মেয়াদের শেষ দিন পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে সব রাষ্ট্রপ্রধানের ভাগ্যে জোটে না। রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি, ব্যাপক দুর্নীতি, ঐতিহাসিক গণবিক্ষোভ, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, সামরিক কিংবা আদালতের চাপ অথবা পার্লামেন্টে অভিশংসনের মুখোমুখি হয়ে বিশ্বের অনেক প্রভাবশালী রাষ্ট্রপ্রধানকেই মেয়াদের আগেই ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে। সম্প্রতি এই আন্তর্জাতিক তালিকায় যুক্ত হয়েছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। সাল অনুযায়ী বিশ্বজুড়ে মেয়াদের আগেই পদত্যাগ করা বা ক্ষমতাচ্যুত হওয়া উল্লেখযোগ্য রাষ্ট্রপ্রধানদের বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো।
শার্ল দ্য গোল (ফ্রান্স, ১৯৬৯): ফ্রান্সে নিজের প্রস্তাবিত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের ওপর আয়োজিত গণভোটে হেরে যাওয়ার পর তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন।
রিচার্ড নিক্সন (যুক্তরাষ্ট্র, ১৯৭৪): ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির চরম বিতর্কের জেরে অভিশংসন এড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে পদত্যাগ করেন।
ফের্দিনান্দ মার্কোস (ফিলিপাইন, ১৯৮৬): ব্যাপক দুর্নীতি ও নির্বাচনী কারচুপির বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হন।
রাউল আলফনসিন (আর্জেন্টিনা, ১৯৮৯): দেশে চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও লাগামহীন মূল্যস্ফীতিতে সৃষ্ট তীব্র গণবিক্ষোভের কারণে মেয়াদের ছয় মাস আগেই সরে দাঁড়ান।
ফের্নান্দো কলর ডি মেলো (ব্রাজিল, ১৯৯২): দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র দুই বছরের মাথায় দুর্নীতির অভিযোগে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হলে সিনেটের চূড়ান্ত ভোটের আগেই পদত্যাগ করেন।
সুহার্তো (ইন্দোনেশিয়া, ১৯৯৮): এশীয় অর্থনৈতিক মন্দা এবং দেশজুড়ে তীব্র ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে দীর্ঘ ৩২ বছরের শাসনের ইতি টেনে ইস্তফা দেন।
বরিস ইয়েলৎসিন (রাশিয়া, ১৯৯৯): ১৯৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর আকস্মিকভাবে পদত্যাগ করে ভ্লাদিমির পুতিনকে উত্তরসূরি হিসেবে ক্ষমতার দায়িত্ব অর্পণ করেন।
গনজালো সানচেজ ডি লোজাডা (বলিভিয়া, ২০০৩): সরকারের বিতর্কিত অর্থনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক গণবিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যান।
জাঁ-বারট্রান্ড অ্যারিস্টিড (হাইতি, ২০০৪): সশস্ত্র বিদ্রোহ ও প্রবল আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়ে দেশ ত্যাগ করেন।
পারভেজ মোশাররফ (পাকিস্তান, ২০০৮): অভিশংসনের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কায় এবং তৎকালীন তীব্র রাজনৈতিক চাপের মুখে পদত্যাগ করেন।
হোসনি মুবারক (মিশর, ২০১১): ঐতিহাসিক ‘আরব বসন্ত’ গণআন্দোলনের মুখে সুদীর্ঘ ৩০ বছরের একচ্ছত্র শাসনের অবসান ঘটিয়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
আলি আবদুল্লাহ সালেহ (ইয়েমেন, ২০১২): ‘আরব বসন্ত’ আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার সমঝোতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
দিলমা রুসেফ (ব্রাজিল, ২০১৬): সরকারি বাজেট আইন লঙ্ঘনের দায়ে সিনেটের ভোটে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিশংসিত ও অপসারিত হন।
পার্ক গিউন-হাই (দক্ষিণ কোরিয়া, ২০১৭): ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগে পার্লামেন্টে অভিশংসিত হওয়ার পর আদালত কর্তৃক বরখাস্ত হন।
রবার্ট মুগাবে (জিম্বাবুয়ে, ২০১৭): দীর্ঘ ৩৭ বছর ক্ষমতায় থাকার পর সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ ও নিজ দলের চাপে বাধ্য হয়ে পদত্যাগ করেন।
পেদ্রো পাবলো কুচিনস্কি (পেরু, ২০১৮): দুর্নীতির মারাত্মক অভিযোগ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে ইস্তফা দেন।
জ্যাকব জুমা (দক্ষিণ আফ্রিকা, ২০১৮): দুর্নীতির ব্যাপক অভিযোগ ও নিজ দল আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের (এএনসি) তীব্র চাপে পদত্যাগ করেন।
জোসেফ কাবিলা (গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, ২০১৮): দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন ও গণচাপের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন।
নুরসুলতান নজরবায়েভ (কাজাখস্তান, ২০১৯): প্রায় তিন দশক দেশ শাসনের পর সাধারণ জনগণের অসন্তোষ ও সামাজিক বিক্ষোভের মুখে স্বেচ্ছায় পদে ইস্তফা দেন।
ইভো মোরালেস (বলিভিয়া, ২০১৯): নির্বাচনে মারাত্মক কারচুপির অভিযোগ এবং সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ চাপে পদত্যাগ করেন।
মার্টিন ভিজকারা (পেরু, ২০২০): ২০২০ সালের নভেম্বরে কংগ্রেসের মুখোমুখি হয়ে অভিশংসনের মাধ্যমে পদচ্যুত ও অপসারিত হন।
গোটাবায়া রাজাপাকসে (শ্রীলঙ্কা, ২০২২): ইতিহাসের ভয়াবহতম অর্থনৈতিক সংকটের জেরে সৃষ্ট তীব্র গণআন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান এবং অনলাইনে পদত্যাগপত্র পাঠাতে বাধ্য হন।
নগুয়েন জুয়ান ফুক (ভিয়েতনাম, ২০২৩): কমিউনিস্ট শাসিত দেশটির অভ্যন্তরীণ দুর্নীতিবিরোধী অভিশানের মুখে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেন।
ভো ভান থুওং (ভিয়েতনাম, ২০২৪): পূর্বসূরি নগুয়েন জুয়ান ফুকের পথ ধরেই দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
মো. সাহাবুদ্দিন (বাংলাদেশ, ২০২৬): ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও পরবর্তীতে মেয়াদের মাঝপথেই শারীরিক অসুস্থতা ও অন্যান্য কারণে ২০২৬ সালের ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেন।