গত দেড় দশক ধরে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে নিষ্ঠুর ও প্রত্যক্ষ শিকার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম জনবহুল দেশ বাংলাদেশ। ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু সংক্রান্ত উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বাংলাদেশে দাবদাহ বা ‘হিট ওয়েভ’ কেবল আগের চেয়ে তীব্রই হচ্ছে না, বরং এটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে দেশের নতুন নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। এক সময় দেশের নির্দিষ্ট কিছু উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা খরাপ্রবণ হিসেবে পরিচিত থাকলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের প্রতিটি প্রান্তেই তীব্র বা অতি তীব্র দাবদাহ নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবহাওয়াবিদ ও জলবায়ু বিজ্ঞানীদের মতে, এখন দেশের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির চেয়েও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘হিট ইনডেক্স’ বা মানুষের শরীরে অনুভূত প্রকৃত তাপমাত্রা। বাতাসে অতিরিক্ত জলীয় বাষ্পের উপস্থিতির কারণে যখন এই হিট ইনডেক্স ৩৫° সেলসিয়াস কিংবা তার চেয়ে বেশি অতিক্রম করে, তখন মানুষের শরীর স্বাভাবিক উপায়ে ঘামের মাধ্যমে নিজেকে শীতল করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এর ফলে হিট স্ট্রোকসহ নানা ধরনের প্রাণঘাতী স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে, যা দেশের সামগ্রিক জনজীবনকে এক চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, বিগত ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের আবহাওয়া চক্রে এক অভূতপূর্ব ও আশঙ্কাজনক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। বছরের পর বছর ধরে গ্রীষ্মের স্থায়িত্ব বাড়ছে এবং শীতকাল ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে। মার্চ মাসের শেষভাগ থেকে শুরু করে পুরো এপ্রিল, মে এবং জুনের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত দেশের ওপর দিয়ে একের পর এক দীর্ঘস্থায়ী দাবদাহ বয়ে যাচ্ছে। অতীতে সাধারণত ৩ থেকে ৫ দিন স্থায়ী হয়ে দাবদাহ কেটে গেলেও, এখন তা টানা ১৫ থেকে ২৮ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হচ্ছে। এই দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ তাপমাত্রা ভূগর্ভস্থ পানির স্তরকে আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নামিয়ে দিচ্ছে, যার ফলে গ্রামীণ জনপদে তীব্র সুপেয় পানির সংকট দেখা দিচ্ছে। অন্যদিকে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বন উজাড় এবং জলাশয় ভরাট করার কারণে রাজধানী ঢাকাসহ বড় বড় শহরগুলো একেকটি ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ বা কৃত্রিম তাপীয় দ্বীপে পরিণত হয়েছে। শহরের বহুতল ভবন, পিচঢালা রাস্তা এবং হাজার হাজার শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) থেকে নির্গত গরম বাতাস শহরের ভেতরের তাপমাত্রাকে চারপাশের গ্রামীণ অঞ্চলের চেয়ে আরও ৪ থেকে ৫ ডিগ্রি বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা নিম্নবিত্ত ও খেটে খাওয়া মানুষের জীবনকে নরকতুল্য করে তুলেছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো কৃষি। কিন্তু এই অনিয়ন্ত্রিত ও তীব্র দাবদাহের কারণে দেশের খাদ্য উৎপাদন ও কৃষি খাত সবচেয়ে বড় ধাক্কা খাচ্ছে। তীব্র তাপদাহ ও অনাবৃষ্টির কারণে বোরো ও আমন ধানের আবাদ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। হিট ওয়েভের কারণে ধানের শীষ শুকিয়ে ‘চিটা’ হয়ে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে, যা কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রমকে এক নিমিষে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে। শুধু ধান নয়, তীব্র গরমে দেশের আম, লিচুসহ বিভিন্ন মৌসুমী ফলের মুকুল ও কচি ফল ঝরে পড়ছে। মাটিতে আর্দ্রতা না থাকায় এবং খরা পরিস্থিতির কারণে কৃষকদের অতিরিক্ত খরচ করে গভীর নলকূপের মাধ্যমে কৃত্রিম সেচ দিতে হচ্ছে, যা ফসলের উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর সমান্তরালে দেশের পোল্ট্রি ও ডেইরি খাতেও বিপর্যয় নেমে এসেছে; অতিরিক্ত তাপে প্রতিদিন হাজার হাজার মুরগি হিট স্ট্রোকে মারা যাচ্ছে এবং খামারের গাভীর দুধ উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, জলবায়ুর এই চরম ভাবাপন্ন আচরণ যদি এভাবে অব্যাহত থাকে, তবে আগামী দিনগুলোতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
দাবদাহের এই নিষ্ঠুর প্রকোপ সমাজের সব শ্রেণীর মানুষের ওপর সমানভাবে পড়ে না। এর সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন দেশের লাখ লাখ শ্রমজীবী মানুষ—যাদের জীবিকার তাগিদে তপ্ত রোদের নিচে দাঁড়িয়ে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হয়। রিকশাচালক, দিনমজুর, নির্মাণ শ্রমিক এবং কৃষি শ্রমিকরা এই তীব্র গরমে সবচেয়ে বেশি মানবিক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন। অতিরিক্ত গরমে দীর্ঘ সময় কাজ করার ফলে পানিশূন্যতা, তীব্র ক্লান্তি এবং হিট স্ট্রোকের শিকার হয়ে প্রতি বছর অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, যার বড় অংশই গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় না।
এর পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের ওপর এই হিট ওয়েভ এক মরণকামড় বসাচ্ছে। ডায়রিয়া, জন্ডিস, টাইফয়েড এবং বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগের প্রাদুর্ভাব গরমের দিনে মহামারী আকার ধারণ করছে। বিশেষ করে সরকারি হাসপাতালগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণ ও তিনগুণ রোগী ভর্তি হচ্ছেন, যাদের অধিকাংশেরই অসুস্থতার মূল কারণ এই তীব্র গরম। শিশু ও বৃদ্ধদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়ায় তারা এই বৈরী আবহাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে দিন কাটাচ্ছেন।
বিশ্বব্যাংক ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার বৈশ্বিক জলবায়ু রিপোর্ট অনুযায়ী, ক্রমাগত তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর কর্মক্ষমতা এবং শ্রম উৎপাদনশীলতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। অতিরিক্ত গরমের কারণে দুপুরের দিকে শ্রমিকদের কাজের গতি ধীর হয়ে যায় কিংবা কাজ পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হয়, যার ফলে সার্বিক জাতীয় অর্থনীতিতে কোটি কোটি ডলারের ক্ষতি হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী হলেও, ভৌগোলিক অবস্থান ও ঘনবসতির কারণে এর নেতিবাচক প্রভাব এদেশের ওপরই সবচেয়ে বেশি পড়ছে। পরিবেশবিদ ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, তীব্র দাবদাহ ও নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে গ্রামের হাজার হাজার পরিবার প্রতি বছর বাস্তুচ্যুত হয়ে জীবিকার সন্ধানে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় বড় শহরের বস্তিগুলোতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে, যা এক নতুন ‘ক্লাইমেট রিফিউজি’ বা জলবায়ু উদ্বাস্তু সংকটের জন্ম দিচ্ছে।
এই নজিরবিহীন ও দীর্ঘমেয়াদি সংকট থেকে বাঁচতে হলে শুধু আশু ত্রাণ বিতরণ বা সাময়িক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন একটি সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় মহাপরিকল্পনা। সরকারকে পরিবেশ রক্ষায় কঠোর আইন প্রণয়ন করতে হবে, নদী ও প্রাকৃতিক জলাশয় উদ্ধার করতে হবে এবং দেশজুড়ে ব্যাপক বনায়ন কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। একই সাথে আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে বাংলাদেশের পাওনা ন্যায্য ক্ষতিপূরণ আদায়ে বিশ্বমঞ্চে আরও জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, এই দাবদাহের আগুন আগামী দিনে দেশের উন্নয়ন ও মানুষের ভবিষ্যৎকে সম্পূর্ণ ছাই করে দেবে।
তথ্যসূত্র: ডেইলি স্টার