• শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ১২:২৩ পূর্বাহ্ন

বড় ঋণের গোমর ফাঁস করতে সরাসরি মাঠে বাংলাদেশ ব্যাংক

Reporter Name / ৭ Time View
Update : শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬

দেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণ, ঋণের অপব্যবহার এবং একই প্রভাবশালী গ্রাহককে বারবার নতুন সুবিধা দিয়ে পুরনো খেলাপি ঋণ আড়াল করার গুরুতর সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এবার চূড়ান্ত অ্যাকশনে নেমেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অসাধু ব্যাংক কর্মকর্তা এবং প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের অনৈতিক যোগসাজশ চিরতরে ভেঙে দিতে এক কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। কাগজে-কলমে ফাইলপত্র দেখে সন্তুষ্ট না থেকে, ২০ কোটি টাকা বা তার বেশি ঋণ নেওয়া বড় বড় প্রতিষ্ঠানের বাস্তব কার্যক্রম সরেজমিন যাচাই করতে মাঠপর্যায়ে সরাসরি অনুসন্ধানে নেমেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন দল। পরিদর্শকেরা সরাসরি বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের বড় ঋণগ্রহীতাদের শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ম্যানুফ্যাকচারিং কারখানা ও ব্যবসায়িক আউটলেটে গিয়ে মূল বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই বিশেষ পরিদর্শনের মূল লক্ষ্য হলো ঋণ জালিয়াতি ও বড় ধরণের আর্থিক অনিয়ম কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা। ব্যাংকের আমানতকারীদের টাকা যাতে কোনোভাবেই পাচার বা অপব্যবহার না হয়ে সরাসরি দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়, তা সুনিশ্চিত করা হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানের ঋণের স্থিতি ২০ কোটি টাকা কিংবা তার বেশি, সেগুলোর ক্ষেত্রে ঋণের অর্থ ব্যবহারের সঠিক খাত ও স্বচ্ছতা; প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি ও কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা; কাগজে কলমে ঘোষিত কর্মসংস্থানের বাস্তব রূপ এবং প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত নগদ প্রবাহ (ক্যাশ ফ্লো) ও ব্যবসায়িক গতিশীলতা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে যাচাই করা হচ্ছে। পরিদর্শনের সময় শুধু নথিপত্র দেখেই ক্ষান্ত হচ্ছেন না কর্মকর্তারা; বরং প্রয়োজনে সরবরাহকারী, পণ্য ক্রেতা ও স্থানীয় প্রশাসনের সাথেও তথ্য মিলিয়ে শতভাগ সত্যতা নিশ্চিত করা হচ্ছে।

ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, অতীতে বহু ব্যাংক অসাধু কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী গ্রাহকদের যোগসাজশে নিয়মবহির্ভূতভাবে বড় বড় ঋণ অনুমোদন করেছে। পরবর্তীতে সেই ঋণ যখন খেলাপি হয়ে পড়েছে, তখন ব্যাংকগুলো প্রকৃত অর্থ আদায়ের কোনো আইনি বা জোরালো চেষ্টা না করে উল্টো একই গ্রাহককে নতুন করে আরও ঋণ দিয়েছে। এই নতুন অর্থ দিয়ে পুরনো ঋণ সমন্বয় বা নিয়মিত দেখানোর নোংরা পথ বেছে নেওয়া হয়েছিল। এর ফলে কাগজে-কলমে ব্যাংকের ঋণগুলো ‘নিয়মিত’ বা সচল দেখানো হলেও বাস্তবে ব্যাংকের ঝুঁকির মাত্রা বহুগুণ বেড়ে গেছে, যা খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্রকে অস্পষ্ট করে রেখেছিল। খাতসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অতীতে ১০০ কোটি টাকার একটি মূল ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন কিংবা নতুন ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে সমন্বয় করতে করতে কয়েক ধাপে শতক থেকে হাজার কোটি টাকার এক বিশাল ও কাল্পনিক দায়ে পরিণত হয়েছে। ব্যবসা বা উৎপাদনে কোনো বাস্তব অগ্রগতি না থাকলেও নতুন অর্থায়নের মাধ্যমে পুরনো আর্থিক ক্ষত আড়াল করার এই ক্ষতিকর প্রবণতা ব্যাংকিং খাতকে ভেতর থেকে পুরোপুরি দুর্বল করে দিয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শকরা এখন আর কেবল ব্যাংকের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে ফাইলের ওপর নির্ভর করছেন না। তারা মূলত চারটি প্রধান প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন: ১. কারখানা কিংবা প্রকল্পটি বাস্তবে চালু আছে কি না; ২. ঋণের টাকায় কাগজে উ্ল্লিখিত কাঙ্ক্ষিত যন্ত্রপাতি আদৌ স্থাপন করা হয়েছে কি না এবং সেখানে উৎপাদন সচল রয়েছে কি না; ৩. নথিপত্রে যে পরিমাণ শ্রমিকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তারা বাস্তবে সেখানে কর্মরত আছেন কি না; এবং ৪. ঋণের অর্থ ঘোষিত খাতের বাইরে অন্য কোনো ব্যবসায় বা হুন্ডির মাধ্যমে কোথাও সরিয়ে নেওয়া হয়েছে কি না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, মূল বিষয় হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য উদ্ঘাটন করা—ব্যাংকগুলো কি দেশের প্রকৃত উৎপাদনশীল উদ্যোক্তাদের নতুন বিনিয়োগে সহায়তা করছে, নাকি কেবল পুরনো সমস্যাগ্রস্ত ও মৃত ঋণকে নতুন অর্থের মোড়কে আড়াল করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে? কারণ নতুন ঋণ যদি দেশের সামগ্রিক উৎপাদন ও কর্মসংস্থান না বাড়িয়ে কেবল পুরনো বড় বড় দায় সমন্বয়ে ব্যবহৃত হয়, তবে তা দেশের অর্থনীতিতে কোনো ইতিবাচক ভূমিকা রাখে না।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক ঋণের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নতুন শিল্পায়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। ঋণের টাকা যদি ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিবর্তে অনুৎপাদনশীল খাতে চলে যায় কিংবা পুরনো ঋণ লুকাতে ব্যবহৃত হয়, তবে ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মান চূড়ান্তভাবে নষ্ট হয় এবং পুরো আর্থিক খাতে সিস্টেমিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়ে। অতীতে অনেক ক্ষেত্রে সঠিক ‘প্রকল্প সম্ভাব্যতা যাচাই’ বা প্রজেক্ট ফিজিবিলিটি স্টাডি ছাড়াই কেবল প্রভাব খাটিয়ে বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ঋণ বিতরণের পর ব্যাংকের কোনো নজরদারি না থাকায় গ্রাহকরা চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করলেও ব্যাংক তাদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। ফলে একই সুবিধাভোগী ও লুটেরা গোষ্ঠী বারবার নতুন ঋণ পেয়েছে এবং ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের এক বিশাল পাহাড় গড়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সাম্প্রতিক কঠোর উদ্যোগের মাধ্যমে শুধু অনিয়ম ও জালিয়াতি শনাক্ত করাই নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্ত, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও জবাবদিহিমূলক ঋণ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠার দূরদর্শী লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। অনুসন্ধানে কোনো ব্যাংকে ঋণ জালিয়াতি বা যোগসাজশ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের দায়িত্বপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা, বিশাল অঙ্কের আর্থিক জরিমানা কিংবা প্রয়োজনে ফৌজদারি আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। একই সাথে, অনিয়মে জড়িত ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন সফল ও নিয়মিতভাবে পরিচালিত হলে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণে দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলা দূর হবে। নতুন ঋণ দেওয়ার আগে প্রকল্পের বাস্তবতা যাচাই এবং ঋণ বিতরণের পর নিয়মিত কঠোর তদারকির একটি সুস্থ ও জবাবদিহিমূলক সংস্কৃতি গড়ে উঠবে, যা দেশের প্রকৃত বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পাশাপাশি খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

তথ্যসূত্র: নয়া দিগন্ত


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category