• শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০৬ অপরাহ্ন

শিকলবন্দী সন্তানদের ৮টি আনন্দ

বাদল সৈয়দ / ৮ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এক রাতে বেশ দেরি করে বাড়ি ফিরছি। কারণ টিউশনিতে দেরি হয়েছে। কলোনিতে ঢুকতেই দেখি, শিউলি হনহন করে কোথায় যেন যাচ্ছে।
ও আমাদের সামনের বিল্ডিংয়ে থাকত। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘এত রাতে কই যাস?’
সে উত্তর দিল, ‘আব্বার খুব মাথাব্যথা। তাই ওষুধ আনতে যাই।’
আমি বললাম, ‘সাথে আসব?’
সে নির্বিকারভাবে উত্তর দিল, ‘না। কলোনিতে আমার ভয় কী?’
আমি কথা না বাড়িয়ে বাড়ির পথ ধরলাম। আসলেই কলোনিতে কোনো ভয় নেই।
তখন প্রতিটি পাড়ার পরিবেশ ছিল এমন—শত-সহস্র চোখ ছেলেমেয়েদের পাহারা দিত।
তাদের দিকে কেউ চোখ তুলে তাকাবে এমন সাহস কারও ছিল না।
আমার মেয়ে আমাকে মাঝে মাঝে বলে, ‘আমি তো কারাগারে বড় হয়েছি। বাসা নামের কারাগার। যখনই বাইরে গেছি, কারারক্ষীর মতো তুমি বা মা সঙ্গী হয়েছ।’
এর চেয়ে কঠিন সত্য আমাদের সন্তানদের জন্য আর নেই!
এ কারাগারের তালা কীভাবে ভাঙা যায়?
আমি নিজেও জানি না। তবে আমি কিছু উপায় বলতে পারি, তাতে তালা পুরোপুরি ভাঙা যাবে না, কিন্তু কারাগার জীবন কিছুটা সহনীয় হতে পারে।
১) তাদের বন্ধু বানানোর সুযোগ দিন।
শুধু স্কুল-কলেজ নয়, পাড়ার ছেলেমেয়েদের সাথেও বন্ধুত্ব করায় উৎসাহ দিন। পাড়াতো বন্ধু খুব আপন হয়। কারণ এখানে ক্লাসের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকে না। শুধু সাবধান থাকবেন, বন্ধু সিলেকশন যাতে ভালো হয়।
২) আমাদের শৈশবের বড় অংশ কেটেছে মাঠে। ওদের সে সুযোগ নেই বললেই চলে। তারপরও নিরাপদ পরিবেশে ওদের খেলার সুযোগ করে দেওয়ার চেষ্টা করুন। কোনো পার্কে নিয়ে যান। ওরা কিছুক্ষণ উন্মুক্ত আকাশের নিচে সময় কাটাক। সম্ভব হলে ছাদে খেলার ব্যবস্থা করুন।
৩) মাঝে মাঝে কাছেধারে ওদের পিকনিক করতে দিন। যেমন বাসার ছাদে, আশেপাশে খোলা জায়গায়। পিকনিকের আনন্দ চিরকাল জেগে থাকে। তাছাড়া, পিকনিকের ম্যানেজমেন্ট এমন কিছু শিক্ষা দেয়, যা স্কুল বা বাসায় সহজে শেখা যায় না।
৪) স্কুল-কলেজে খেলাধুলা ও এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজ বাচ্চাদের টিমটিম করে বেঁচে থাকা স্বাধীনতাগুলোর একটি। এগুলো নিভিয়ে দেবেন না। জ্বালিয়ে রাখুন।
৫) আমরা কাজিনরা ছিলাম সেরা বন্ধু। খুব হইহুল্লোড় করতাম। আবার মারপিটও করতাম। এখন মনে হয়, সেই হুল্লোড়,সেই মারামারি জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সঞ্চয়।
বাচ্চাদের কাজিনদের সাথে বন্ধুত্ব করতে উৎসাহ দিন। এরা তাদের আনন্দের সেরা উৎস হতে পারে।
৬) একটি সুন্দর জায়গায় যাওয়া, পছন্দের আইসক্রিম মাঝে মাঝে খেতে পারা —এগুলো ওদের পাওনা। এমনিতেই তো ওরা ঘরবন্দি। ওদের এসব আনন্দ উপহার দিন।
৭) বাইরের পৃথিবী মুক্ত চিন্তার উৎস। সেই উৎস যেহেতু নিরাপদ না, তাই ঘরকেই পৃথিবী বানান। নিজেরা ওদের সেরা বন্ধু হন, একসঙ্গে খেলা দেখুন, মুভি দেখুন, গল্প করুন। বাড়িই হোক সকল আনন্দের উৎস।
৮) সপ্তাহে একটি দিন হোক ওদের ইচ্ছাপূরণের দিন। সেদিন পড়ালেখার চাপ না দিয়ে নির্দোষ ইচ্ছাপূরণের সুযোগ দিন।
কিছুদিন আগে শিউলিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘তোর ওই রাতের কথা মনে আছে? ওষুধ কিনতে যাচ্ছিলি। আমি সঙ্গে যাব কি না জিজ্ঞেস করেছিলাম।’
সে বলল, ‘আছে, ভাইয়া।’
‘এখন কি তুই তোর মেয়েকে অত রাতে বের হতে দিবি?’
‘ভাইয়া, সেদিন তো আব্বার মাথাব্যথার ওষুধ আনতে বের হয়েছিলাম। এখন যদি বাড়িতে হার্ট অ্যাটাকে মারাও যাই, তবুও মেয়েকে ওষুধ আনতে পাঠাব না। অন্তত চোখের সামনে মেয়েটি নিরাপদে আছে দেখে মারা যাব, এটাই অনেক স্বস্তির।’
দোষটা নির্দিষ্ট কারও নয়। আমাদের সবার।
যেদিন পাহারাদারদের চোখগুলো নিভে যেতে লাগল, তখন আমরা পাত্তা দিইনি।
তাই পাহারাদারদের বদলে জায়গা করে নিল হায়েনার চোখ।
আমার খুব আফসোস হয়, আমাদের বাচ্চাদের অধিকাংশই কখনো জানবে না—পৃথিবী আসলে কত মুক্ত! কত আনন্দময়!

#আসুন মায়া ছড়াই


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category