বাংলাদেশ বর্তমানে জনমিতিক লভ্যাংশ বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’-এর মতো এক স্বর্ণযুগ পার করছে, যেখানে দেশের সিংহভাগ জনগোষ্ঠীই তরুণ ও কর্মক্ষম। গবেষকদের মতে, তরুণদের সংখ্যাধিক্যের এই পরম সুফল আগামী ২০৪০ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। কিন্তু চরম বাস্তবতার বিষয় হলো, এই বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক সংঘাত ও ক্রমবর্ধমান বৈষম্য নিয়ে সবচেয়ে বেশি মানসিক দুশ্চিন্তা ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন বাংলাদেশের তরুণরা। এমনকি যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান, চরম অর্থনৈতিক দেউলিয়া দশায় পড়া পাকিস্তান কিংবা প্রতিবেশী দেশ ভারতের চেয়েও এ দেশের তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের হার অনেক বেশি। বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবসের প্রাক্কালে জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) প্রকাশিত একটি বৈশ্বিক জরিপ প্রতিবেদনে এই হতাশাজনক ও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
‘লাইভস, চয়েজেস অ্যান্ড ফিউচারস: ডেমোগ্রাফিক ফিউচারস সার্ভে’ শীর্ষক এই বৈশ্বিক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৬৮ দশমিক ২ শতাংশ তরুণই তাঁদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ, সামাজিক নিরাপত্তা ও বৈষম্য নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এই হার সর্বোচ্চ, যা দেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা। জরিপের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, একই বিষয়ে ভুটানের ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ, আফগানিস্তানের ৫৪ দশমিক ৭ শতাংশ, পাকিস্তানের ৫৩ দশমিক ২ শতাংশ এবং ভারতের ৪৭ দশমিক ৪ শতাংশ তরুণ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কেবল আঞ্চলিক পর্যায়েই নয়, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও ৭৩টি দেশের তরুণদের ওপর পরিচালিত এই জরিপে উদ্বেগের দিক থেকে শীর্ষ দশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। এমন এক সময়ে এই রিপোর্টটি সামনে এলো যখন দেশের জাতীয় যুবনীতি অনুযায়ী মোট জনসংখ্যার ৬৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ মানুষের বয়সই ৩৫ বছরের নিচে, যারা দেশের প্রবৃদ্ধি ও উদ্ভাবনের মূল শক্তি হতে পারত।
দেশের এই বৃহৎ তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা না গেলে এই জনমিতিক লভ্যাংশই যে অদূর ভবিষ্যতে দেশের জন্য এক প্রকাণ্ড প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক বোঝায় পরিণত হতে পারে, সেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। বেসরকারি চাকরির বাজার ও শীর্ষস্থানীয় জব পোর্টাল বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফাহিম মাশরুর এ প্রসঙ্গে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, দেশে দীর্ঘমেয়াদি ও দূরদর্শী পরিকল্পনা করার মতো প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বা মানসিকতা আমাদের আমলা ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে গড়ে ওঠেনি। গত এক-দেড় দশকে তরুণদের প্রশিক্ষণের নামে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ অপচয় করা হলেও আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত না করতে পারায় এর কোনো দীর্ঘমেয়াদি সুফল বা প্রভাব শ্রমবাজারে দৃশ্যমান হয়নি। ফলে সনদধারী বেকারের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে।
শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) এক চাঞ্চল্যকর তথ্যে দেখা গেছে, ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত মাত্র ছয় বছরে দেশে প্রায় সাড়ে ১৮ লাখের বেশি উচ্চশিক্ষিত ডিগ্রিধারী তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করেছেন, যাদের একটি বড় অংশই কারিগরি ও বাস্তবমুখী দক্ষতাহীন। বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জাটের সাম্প্রতিক এক বিবৃতিতে দেশের এই করুণ অবস্থার সত্যতা মেলে। তিনি জানান, গত এক দশকে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ প্রবেশ করলেও কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে মাত্র ৮৭ লাখের। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক কর্মক্ষম তরুণ কোনো চাকরিই পাননি, যার মধ্যে তরুণীদের অবস্থা আরও বেশি শোচনীয়। একাডেমিক শিক্ষার সাথে বাস্তবমুখী কর্মক্ষেত্রের এই বিস্তর ফারাকের কারণে আরিফুল ইসলামের মতো হাজার হাজার স্নাতকোত্তর পাস করা তরুণ বছরের পর বছর সরকারি ও বেসরকারি চাকরির পেছনে ঘুরেও কোনো কূলকিনারা পাচ্ছেন না।
এই চরম অব্যবস্থাপনার পেছনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নীতিগত অসংগতি ও অদক্ষতাকে দায়ী করেছেন জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. নাজনীন কাউসার চৌধুরী। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, গত সাড়ে পাঁচ দশকে মানবসম্পদ উন্নয়নে রাষ্ট্র বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করলেও বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের মারাত্মক অভাব, বাজেটের পুনরাবৃত্তি এবং কার্যকর পর্যবেক্ষণের দুর্বলতার কারণে সেই বিনিয়োগের কাঙ্ক্ষিত সুফল দেশ পায়নি। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক শ্রমশক্তি জরিপ ও বিবিএস-এর তথ্য বলছে, দেশের প্রায় এক কোটি মানুষ বর্তমানে যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ না পেয়ে ছদ্ম বেকারত্বের শিকার। দেশের মোট বেকারের প্রতি পাঁচজনের একজনই উচ্চ শিক্ষিত (স্নাতক বা উচ্চ মাধ্যমিক পাস) এবং যুব বেকারদের প্রায় ২৯ শতাংশই বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী, যা মেধার চরম অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়।
তবে এই বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ সংকটের মধ্যেও যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় তরুণদের দক্ষ করে তুলতে কিছু নতুন আশার কথা শুনিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম জানিয়েছেন, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের অধীনে বর্তমানে দেশের ৭৩টি কেন্দ্রে মোট ৮৩টি প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক ট্রেডে (যেমন ইলেকট্রনিক্স, ইলেকট্রিক্যাল ও হাউজকিপিং) তরুণদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া বিশ্বব্যাংকের বিশেষ আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় ‘আর্ন’ নামে একটি মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, যার আনুষ্ঠানিক চুক্তি আগামীকাল স্বাক্ষরিত হবে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে আগামী ৩০ মাসের মধ্যে দেশের প্রায় সাত লাখ তরুণের দক্ষতা উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে। এর পাশাপাশি বর্তমান যুগের চাহিদার সাথে সংগতি রেখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বিষয়ে দক্ষ জনবল তৈরিতে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মাধ্যমে আরও একটি বিশেষ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার, যা তরুণদের এই গভীর অর্থনৈতিক উদ্বেগ কাটাতে কিছুটা হলেও সাহায্য করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা