ফুটবল বিশ্বকাপের মহারণ শেষ হয়েছে। বিশ্বজুড়ে দেড় মাস ধরে চলা উন্মাদনা, আনন্দ-উল্লাস আর উত্তেজনার পর্দা নেমেছে। ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছে বিজয়ী দল, আর সমর্থকরা মেতেছিল উৎসবে। কিন্তু এই বিশাল আয়োজন শেষে একজন সাধারণ সমর্থক হিসেবে আপনার বা আমাদের প্রাপ্তির ঝুড়িতে আসলে কী জমা হয়েছে? এই প্রশ্নটিই এখন সামনে নিয়ে এসেছে গভীর আত্মোপলব্ধির সময়।
দ্য ডেইলি বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড এবং দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফিফা বিশ্বকাপ চলাকালীন শুধু বাংলাদেশেই অন্তত ১২ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। মৃত্যুর এই মিছিলে ছিল নানা মর্মান্তিক ঘটনা। কেউ খুন হয়েছেন, কেউ বা দল সমর্থনের তীব্র ঝগড়াঝাটির জেরে প্রাণ হারিয়েছেন। আবার প্রিয় দলের পতাকা টাঙাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। অনেক সমর্থক অতি উৎসাহী হয়ে দলের বা খেলোয়াড়দের ছবি তুলতে গিয়ে উঁচু ভবন বা গাছ থেকে পড়ে মারা গেছেন। এমনকি খেলা দেখে হতাশ হয়ে বা উত্তেজনায় হার্ট অ্যাটাক করে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়াও আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক পথ বেছে নেওয়ার খবরও রয়েছে, যদিও সেগুলোর অনেকগুলোর শতভাগ সমর্থিত সত্যতা মেলেনি।
মৃত্যু সবসময়ই বেদনার ও কষ্টের। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি উন্মাদনা বা খেলার জন্য কেন এই মূল্য দিতে হলো? এর সাথে জড়িয়ে আছে মারামারি, হানাহানি এবং সামাজিক দূরত্ব তৈরি হওয়ার মতো অনভিপ্রেত ঘটনা।
অনেকেই হয়তো ভাবছেন, “আমার তো এসবের কিছুই হয়নি, আমি তো নিরাপদে আছি।” কিন্তু একটু গভیرভাবে ভেবে দেখলে দেখা যাবে, অজান্তেই আপনি নিজের অনেক বড় ক্ষতি করে ফেলেছেন।
মূল্যবান সময়ের অপচয়: আপনি আপনার জীবনের শত শত মূল্যবান ঘণ্টা ব্যয় করেছেন টেলিভিশন বা ডিভাইসের স্ক্রিনে চোখ রেখে।
স্বাস্থ্যহানি: রাত জেগে খেলা দেখতে গিয়ে নিজের শরীরের অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে এনেছেন।
সম্পর্কের অবনতি: পছন্দের দল বা খেলোয়াড় নিয়ে তর্ক-বিতর্ক ও ঝগড়াঝাঁটিতে জড়িয়ে নিজের বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের প্রিয় মানুষগুলোর সাথে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নষ্ট করে ফেলেছেন।
নিজের অজান্তেই আপনি আপনার শরীর, মন, সময় এবং সম্পর্কগুলোকে বিসর্জন দিয়েছেন। আর এখন খেলা শেষে হয়তো অনেকের মনেই আফসোস কাজ করছে।
ঠাণ্ডা মাথায় যদি আমরা বিশ্লেষণ করি, তবে দেখা যাবে আধুনিক ফুটবল বিশ্বকাপ মূলত একটি বিশাল বৈশ্বিক ব্যবসা ছাড়া আর কিছুই নয়। এই বহুজাতিক বাণিজ্যের যাঁতাকলে পড়ে মানুষ তার সময়, সম্পদ এবং অর্থ হারিয়ে ফেলছে। কর্পোরেট এই আয়োজনগুলো আপনার আবেগ ও উন্মাদনাকে পুঁজি করে নিজেদের পকেট ভারী করছে, আর বিনিময়ে আপনার জীবনে রেখে যাচ্ছে শূন্যতা।
বিশ্বকাপ ফুটবল শেষ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু মূল খেলাটি শেষ হয়ে যায়নি। কর্পোরেট দুনিয়া ও মাধ্যমগুলো জানে কীভাবে মানুষের আবেগ নিয়ে খেলতে হয়। সামনে আরও অনেক বড় বড় বৈশ্বিক ইভেন্ট বা আয়োজন আসবে। তখন আবারও আপনাকে ঠিক একইভাবে ‘কনজিউম’ বা ব্যবহার করে নেওয়া হবে। আপনি যদি নিজেকে নিজে চিনতে না পারেন, তবে এই চক্র থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়।
এই পৃথিবীর বুকে আপনার আসার উদ্দেশ্য কী? আপনার জীবনের মূল অগ্রাধিকার বা প্রায়োরিটিগুলো কী কী? কোন সম্পর্কগুলোকে আপনি গুরুত্ব দেবেন—এই মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে যদি আপনার মনে পরিষ্কার ধারণা না থাকে, তবে আপনি প্রতিনিয়ত অন্যের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবেন।
সবচেয়ে বড় যে সত্যটি আপনাকে অনুধাবন করতে হবে, তা হলো—আপনার ভালো থাকা না থাকা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে আপনার নিজের ভেতরে। আপনি নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন জীবনের কোন কাজটি আপনার করা উচিত এবং কোনটি বর্জন করা উচিত। যেদিন আপনি এই আত্মোপলব্ধি অর্জন করতে পারবেন, সেদিনই আপনি লাভ করবেন জীবনের চূড়ান্ত ও প্রকৃত স্বাধীনতা।