দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি ও কূটনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে ‘ব্রিকস’ (BRICS) আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। চীন সফরে থাকা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পর থেকে বাংলাদেশের ব্রিকস সদস্যপদের বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের ব্রিকস সম্পৃক্ততার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ পাওয়ায় কূটনৈতিক মহলে নতুন জল্পনা-কল্পনার সৃষ্টি হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে দেখলে, বাংলাদেশের ব্রিকস যাত্রার চেষ্টা নতুন কোনো ঘটনা নয়। তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ২০১৩ সালে বাংলাদেশ এই জোটে যোগ দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন জানিয়েছিল। এমনকি সেই সময়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত সদস্যপদ পাওয়া সম্ভব হয়নি। কেন বাংলাদেশ তখন সফল হয়নি, তার কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা কখনো পাওয়া যায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, ব্রিকসের সদস্য সংখ্যা সীমিত রাখা এবং জোটের ভেতরে রাজনৈতিক ও কৌশলগত সমীকরণই মূলত বড় বাধা ছিল। এখন প্রশ্ন উঠেছে, ভারতের সমর্থনে যেখানে সম্ভব হয়নি, সেখানে চীনের সমর্থনে বাংলাদেশ কি সফল হতে পারবে?
ব্রিকস মূলত ২০০৬ সালে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীন—এই চারটি বৃহৎ অর্থনীতির সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ দেওয়ার পর এর নাম হয় ‘ব্রিকস’। সময়ের পরিক্রমায় এটি বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনৈতিক ব্লকে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো এই জোটে যুক্ত হয়ে এর পরিধি আরও বিস্তৃত করেছে। বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যা এবং বৈশ্বিক জিডিপির এক বিশাল অংশ এখন এই জোটের অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণে। নিজেদের মধ্যে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানো, উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন এবং অবকাঠামো উন্নয়নে একে অপরকে সহায়তা করাই এই জোটের মূল লক্ষ্য। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য এমন একটি শক্তিশালী ব্লকের সদস্য হওয়া অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের এক অনন্য সুযোগ হতে পারে।
বাংলাদেশ যদি ব্রিকসের সদস্য হতে পারে, তবে এর সম্ভাব্য সুফল বহুমুখী। প্রথমত, ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ (NDB) থেকে সহজ শর্তে বিপুল পরিমাণ ঋণ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে, যা বাংলাদেশের মেগা প্রজেক্টসহ অবকাঠামো খাতে অর্থায়নের সংকট দূর করতে পারে। বিদ্যুৎ, রেলপথ, নদী ব্যবস্থাপনা বা শিল্পায়নের মতো বৃহৎ প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ পাওয়ার পথ সুগম হবে। এছাড়া চীন, ভারত, ব্রাজিল কিংবা রাশিয়ার মতো শক্তিশালী অর্থনীতির দেশগুলোর সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও নিবিড় করার সুযোগ তৈরি হবে। বর্তমান সরকারের লক্ষ্য যেহেতু বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধি করা, তাই ব্রিকসের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা তাদের জন্য অত্যন্ত কার্যকর কৌশল হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এবারের চীন সফর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ইতোমধ্যে চীনের পক্ষ থেকে তিস্তা মহাপরিকল্পনা, নদী ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও শিল্পায়নে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ১৩টি সমঝোতা স্মারক তারই প্রমাণ। এই সমঝোতাগুলো অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন গতি দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সদস্যপদের সুফল পাওয়ার বিষয়টি কেবল আবেদনের ওপর নির্ভর করে না; বরং একটি দেশ কতটা কার্যকরভাবে জোটের সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারে, তার ওপরই আসল সাফল্য নির্ভর করে। প্রশ্ন হলো—শেখ হাসিনার আমলে যে স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি, তারেক রহমানের সরকারের হাত ধরে কি তা পূর্ণতা পাবে? নাকি আবারও কোনো ভূ-রাজনৈতিক গোলকধাঁধায় আটকে পড়বে বাংলাদেশের এই যাত্রা?
ব্রিকসের নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি কেবল চীন বা অন্য কোনো একক দেশের ওপর নির্ভর করে না; এর জন্য বিদ্যমান সদস্য দেশগুলোর ঐকমত্য প্রয়োজন। অর্থাৎ, চীন সমর্থন দিলেও জোটের অন্য দেশগুলোর সম্মতি বা আপত্তির বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক দাবার ছকে বাংলাদেশ বরাবরই এক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। চীন ও ভারত—উভয় দেশেরই এই অঞ্চলে কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। তাই বাংলাদেশের ব্রিকস সদস্যপদ লাভের বিষয়টি এখন কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, বরং এটি ভূ-রাজনীতির একটি সূক্ষ্ম লড়াইয়ের অংশও বটে। চীন ও ভারতের পারস্পরিক প্রতিযোগিতামূলক আগ্রহের মাঝখানে বাংলাদেশ কীভাবে নিজের স্বার্থ হাসিল করতে পারে, সেটাই এখন নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
পরিশেষে বলা যায়, ব্রিকসে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভ কেবল একটি প্রতীকী অর্জন হবে না, এটি হবে বাংলাদেশের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক একীভূতকরণের একটি বড় পদক্ষেপ। বর্তমান সরকারের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বা স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির যে বার্তা, তার প্রতিফলন এই প্রক্রিয়ায় দেখা যেতে পারে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই হয়তো পরিষ্কার হবে ব্রিকস যাত্রায় বাংলাদেশ কতটা সফল হতে পারবে। তবে এটুকু নিশ্চিত যে, বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকতে হলে শক্তিশালী জোটের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। ব্রিকসের সদস্যপদ পাওয়ার বিষয়টি এখন কেবল অর্থনীতির অঙ্কে সীমাবদ্ধ নেই, এটি বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এক বড় পরীক্ষার নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের কূটনৈতিক বিচক্ষণতা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে লবিংয়ের সক্ষমতার ওপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশের এই ব্রিকস যাত্রার ভবিষ্যৎ।
তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ