আগামী রবিবার ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের চূড়ান্ত মহারণে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং ইউরোপের পরাশক্তি স্পেন। এই মেগা ফাইনালকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে ফুটবল প্রেমীদের মধ্যে পারদ চড়তে শুরু করেছে এবং কাউন্টডাউন বা ক্ষণগণনা ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। মাঠের খেলা শুরু হওয়ার আগে ফুটবল ভক্তদের এই টানটান উত্তেজনা ও উন্মাদনাকে আরও বাড়িয়ে দিতে সংগীত সবসময়ই একটি অন্যতম সেরা এবং জাদুকরী মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার ট্রফি ধরে রাখার মিশন কিংবা স্পেনের উদীয়মান কিশোর তারকা লামিন ইয়ামালের ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে নিজেকে চেনানোর লড়াই, সমর্থকদের পছন্দ যাই হোক না কেন, কিছু কালজয়ী গান ফুটবল মাঠের আবেগ, শক্তি এবং উদযাপনকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) তথ্য অনুযায়ী, এই রোমাঞ্চকর ফাইনালের রোমাঞ্চ ও আবহ জমিয়ে তুলতে দশটি বিশেষ গানের একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে, যা প্রতিটি ফুটবল ভক্তের প্লে-লিস্টে থাকা উচিত।
এই তালিকার সবার উপরে রয়েছে ২০২৬ সালের চলমান ফিফা বিশ্বকাপের অফিশিয়াল থিম সং ‘দাই দাই’, যা গেয়েছেন লাতিন পপ সম্রাজ্ঞী শাকিরা এবং নাইজেরিয়ান তারকা বার্না বয়। লাতিন সুর ও আফ্রোবিটসের এই বহুভাষিক মিশ্রণটি মূলত বিশ্বজুড়ে মানুষের ঐক্য, আবেগ এবং বিজয়ের জয়গান গায়। শাকিরার মতে, একটি সফল বিশ্বকাপ সংগীতের মূল কাজই হলো ফুটবল মানুষের মনে যে আনন্দ ও উদ্দীপনা তৈরি করে, তা সুরের মাধ্যমে তুলে ধরা। এর পরের অবস্থানেই রয়েছে একটি আধুনিক বৈশ্বিক মেলবন্ধন, যেখানে অপেরা লিজেন্ড আন্দ্রেয়া বোচেলি, বিখ্যাত ডিজে ডেভিড গেটা, এজেএই এবং মার্কিন র্যাপার মেগান থি স্ট্যালিয়নের যৌথ কণ্ঠের ‘ডিএনএ (মোর দ্যান আ গেম)’ গানটি স্থান পেয়েছে। ইংরেজি, ইতালীয় এবং কোরিয়ান ভাষার এই অনন্য মিশ্রণটি ফুটবলকে কেবল একটি সাধারণ খেলার গণ্ডি ছাড়িয়ে মানুষের আত্মপরিচয় ও জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে চমৎকারভাবে উপস্থাপন করে। এছাড়া তালিকার তৃতীয় স্থানে রয়েছে ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপের সেই অবিস্মরণীয় ও কালজয়ী ট্র্যাক, রিকি মার্টিনের গাওয়া ‘লা কোপা দে লা ভিদা’ বা ‘দ্য কাপ অব লাইফ’, যা আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ও পরিচিত সুর হিসেবে মানুষের মুখে মুখে ফেরে।
স্প্যানিশ ফুটবল এবং তাদের জাতীয় দলের সমর্থকদের জন্য এই তালিকায় বেশ কিছু আকর্ষণীয় গান স্থান পেয়েছে। যার মধ্যে ২০২২ সালের লাতিন পপ হিট ‘দেসপেছা’ অন্যতম, যা স্পেনের তারকা কণ্ঠশিল্পী রোজালিয়ার গাওয়া। গানটি ইতিমধ্যে স্প্যানিশ জাতীয় দলের সমার্থক হয়ে উঠেছে এবং মাঠে গোলের পর কিংবা বিজয়ের মুহূর্তে স্টেডিয়ামে এটি নিয়মিত বাজানো হয়। ফাইনালে স্পেন ট্রফি জিতলে এই গানের সুর যে আবারও প্রতিধ্বনিত হবে, তা বলাই বাহুল্য। এর পাশাপাশি ১৯৬৭ সালের স্প্যানিশ সংগীতের কিংবদন্তি রাফায়েলের চিরসবুজ ক্লাসিক ‘মি গ্রান নোচে’ গানটিও স্পেনের ফুটবল উদযাপনের একটি নিয়মিত অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। এছাড়া ২০১৬ সালে সের্হিও রামোস, নিনা পাস্তোরি এবং রেডের ওয়ানের যৌথভাবে গাওয়া ‘লা রোজা বাইলা’ গানটি স্প্যানিশ সমর্থকদের অত্যন্ত পছন্দের। মূলত ইউরো ২০১৬ আসরে স্পেনের অফিসিয়াল গান হিসেবে এটি মুক্তি পেয়েছিল এবং দলের ডাকনাম ‘লা রোজা’কে কেন্দ্র করে তৈরি এই চমৎকার সুরটি এখনও গ্যালারিতে সমান জনপ্রিয়।
অন্যদিকে, আর্জেন্টিনার আলবিসেলেস্তে সমর্থকদের আবেগকে ধারণ করতে ২০০০ সালের একটি জনপ্রিয় এনার্জেটিক কাম্বিয়া ট্র্যাক ‘লা কাম্বিয়া দে লোস ত্রাপোস’ তালিকায় বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। ইয়েরবা ব্রাভার এই সৃষ্টিটি ২০২২ সালে কাতারের মাটিতে আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়ের পর ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং এখনও আর্জেন্টাইন ফুটবল সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে টিকে আছে। এর পরেই রয়েছে ১৯৯৩ সালের লস ফ্যাবুলোসোস ক্যাডিলাকসের বিখ্যাত রক ও স্কা ঘরানার গান ‘মাতাদোর’, যা ২০০৮ সালে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছিল। মাঠে আর্জেন্টিনার গোলের পর এই সুরটি প্রায়ই শোনা যায়, তবে এর পেছনের সুরটি আর্জেন্টিনার বিগত সামরিক একনায়কতন্ত্রের এক গভীর ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে। আধুনিক লাতিন পপের ছোঁয়া দিতে তালিকায় যুক্ত হয়েছে ২০২৪ সালের আর্জেন্টাইন জুটি ক্যা৭রিয়েল ও পাকো আমোরোসোর আধুনিক ট্র্যাক ‘দুম্বাই’, যা ট্র্যাপ ও ইলেকট্রনিক সুরের মিশ্রণে ফুটবল উৎসবের আমেজকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আর তালিকার সর্বশেষ এবং অন্যতম সেরা আকর্ষণ হিসেবে রয়েছে ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের শাকিরার সেই অবিস্মরণীয় ও বিশ্ব কাঁপানো অ্যান্থেম ‘ওয়াকা ওয়াকা (দিস টাইম ফর আফ্রিকা)’, যার সংক্রামক তাল এবং ইতিবাচক বার্তা আজও প্রতিটি ফুটবল আসরের অন্যতম সেরা অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হয়। এই ১০টি গানের চমৎকার সুরলহরি আগামী রবিবারের ফাইনালের উন্মাদনাকে সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে।