্বোডিয়া ও মধ্য এশিয়ার কয়েকটি দেশে অনেক বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগকারী এজেন্সির প্রলোভনে পড়ে চরম জালিয়াতি ও আন্তর্জাতিক স্ক্যাম সেন্টারের মানব পাচার চক্রের ফাঁদে পড়েছেন। কম্বোডিয়া থেকে ফিরে আসা একাধিক ভুক্তভোগী প্রবাসীর মাধ্যমে জানা যায় যে, সেখানে পৌঁছানোর পর কোনো স্থানীয় সাহায্য পাওয়ার সুযোগ না থাকায় তাঁরা মূলত পাচারকারী চক্র ও দালালের জিম্মি হয়ে পড়েন। দূরবর্তী থাইল্যান্ডে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশন থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নেওয়ার প্রক্রিয়া অনিয়মিত ও অনিশ্চিত হওয়ার কারণে বহু বাংলাদেশি দীর্ঘ দিন ধরে অবৈধ হিসেবে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হন। অনুরূপভাবে ইউরোপের দেশ গ্রিসে অবস্থানরত বৈধ ও অবৈধ শিক্ষার্থীরাও কোনো নথি সংক্রান্ত জটিলতায় পড়লে ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে মাসের পর মাস সরকারি সেবার অপেক্ষায় আটকে থাকছেন।
অভিবাসন খাতের বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারের দায়িত্বশীলদের মতে, মিশনবিহীন দেশগুলোতে কর্মীরা আসলে নিরাপদে কাজ করতে পারছেন নাকি নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, তা যাচাই করার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা সরকারের নেই। কম্বোডিয়ায় নির্ধারিত কারখানার বদলে কর্মীদের আটকে রেখে ডিজিটাল অপরাধে বাধ্য করার মতো ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে বিএমইটি ও রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর ওপর নজরদারি বৃদ্ধি করার জোর তাগিদ দিচ্ছেন তারা। কোন দেশে কর্মী পাঠানো হবে, সেখানকার স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা ও অধিকারের বাস্তবতা আগেভাগে যাচাই না করে কেবল ছাড়পত্র দেওয়া বা কর্মী পাঠানো একদমই সমীচীন নয়। প্রয়োজনে যেসব দেশে প্রবাসীদের মানবাধিকারের মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা থাকে, সেখানে সাময়িকভাবে জনশক্তি রফতানি বন্ধ রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত বলে মনে করেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
পররাষ্ট্র নীতি ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা সরকারের এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে বিকল্প ও সমন্বিত কৌশল গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁদের মতে, আমলাতান্ত্রিক বা আর্থিক খরচের জটিলতার কারণে প্রতিটি দেশে পূর্ণাঙ্গ দূতাবাস স্থাপন করা সম্ভব না হলেও কনস্যুলেট অফিস, লেবার উইং চালু করা বা বিকল্প মেকানিজম প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। যেসব দেশে বড় প্রবাসী গোষ্ঠী রয়েছে, সেখানে স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশি প্রভাবশালী নাগরিককে ‘অনারারি কনসাল’ হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। প্রবাসী কল্যাণ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ সমন্বয়ে এই প্রতিনিধিরা নিয়মিত রিপোর্ট দেবেন এবং জরুরি মুহূর্তে আইনি সহায়তা প্রদান করবেন। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখার আশ্বাস দেওয়া হলেও, আর্থিক সাশ্রয় ও অগ্রাধিকারের বিষয়টি বিবেচনা করে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে প্রবাসী কর্মীদের এই নীরব সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
তথ্যসূত্র: কালের কন্ঠ