• বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:০৭ অপরাহ্ন
Headline
লাইসেন্সপ্রাপ্ত মানি চেঞ্জারদের বৈদেশিক মুদ্রা জমায় নতুন সুবিধা রফতানি ও রেমিট্যান্সে ইতিবাচক ধারা, রিজার্ভ ৩৬.২৫ বিলিয়ন ডলার সিটি গ্রুপকে ৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ দিতে আইন শিথিল করল বাংলাদেশ ব্যাংক সিঙ্গাপুরে প্রশিক্ষণে যাচ্ছেন সচিব, অতিরিক্ত সচিবসহ ৩৫ সরকারি কর্মকর্তা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে চীনা মন্ত্রীর সাক্ষাৎ, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদারের আহ্বান ঋণ সহায়তার বাইরে কোরিয়ার সঙ্গে শক্তিশালী অংশীদারিত্ব চায় বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীর সৌরবিদ্যুৎ পরিকল্পনা ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও শিল্পপর্যায়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে : মাহদী আমিন আর্টিলারি রেজিমেন্টের অধিনায়ক সম্মেলন ও পুনর্মিলনীতে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা আরও গভীর করতে চীনের অঙ্গীকার: লিউ মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে কাজ করবে সংসদীয় ককাস

১০ দলে পরিবার, ৩২ দলে গণতন্ত্র নেই: টিআইবির ময়নাতদন্ত

Reporter Name / ৩ Time View
Update : বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কাঠামো, নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবির সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদনটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক নির্মম ও বাস্তবসম্মত ময়নাতদন্ত হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। দীর্ঘ তিন বছর অর্থাৎ ২০২৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পরিচালিত এই বিস্তৃত গবেষণায় বত্রিশটি নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণার ফলাফল কোনো সাধারণ পর্যবেক্ষণ নয়, বরং এটি দেশের রাজনৈতিক দলগুলোতে জেঁকে বসা কাঠামোগত দুর্বলতা, স্বৈরাচারী প্রবণতা এবং পরিবারতান্ত্রিক আধিপত্যের অকাট্য প্রমাণ হিসেবে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

প্রতিবেদনের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোতে বংশপরম্পরায় ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার প্রবণতা। গবেষণায় দেখা গেছে যে অন্তত দশটি পরিবার দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্ব সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করছে। এই তালিকায় দেশের বড় রাজনৈতিক দল যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে জাকের পার্টি, মুসলিম লীগ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাব, খেলাফত মজলিস, জাকপা এবং বাংলাদেশ জাস্টিস পার্টির মতো তুলনামূলক ছোট দলগুলোও। দল ছোট হোক বা বড়, সবক্ষেত্রেই একই ধরনের পরিবারতান্ত্রিক সংস্কৃতির রাজত্ব চলছে, যেখানে দাদার পর ছেলে এবং ছেলের পর নাতি দলের শীর্ষ পদে আসীন হন।

নেতৃত্বের এই দীর্ঘমেয়ায়ী আধিপত্যের পেছনে রয়েছে সাংবিধানিক ও গঠনতান্ত্রিক শূন্যতা। টিআইবির তথ্য অনুযায়ী, অন্তত বারোটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষপ্রধান বিগত দশ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে একই পদে একচ্ছত্রভাবে বহাল রয়েছেন। এর মধ্যে দীর্ঘ মেয়াদের নিরিখে প্রধান দলগুলোর প্রধানদের কার্যকাল চার দশকেরও বেশি সময় ছাড়িয়ে গেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব গঠনতন্ত্রে একজন ব্যক্তি নিজ জীবনে সর্বোচ্চ কতবার বা কত মেয়াদে দলীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট বা বাধ্যবাধকতামূলক সীমা নির্ধারণ করা নেই। এই আইনি দুর্বলতার কারণে দলের ভেতরে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্ক কাজ করে যে নেতা পরিবর্তন হলে দল ভেঙে যাবে, যা প্রকারান্তরে পরিবারতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই চিরস্থায়ী করে তুলেছে।

দলের ভেতরে গণতান্ত্রিক চর্চার করুণ দশার চিত্র ফুটে উঠেছে কাউন্সিল এবং ভোটগ্রহণের প্রক্রিয়ায়। টিআইবির গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে প্রায় ষোলটি রাজনৈতিক দল নিয়মিতভাবে তাদের জাতীয় কাউন্সিল আয়োজন করে না। আর যেসব দল অনিয়মিতভাবে বা নিয়মরক্ষার খাতিরে কাউন্সিল করে থাকে, সেখানেও গোপন ব্যালটে অবাধ ও নিরপেক্ষ ভোট দেওয়ার কোনো সংস্কৃতি নেই। মঞ্চ থেকে নাম ঘোষণা করা হয় এবং নিচ থেকে কেবল হাত তুলে বা নামমাত্র কণ্ঠভোটে তা অনুমোদন করিয়ে নেওয়া হয়। সাধারণ কর্মী বা তৃণমূলের প্রতিনিধিরা ভয়ের বশবর্তী হয়ে বা অনুগত থাকার মানসিকতা থেকে প্রতিবাদ করার সাহস পান না, ফলে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াটি একটি আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হয়েছে।

রাজনৈতিক দলের অর্থায়ন এবং সংসদ ভবনে ব্যবসায়ীদের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য দেশের রাজনৈতিক অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের নিয়মিত কোনো সুনির্দিষ্ট বাজেট কিংবা আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছ নিরীক্ষিত হিসাব থাকে না। দলের যাবতীয় খরচ মেটানো হয় ব্যক্তিগত অনুদান এবং বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক ও অস্বচ্ছ উৎসের মাধ্যমে। এই অর্থের প্রবাহই মূলত পরিবারতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার মূল জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে। গত কয়েক দশকের সংসদ নির্বাচনগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে জাতীয় সংসদে ব্যবসায়ী সংসদ সদস্যের সংখ্যা হু হু করে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাম্প্রতিক ত্রয়দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রায় ষাট শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে।

মনোনয়ন বাণিজ্যের এই দুষ্টচক্রের কারণে মাঠের ত্যাগী ও সক্রিয় কর্মীরা দলীয় টিকিট পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং যাদের আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে কেবল তারাই মনোনয়ন কিনে নিচ্ছেন। নির্বাচন কমিশনের হলফনামা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে অনেক প্রার্থীর সম্পদ বিগত কয়েক বছরে শত শত গুণ বৃদ্ধি পেলেও দলগুলোর দলীয় তহবিলের কোনো সদুত্তর নেই। টাকার এই লাগামহীন প্রভাব যখন রাজনীতির প্রধান যোগ্যতা হয়ে ওঠে, তখন দলের ভেতর ও বাইরে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই অনিবার্য হয়ে পড়ে। ফলে ২০১৩ থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায় সাতশ ছেচল্লিশ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং লক্ষাধিক মানুষ আহত হয়েছে, যার একটি বড় অংশ ঘটে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে।

রাজনীতিতে এই ক্ষমতাকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক মডেলের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী ও ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ হলো নারীরা। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী রাজনৈতিক দলের সব স্তরে অন্তত একাত্তর শতাংশ বা এক তৃতীয়াংশ নারী প্রতিনিধিত্ব থাকার কথা থাকলেও টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে মাত্র দুটি দল এই শর্ত মেনে চলছে এবং অনেক দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে একজন নারীও নেই। সংরক্ষিত নারী আসনের ক্ষেত্রেও বড় দলগুলোর নীতিনির্ধারকরা দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ নারীদের মূল্যায়ন না করে শীর্ষ নেতাদের স্ত্রী, কন্যা বা ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের প্রক্সি প্রতিনিধি হিসেবে বসিয়ে দিচ্ছেন, যা দলের ভেতরে নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়নকে বাধাগ্রস্ত করছে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর এই কাঠামো অত্যন্ত পশ্চাৎপদ হিসেবে প্রতীয়মান হয়। প্রতিবেশী দেশ ভারত বা পাকিস্তানে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিবারগুলোর প্রভাব কিছুটা থাকলেও সেখানে অভ্যন্তরীণ প্রাথমিক নির্বাচন বা প্রাইমারি ভোটিংয়ের ন্যূনতম চর্চা রয়েছে। ইউরোপের গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে দলীয় প্রধানের পদের মেয়াদ সর্বোচ্চ আট থেকে আট বছর পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। অথচ বাংলাদেশে একই ব্যক্তি দশকের পর দশক ধরে দলকে কুক্ষিগত করে রাখছেন, যা কোনো রাজনৈতিক দল নয় বরং একধরনের পারিবারিক জমিদারি ব্যবস্থার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন প্রক্রিয়া নিয়েও প্রতিবেদনে মারাত্মক অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে। টিআইবি জানিয়েছে যে অন্তত সাতটি দলের গঠনতন্ত্র দেশের মূল সংবিধানের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক এবং আঠারোটি দলের প্রাথমিক সদস্য হওয়ার যোগ্যতার মধ্যেই সততার কোনো শর্ত নেই। ২০০৮ সালের পর থেকে নিবন্ধিত হওয়া অনেক দল এক শতাংশ ভোটও পায়নি, তবুও রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাসহ বিভিন্ন মহলের হস্তক্ষেপে তারা বহাল তবিয়তে টিকে রয়েছে। তবে এই অন্ধকার চিত্রের মধ্যেও ব্যতিক্রম হিসেবে কমিউনিস্ট পার্টি অব বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, মেয়াদের কড়াকড়ি এবং নিয়মিত গোপন ব্যালট নির্বাচনের সংস্কৃতি কিছুটা আশার আলো দেখিয়েছে।

এই সামগ্রিক কাঠামোগত সংকট নিরসনে টিআইবির পক্ষ থেকে মোট বারো দফা দূরদর্শী সুপারিশ পেশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক দলের সমস্ত আর্থিক লেনদেন ও তহবিলের হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করা, নেতৃত্বে আসার জন্য গোপন ব্যালট বাধ্যতামূলক করা এবং দলীয় প্রধানের পদের মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে সীমিত করা। নতুন সরকারের সংস্কার কার্যক্রমের ১০০ দিনের মূল্যায়নে সুশাসনের এই রূপরেখা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। পরিশেষে, দলগুলোর এই পরিবারতান্ত্রিক ও অস্বচ্ছ চক্র ভেঙে ফেলতে হলে সাধারণ ভোটার ও কর্মীদের নিজেদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন তোলার সময় এখনই উপস্থিত হয়েছে।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category