সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর সন্দেহজনক গতিবিধি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানের পর দেশজুড়ে নতুন করে নিরাপত্তা শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে চলতি জুলাই মাসে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে সন্দেহভাজন ছয়জনকে গ্রেপ্তার এবং উগ্রবাদে জড়ানোর অভিযোগে সিঙ্গাপুর থেকে দুই বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত পাঠানোর পর বিষয়টি পুনরায় জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। এর আগে গত বছরের ডিসেম্বরে ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় সংঘটিত ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনাটিও উগ্রবাদী তৎপরতার এক অশনিসংকেত দিয়েছিল। তবে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জামিনে মুক্ত হওয়া নিষিদ্ধঘোষিত বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের বিপুলসংখ্যক সদস্যের নিখোঁজ হয়ে যাওয়া। হিসাব অনুযায়ী, ৯টি নিষিদ্ধ সংগঠনের অন্তত ৩৭০ জন সদস্য জামিন পাওয়ার পর থেকে সম্পূর্ণ লাপাত্তা। পাশাপাশি কারাগার ভেঙে পালানো আরও ৯ দুর্ধর্ষ জঙ্গির কোনো হদিস না থাকায় জনমনে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, পলাতক এই জঙ্গিরা পুনরায় সংগঠিত হয়ে দেশে বড় ধরনের কোনো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির পাঁয়তারা করতে পারে।
গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশ সদর দপ্তরের হালনাগাদ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে পলাতক জঙ্গিদের একটি ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জামিনে মুক্তি পেয়ে যারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে আত্মগোপনে চলে গেছেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশটি হলো নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) সদস্য। এই সংগঠনটির অন্তত ১৮৫ জন সদস্য বর্তমানে লাপাত্তা। এর বাইরে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) ৫৮ জন, আনসার আল ইসলামের ২৫ জন, হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশের (হুজি-বি) ১৬ জন এবং নব্য জেএমবির ১৬ জন সদস্য নিখোঁজ রয়েছেন। এছাড়া আল্লাহর দলের ৯ জন, জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার ১ জন এবং ইমাম মাহমুদের কাফেলার ১ জন সদস্য জামিনের পর আর কখনোই আদালতে হাজিরা দেননি। হিযবুত তাহরীরের বেশ কিছু সদস্যও এই পলাতক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। এলাকাভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আত্মগোপনে থাকা এই ৩৭০ জনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৬৩ জনের অবস্থান চট্টগ্রাম বিভাগে। এরপর ঢাকা বিভাগে ৮৬ জন, রংপুর বিভাগে ৫২ জন, খুলনা বিভাগে ৩২ জন, রাজশাহী বিভাগে ২৪ জন, সিলেট বিভাগে ৭ জন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ৬ জন পলাতক রয়েছেন। এই বিপুলসংখ্যক জামিনপ্রাপ্ত জঙ্গির পাশাপাশি গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া ৯ জন সাজাপ্রাপ্ত জঙ্গিকে এখনো গ্রেপ্তার করতে না পারাটা সার্বিক নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
উগ্রবাদী তৎপরতার এই নতুন প্রসারের একটি জ্বলন্ত প্রমাণ পাওয়া যায় সম্প্রতি রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকার একটি বালুর মাঠে পুলিশের পরিচালিত অভিযানের মাধ্যমে। সেখানে অভিযান চালিয়ে পুলিশ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের নিবিড় তদন্তে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন শাহ আমানত সাবির, যিনি ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম’ (এফসিএস) নামের একটি নবগঠিত উগ্রবাদী সংগঠনের প্রধান প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, সাধারণ তরুণদের আত্মরক্ষার কৌশল বা মার্শাল আর্ট শেখানোর আড়ালে মূলত উগ্রবাদী মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ করা এবং শারীরিক ও মানসিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন সাবির। গ্রেপ্তার হওয়া অপর পাঁচজন হলেন হোসাইন তানিম, মো. জুনায়েদ, আতাউল্লাহ শাহ, মো. আবিদুর রহমান এবং মো. বায়েজিত। প্রাথমিক অবস্থায় যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাদের তিন দিন করে রিমান্ডে নেয়। রিমান্ড শেষে চারজনকে কারাগারে পাঠানো হলেও সাবির এবং তানিমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুনরায় তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। সিটিটিসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কারাগারে পাঠানো চারজনের ব্যাপারে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য না মিললেও সাবির ও তানিমের উগ্রবাদে জড়ানোর বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর প্রমাণ তাদের হাতে এসেছে। সাবির ইন্টারনেটের মাধ্যমে উগ্রবাদে উদ্দীপ্ত হয়ে শারীরিক কসরত এবং বিস্ফোরণ ঘটানোর বিভিন্ন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নিজস্ব ওয়েবসাইটে ছড়িয়ে সাধারণ তরুণদের মগজধোলাইয়ের চেষ্টা করতেন। তবে সিটিটিসি নিশ্চিত করেছে যে, সাবিরের ছড়িয়ে দেওয়া ভিডিওর বিস্ফোরণটি কোনো শক্তিশালী আইইডি ছিল না, বরং সাধারণ পটকার উপকরণ দিয়ে সেটি তৈরি করা হয়েছিল। পুলিশ বর্তমানে ‘ম্যাক ইউরি’ নামের এক রহস্যময় ব্যক্তির পরিচয় উন্মোচনের চেষ্টা করছে, ধারণা করা হচ্ছে এটি কোনো শীর্ষ উগ্রবাদীর ব্যবহৃত ছদ্মনাম হতে পারে।
দেশীয় তৎপরতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও দেশীয় জঙ্গিদের নেটওয়ার্ক বিস্তারের প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। গত বুধবার সিঙ্গাপুর পুলিশের হাতে আটক হওয়া দুই বাংলাদেশি নাগরিক সাহেদুল ইসলাম এবং রিশাদ তায়ানীকে দেশে ফেরত পাঠানোর ঘটনাটি এর একটি বড় উদাহরণ। সিঙ্গাপুর পুলিশের গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, এই দুজন সেখানে বসে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত উগ্রবাদী মতামত প্রচার করতেন এবং আন্তর্জাতিক ও দেশীয় উগ্রবাদীদের সাথে গোপন যোগাযোগ রক্ষা করে চলতেন। দেশে ফেরত আসার পরপরই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পুলিশ তাদের ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করে এবং পরবর্তীতে আদালতে হাজির করে তিন দিনের রিমান্ডে নেয়। সিটিটিসির প্রধান মোহাম্মদ শামসুল হক জানিয়েছেন, সিঙ্গাপুর থেকে ফেরত পাঠানো এই দুই ব্যক্তির অতীত কর্মকাণ্ড, ইন্টারনেট ভিত্তিক লেখালেখি এবং সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক যোগাযোগ নিয়ে গভীর অনুসন্ধান চলছে। তারা বিদেশ থেকে দেশে কোনো জঙ্গি কার্যক্রমে অর্থায়ন করতেন কি না, অথবা দেশে তাদের কোনো গোপন নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে কি না, সে বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছে সিটিটিসি।
পলাতক জঙ্গিরা কীভাবে আবারও ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে, তার একটি বড় প্রমাণ হলো কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদের একটি মাদ্রাসায় সংঘটিত বিস্ফোরণের ঘটনাটি। গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর ঘটা এই বিস্ফোরণের মূল হোতা ছিলেন মাদ্রাসার পরিচালক আল আমিন শেখ এবং তার সহযোগী শাহিন। তদন্তে জানা যায়, এরা দুজনই নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশের (জেএমজেবি) সক্রিয় সদস্য ছিলেন। এর আগে পুলিশের হাতে তারা গ্রেপ্তার হলেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক ডামাডোলের সুযোগে তারা জামিনে বেরিয়ে আসেন এবং আবারও অত্যন্ত গোপনে তাদের উগ্রবাদী কার্যক্রম শুরু করেন। জামিনে বেরিয়েই তারা বোমা তৈরির কাজ শুরু করেন, যার ফলে মাদ্রাসায় ওই ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে এবং আল আমিনের নিজ স্ত্রী আছিয়া বেগম ও সন্তান গুরুতর আহত হন। ঘটনার পর আল আমিন গা ঢাকা দিলেও গত ফেব্রুয়ারিতে পুলিশের এন্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ) তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। এই মামলায় পুলিশ চার নারীসহ মোট ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছিল, যদিও ওই চার নারী বর্তমানে জামিনে মুক্ত রয়েছেন। এটিইউর পরিদর্শক শাহিদুর রহমান নিশ্চিত করেছেন যে, আল আমিন গ্রেপ্তারের পর বোমা তৈরির বিষয়টি পুলিশের কাছে অকপটে স্বীকার করেছেন।
বর্তমান এই সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে দেশের নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সমাজবিজ্ঞানীরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হকের মতে, নিষিদ্ধ সংগঠনের বিচারাধীন বা তদন্তাধীন সদস্যদের দীর্ঘদিন ধরে পলাতক থাকাটা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি মারাত্মক অশনিসংকেত। তিনি মনে করেন, ৫ আগস্টের পর দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে একধরনের শিথিলতা কাজ করেছিল, যার সুযোগ নিয়ে এই উগ্রবাদীরা আত্মগোপনে থেকে নতুন করে সংগঠিত হওয়ার অবারিত সুযোগ পেয়েছে। তারা সমাজের অন্ধকার স্তরে থেকে নতুন সদস্য সংগ্রহ করতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তবে পুলিশের বর্তমান কঠোর তৎপরতাকে তিনি সাধুবাদ জানিয়েছেন। অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা জনগণকে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ও সিটিটিসির প্রধান মোহাম্মদ শামসুল হক দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, সাধারণ মানুষের উদ্বেগের কোনো কারণ নেই; দেশে কোনোভাবেই আর উগ্রবাদকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেওয়া হবে না। পলাতক জঙ্গিদের গ্রেপ্তারে এরই মধ্যে দেশজুড়ে গোয়েন্দা নজরদারি ও মনিটরিং ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়েছে। জামিনে গিয়ে পলাতক থাকা আসামিদের গ্রেপ্তারে পরোয়ানা জারি করা হয়েছে এবং তাদের অবস্থান শনাক্তে পুলিশের সবগুলো ইউনিট সমন্বিতভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, জেল থেকে পালানো ৯ জন দুর্ধর্ষ জঙ্গি এবং জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর পলাতক ৩৭০ জনের অবস্থান দ্রুত শনাক্ত করতে এবং তাদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশের অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট, সিটিটিসি এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলো একটি বিশেষ সেল গঠন করে সমন্বিতভাবে কাজ করছে। পলাতকদের নামের তালিকা ও ছবি দেশের সব বিমানবন্দর, স্থলবন্দর এবং সীমান্তবর্তী থানাগুলোতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে তারা কোনোভাবেই দেশত্যাগ করতে না পারে। একই সঙ্গে তারা অতীতে যেসব উগ্রবাদী মামলার আসামি ছিলেন, সেই মামলাগুলোর বর্তমান অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। নিষিদ্ধ এই সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক কার্যক্রম, তাদের অর্থের উৎস, হুন্ডির মাধ্যমে আসা বিদেশি অনুদান এবং নতুন সদস্য সংগ্রহের আধুনিক ও গোপন কৌশলগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। বিশেষ করে ডার্ক ওয়েব এবং বিভিন্ন এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপে তাদের আনাগোনা ট্র্যাক করতে পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটগুলো দিবারাত্রি কাজ করে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এই নিখোঁজ জঙ্গিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা সম্ভব না হলে তারা দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এবং দেশের ভাবমূর্তির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নয়, সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকেও নিজেদের চারপাশের সন্দেহজনক কার্যকলাপ সম্পর্কে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।
তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা