দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর গত এপ্রিল মাসে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যে সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল, তা ভেঙে অবশেষে আবার বড় ধরনের যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছে। রোববার ইসরায়েল জুড়ে আকস্মিক বিমান হামলার সাইরেন বেজে ওঠে, যখন দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনী ইরান থেকে ধেয়ে আসা একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্রের ঝাঁক ভূপাতিত করার জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালাচ্ছিল। গত এপ্রিলের পর এই প্রথম সরাসরি ইসরায়েলের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ইরান এই ধরণের বড় বিমান হামলা চালালো। লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইসরায়েলি বিমান বাহিনীর একটি নতুন ও বিধ্বংসী হামলার জবাবে তেহরান পাল্টা প্রতিশোধ নেওয়ার চরম হুঁশিয়ারি দেওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই হামলা চালানো হয়।
চলতি বছরের ৮ই এপ্রিল আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় ইরান, ইসরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। যার ফলে এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের মনে একটি স্থায়ী শান্তির আশা জেগেছিল। তবে এই সাময়িক যুদ্ধবিরতিকে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে রূপান্তর করার জন্য কূটনৈতিক মহলে যে প্রচেষ্টা চলছিল, তা বারবার স্থবির হয়ে পড়ে। রোববারের এই আকস্মিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনা মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ১০০তম দিনে এসে স্থায়ী শান্তির সমস্ত আশাকে ধূলিসাৎ করে দিল। তেহরানের পক্ষ থেকে বরাবরই জোর দিয়ে বলা হচ্ছিল যে, যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হলে লেবাননে চলমান সংঘর্ষও পুরোপুরি থামাতে হবে। যেখানে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ইরানের মদদপুষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে তীব্র সামরিক অভিযান চালাচ্ছে। ইরান আগেই স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছিল যে, বৈরুতে নতুন করে কোনো হামলা চালানো হলে তা যুদ্ধবিরতির অবসান ঘটিয়ে আবার ‘পূর্ণ মাত্রার যুদ্ধ’ ডেকে আনবে।
রোববার সকালে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয় যে, ইসরায়েলি ভূখণ্ডে হিজবুল্লাহর রকেট হামলার জবাবে তাদের বিমান বাহিনী বৈরুতের দাহিরাহ জেলায় অবস্থিত একটি সুনির্দিষ্ট জঙ্গি কমান্ড সেন্টারে সফল হামলা চালিয়েছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের এই বিমান হামলায় অন্তত দুজন সাধারণ নাগরিক নিহত এবং আরও ২০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। ইসরায়েল আগেই হুমকি দিয়েছিল যে, হিজবুল্লাহ যদি উত্তর ইসরায়েলে কোনো ধরনের উস্কানি দেয় তবে তারা বৈরুতের কেন্দ্রস্থলে আঘাত করবে। পরবর্তীতে হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকেও নিশ্চিত করা হয় যে, তারা রোববার সকালে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দুটি ব্যারাকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
এই ঘটনার পর ওয়াশিংটনের সাথে চলমান শান্তি আলোচনার প্রধান আলোচক এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, আমেরিকার সবুজ সংকেত বা পরোক্ষ মদদ পেয়েই ইসরায়েল বৈরুতে এই অমানবিক হামলা চালানোর সাহস পেয়েছে। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে এই অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন ও ইসরায়েলি সমস্ত সামরিক ও বেসামরিক সম্পদ এখন ইরানের জন্য ‘বৈধ টার্গেটে’ পরিণত হয়েছে। এর ঠিক কয়েক ঘণ্টা পরেই ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানায়, তারা ইরান থেকে কমপক্ষে তিনটি বড় ঢেউয়ে ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করেছে এবং তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা আয়রন ডোম এই হুমকিগুলো প্রতিহত করতে কাজ করছে।
ইরানের সামরিক সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান জেনারেল আলী আবদুল্লাহি এক বিবৃতিতে বলেন, বৈরুতে হামলা চালিয়ে ইসরায়েল সমস্ত আন্তর্জাতিক রেড লাইন বা সীমারেখা অতিক্রম করেছে। তিনি অবিলম্বে লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান বন্ধের দাবি জানান। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে অবশ্যই দক্ষিণ লেবানন এবং এর শহরতলিতে হামলা চালানো বন্ধ করতে হবে। তারা যদি এই অঞ্চলে তাদের আগ্রাসন আরও বাড়ায় বা ইরানের এই পাল্টা জবাবের বিপরীতে পুনরায় কোনো হামলা করার চেষ্টা করে, তবে তাদের আরও বিধ্বংসী, মারাত্মক এবং অনুশোচনামূলক আঘাতের মুখোমুখি হতে হবে।
এই তীব্র সামরিক উত্তেজনা এমন এক সময়ে এলো যখন ইরানের সাধারণ মানুষ ইতিমধ্যে কয়েক সপ্তাহের চরম রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। দেশটির আহভাজ অঞ্চলের ৩২ বছর বয়সী একজন ফিটনেস ট্রেইনার এলাহেহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেন, অবিরত যুদ্ধের শঙ্কায় তিনি এখন সম্পূর্ণ অবশ ও অনুভূতিহীন হয়ে পড়েছেন। জীবনযাত্রার আকাশছোঁয়া খরচের কথা উল্লেখ করে তিনি আক্ষেপের সাথে বলেন, প্রতিদিনের স্বাভাবিক জীবনযাপন এখন আমাদের জন্য একটি নিষ্ঠুর তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়। চারপাশের সবকিছু এত ভয়াবহ যে আমরা এখন কেবল কোনোমতে টিকে থাকার চেষ্টা করছি। ফারহাদ নামের ৩৫ বছর বয়সী এক ইরানি শেফও জানান, যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে থেকেই দেশের অর্থনৈতিক মন্দার কারণে জীবন দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছিল। তিনি বলেন, মাত্র কয়েক মাস আগেও যে জিনিসগুলো কেনার কথা মানুষ অনায়াসে ভাবত, দেশের বর্তমান যুদ্ধাবস্থা ও মুদ্রাস্ফীতির কারণে সেগুলো এখন সাধারণ মানুষের কাছে কেবলই স্বপ্ন ও রূপকথার গল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভয়াবহ এই যুদ্ধাবস্থার মাঝেই গত শনি ও রোববার পর্দার আড়ালে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক তৎপরতার লক্ষণও দেখা গেছে। পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি এই সংকটের মধ্যে হঠাৎ তেহরান সফরে যান। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্য অনুযায়ী, সফরে এসে নকভি পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের পক্ষ থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উদ্দেশ্যে লেখা একটি ‘বিশেষ চিঠি’ এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর একটি জরুরি বার্তা হস্তান্তর করেন। উল্লেখ্য, পাকিস্তানের সামরিক নেতা সৈয়দ অসীম মুনির এর আগে ইসলামাবাদে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রথম দফার প্রত্যক্ষ আলোচনার আয়োজন করে দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। একই সাথে গত শনিবার লেবাননের সেনাপ্রধান রডলফ হাইকাল পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের সাথে বিশেষ বৈঠকে অংশ নিতে ইসলামাবাদে যান। সূত্রগুলো বলছে, লেবাননের সেনাপ্রধানের এই ঝটিকা সফরটি মূলত তেহরান এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে চলমান পাকিস্তানি মধ্যস্থতারই একটি বড় অংশ।
তবে এই শান্তি আলোচনা এখন এক বড় ধরণের অচলাবস্থার মুখে পড়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনির সামরিক উপদেষ্টা মহসেন রেজাই এক সাক্ষাৎকারে সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দিকে আঙুল তুলেছেন। তিনি বলেন, আমেরিকার সাথে ইরানের শান্তি আলোচনা বর্তমানে সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছে এবং ট্রাম্পকেই এখন এই অচলাবস্থা ভাঙার উদ্যোগ নিতে হবে। একই সাথে তিনি বিশ্বজুড়ে আমেরিকার ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের প্রায় ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের হিমায়িত সম্পদ অবিলম্বে ছেড়ে দেওয়ার আহ্বান জানান। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একই সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, তেহরানের সাথে কোনো প্রাথমিক ও সুনির্দিষ্ট চুক্তিতে পৌঁছানোর আগে তিনি কোনোভাবেই ইরানের এই বিলিয়ন ডলারের সম্পদ অবমুক্ত করবেন না। ট্রাম্পের সাফ কথা, ইরান যদি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভালো আচরণ করে এবং শান্তি বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে, তবেই কেবল ওয়াশিংটন তাদের সাথে এই অর্থ নিয়ে কথা বলা শুরু করবে। প্রকৃতপক্ষে, মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র থেকে জানা গেছে, ওয়াশিংটন হয়তো এই জব্দকৃত ইরানি তহবিল ব্যবহার করে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের ওপর ইরানের অতীতে চালানো ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ক্ষয়ক্ষতি পূরণ করার পরিকল্পনা করছে।
এরই মধ্যে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেনটকম) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, তারা রাতভর অভিযান চালিয়ে হরমুজ প্রণালীতে আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্য ও নৌচলাচলের জন্য হুমকিস্বরূপ দুটি ইরানি ড্রোন ধ্বংস করেছে। এর আগে আমেরিকার পক্ষ থেকে ইরানের একটি ড্রোন ভূপাতিত করা এবং ইরানের মূল ভূখণ্ডের কিছু রাডার সাইটে মার্কিন হামলার ঘটনার জেরে গত শনিবার ইরান ক্ষুব্ধ হয়ে আমেরিকার প্রধান দুই উপসাগরীয় মিত্র দেশ বাহরাইন এবং কুয়েতের সামরিক ঘাঁটিতে একযোগে বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের এই শততম দিনের যুদ্ধ পরিস্থিতি পুরো অঞ্চলকে এক নতুন এবং অত্যন্ত ভয়াবহ আঞ্চলিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে এনে দাঁড় করিয়েছে।