ধর্ম অবমাননার অভিযোগে অভিযুক্ত বাউল শিল্পী আবুল সরকারকে জামিন দিয়েছেন হাইকোর্ট। সোমবার (৬ এপ্রিল) বিচারপতি আতোয়ার রহমান ও বিচারপতি সগীর হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই আদেশ প্রদান করেন। একই সঙ্গে তাকে কেন স্থায়ী জামিন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুলও জারি করা হয়েছে।
বাউল আবুল সরকারের করা জামিন আবেদনের প্রেক্ষিতে শুনানি শেষে হাইকোর্ট এই আদেশ প্রদান করেন। জামিন দেওয়ার পাশাপাশি আদালত একটি রুলও জারি করেছেন। রুলে জানতে চাওয়া হয়েছে, কেন আবুল সরকারকে এই মামলায় স্থায়ী জামিন দেওয়া হবে না। সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। উচ্চ আদালতের এই আদেশের ফলে আবুল সরকারের কারামুক্তিতে আর কোনো আইনি বাধা থাকছে না বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবীরা।
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত বছরের ২০ নভেম্বর। মাদারীপুরে একটি গানের আসর চলাকালীন মানিকগঞ্জ ডিবি পুলিশের একটি দল আবুল সরকারকে আটক করে। এর পরদিন মানিকগঞ্জের ঘিওর বন্দর মসজিদের ইমাম মুফতি মো. আবদুল্লাহ বাদী হয়ে আবুল সরকারের বিরুদ্ধে ঘিওর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার অভিযোগে বলা হয়, মেলা বা গানের আসরে আবুল সরকার এমন কিছু মন্তব্য করেছেন যা ইসলাম ধর্ম ও ধর্মীয় অনুভূতির পরিপন্থী। ওই মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে মানিকগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
ঘিওর থানার মামলার রেশ কাটতে না কাটতেই গত ১ ডিসেম্বর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলামের আদালতে আবুল সরকারের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলাটি করেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের নিউরোট্রমা সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. মাহফুজুর রহমান।
মামলার আরজিতে বলা হয়েছে, মানিকগঞ্জের একটি মেলার মঞ্চে গান পরিবেশনের সময় আবুল সরকার মহান আল্লাহ তাআলাকে নিয়ে অত্যন্ত অশ্রদ্ধা ও কটূক্তিপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। বাদীর দাবি, একজন সচেতন ধর্মপ্রাণ মুসলমান হিসেবে এই বক্তব্য তার ধর্মীয় অনুভূতিতে চরম আঘাত হেনেছে। মামলায় দণ্ডবিধির ১৮৬০-এর ২৯৫ এবং ২৯৫ (ক) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে, যা মূলত ধর্মীয় উপাসনালয়ের ক্ষতি করা এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে ইচ্ছাকৃত ও বিদ্বেষপূর্ণ আঘাতের সাথে সম্পর্কিত।
বাউল গান মূলত দেহতত্ত্ব এবং রূপকধর্মী আধ্যাত্মিক কথার ওপর ভিত্তি করে রচিত। অনেক সময় বাউলরা গানে এমন কিছু শব্দ বা উপমা ব্যবহার করেন যা সাধারণ আক্ষরিক অর্থে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে। আবুল সরকারের আইনজীবীদের দাবি, তিনি কোনো বিদ্বেষ থেকে নয়, বরং বাউল দর্শনের গূঢ় তত্ত্ব প্রকাশ করতে গিয়ে কিছু কথা বলেছেন যা ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, প্রসিকিউশন ও বাদীপক্ষের দাবি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে স্রষ্টা বা ধর্মকে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করা দণ্ডনীয় অপরাধ এবং এটি সমাজে সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
বাউল আবুল সরকারের এই মামলাটি দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। বাউল সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, বাউলদের কণ্ঠ রোধ করার জন্য বারবার এই ধরণের মামলা ব্যবহার করা হচ্ছে। লালন শাহ বা শাহ আব্দুল করিমের উত্তরসূরি হিসেবে বাউলরা যে মুক্তচিন্তা ও আধ্যাত্মিকতার চর্চা করেন, তা আইনি বেড়াজালে আটকে গেলে হাজার বছরের এই ঐতিহ্য বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। বিপরীতে, আলেম সমাজ ও ধর্মপ্রাণ মানুষের একটি বড় অংশ মনে করেন, বাউল তত্ত্বের দোহাই দিয়ে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসকে আঘাত করার অধিকার কারোরই নেই।
বাউল আবুল সরকারের মামলায় ২৯৫ (ক) ধারার প্রয়োগ নিয়ে আইনি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। এই ধারাটি সাধারণত তখন ব্যবহার করা হয় যখন কোনো ব্যক্তি ‘ইচ্ছাকৃতভাবে’ কোনো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেন। আবুল সরকারের আইনজীবীরা আদালতে প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন যে, তার বক্তব্যে কোনো ‘বিদ্বেষ’ বা ‘অশুভ উদ্দেশ্য’ ছিল না।