মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত এখন আর শুধু ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি ধীরে ধীরে পুরো বিশ্বের ডিজিটাল অর্থনীতিকে খাদের কিনারায় ঠেলে দিচ্ছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে সেমিকন্ডাক্টর (চিপ) শিল্পের অতি প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সরবরাহ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ক্লাউড অবকাঠামোর ওপর মারাত্মক চাপ তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে স্মার্টফোন থেকে শুরু করে ল্যাপটপ, গাড়ি, সার্ভার, ব্যাংকিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)—সবকিছুর দাম বাড়বে এবং সেবার গতি শ্লথ হয়ে সাধারণ ভোক্তার দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাবে।
মাইক্রোচিপ: আধুনিক বিশ্বের মূল ভিত্তি এবং যুদ্ধের প্রভাব
বর্তমান ডিজিটাল যুগের প্রতিটি ডিভাইস—স্যাটেলাইট, চিকিৎসা যন্ত্র, স্মার্টফোন থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক গাড়ি—সবকিছুর প্রাণ হলো ক্ষুদ্র মাইক্রোচিপ বা ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট।
একটি চিপ তৈরিতে শতাধিক ধাপের সূক্ষ্ম রাসায়নিক প্রক্রিয়া পার হতে হয়। এই প্রক্রিয়ায় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও রাসায়নিক বিক্রিয়ার জন্য হিলিয়াম এবং ব্রোমিন-এর মতো উপাদান অপরিহার্য।
হিলিয়ামের সংকট: চিপ তৈরির অত্যন্ত সংবেদনশীল যন্ত্রপাতির তাপমাত্রা দ্রুত কমাতে হিলিয়াম গ্যাস ব্যবহার করা হয়। পৃথিবীতে এর কার্যকর কোনো বিকল্প নেই এবং কাতার একাই এর বৈশ্বিক সরবরাহের বড় অংশ জোগান দেয়। যুদ্ধ বা অবরোধের কারণে এই সরবরাহ ব্যাহত হলে চিপ উৎপাদন থমকে যেতে পারে।
ব্রোমিনের অভাব: চিপের সার্কিট নকশা তৈরি ও রাসায়নিকভাবে নির্দিষ্ট অংশ কাটার (প্লাজমা এচিং) জন্য ব্রোমিন অপরিহার্য। এই উপাদানের সরবরাহ বিঘ্নিত হলেও পুরো উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
ডেটা সেন্টার ও ক্লাউড অবকাঠামো এখন ‘কৌশলগত লক্ষ্যবস্তু’ আগে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে কেবল তেলক্ষেত্র বা সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু হলেও, এখন ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর সরাসরি হামলা হচ্ছে।
ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড-সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম গুগল, অ্যামাজন, মাইক্রোসফট, এনভিডিয়া, আইবিএম ও ওরাকলের মতো শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ডেটা সেন্টারগুলোকে ‘সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে ঘোষণা করেছে।
ইতোমধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসের (AWS) কয়েকটি ডেটা সেন্টারে ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে, যার ফলে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও আঞ্চলিক ব্যাংকিং সেবায় বিঘ্ন ঘটে।
নিরাপত্তার স্বার্থে এনভিডিয়া ও অ্যামাজন তাদের দুবাইয়ের আঞ্চলিক অফিস সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে।
হিলকো গ্লোবালের ভূ-রাজনীতি ইউনিটের নির্বাহী পরিচালক প্যাট্রিক মারফি বলেন, “ডিজিটাল অবকাঠামোকে কৌশলগত লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা প্রযুক্তি শিল্পের জন্য এক বড় অশনিসংকেত।”
জ্বালানি সংকট ও তাইওয়ানের ঝুঁকি চিপ উৎপাদনে কাঁচামালের পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানিও প্রয়োজন।
বিশ্বের উন্নতমানের চিপের প্রায় ৯০ শতাংশই তৈরি হয় তাইওয়ানে। কিন্তু দেশটি জ্বালানির জন্য পুরোপুরি আমদানিনির্ভর।
মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে তাইওয়ানের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ফলশ্রুতিতে পুরো বিশ্বের চিপ সরবরাহ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।
দক্ষিণ কোরিয়া ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) ভবিষ্যৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বিস্তারের কারণে মেমোরি চিপের চাহিদা এখন আকাশচুম্বী, যার প্রধান উৎপাদক দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্স। কাঁচামাল ও জ্বালানি সংকটে এই চিপগুলোর দাম বেড়ে গেলে এআই প্রযুক্তি সম্প্রসারণের গতি মারাত্মকভাবে কমে যাবে।
যুদ্ধের এই প্রভাব ইতোমধ্যে শেয়ারবাজারেও পড়েছে। সংঘাত শুরুর পর থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানিগুলোর বাজারমূল্য প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলার কমে গেছে।