আমদানি দায় মেটাতে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নকে ১ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিশোধের পর বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসেছে। বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যে এই চিত্র উঠে এসেছে। এই অর্থ পরিশোধের পর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ব্যালেন্স অব পেমেন্টস অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট পজিশন ম্যানুয়াল সিক্সথ এডিশন হিসাব পদ্ধতি অনুযায়ী দেশের রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৯ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, আকুর বিল পরিশোধের আগে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩১ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার।
এই পতন অবশ্য আকস্মিক নয়, বরং দুই মাস পরপর ঘটে যাওয়া একটি নিয়মিত ঘটনা। এর আগের দিন ৪ নভেম্বর মোট রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার, আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব পদ্ধতিতে ৩১ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার। গত মে মাসেও একইভাবে আকুর বিল পরিশোধের পর রিজার্ভ ৩০ বিলিয়নের নিচে নেমেছিল। তখন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাবে রিজার্ভ ৩০ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ২৯ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছিল। অর্থাৎ ছয় মাসের মধ্যে দ্বিতীয়বার রিজার্ভ ৩০ বিলিয়নের নিচে নামল। প্রতিবারই রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় এসে আবার রিজার্ভকে ওপরে তুলেছে।
উল্লেখ্য, সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্কিত লেনদেন নিষ্পত্তি সহজ করার লক্ষ্যে ১৯৭৪ সালে একটি আঞ্চলিক ব্যবস্থা হিসেবে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হয়। এর সদর দপ্তর ইরানের তেহরানে। জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের উদ্যোগে এটি গড়ে ওঠে। আকু পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে প্রতি দুই মাস অন্তর সদস্য দেশগুলোর মধ্যকার আমদানির বিল পরিশোধ করা হয়। বাংলাদেশ ছাড়াও এই আঞ্চলিক লেনদেন ব্যবস্থায় ভারত, ভুটান, ইরান, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, নেপাল, পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কা, এই ৯টি দেশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সদস্য দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এই বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার মাধ্যমে লেনদেন সম্পন্ন করে।
আকুর মূল সুবিধা হলো নিট ভিত্তিতে নিষ্পত্তি। একটি দেশ অন্য দেশ থেকে যত টাকার পণ্য কিনেছে, তার থেকে নিজের রপ্তানি বাদ দিয়ে শুধু বাকি অর্থটুকু পরিশোধ করতে হয়। ফলে প্রতিবার ডলারে লেনদেন করার চেয়ে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হয়। এই ব্যবস্থায় লেনদেনের পরিমাণ ১৯৭৫ সালে মাত্র ৫ কোটি ১৪ লাখ ডলার থেকে বেড়ে ২০২১ সালে ২ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের বেশি হয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই ব্যবস্থায় কোনো খেলাপির ঘটনা ঘটেনি। বাংলাদেশের জন্য এই বিলের বড় অংশই ভারত থেকে আমদানির দায়। ভারত বাংলাদেশের অন্যতম বড় বাণিজ্য অংশীদার।
সাম্প্রতিক আকু বিলের ধারা দেখলে বোঝা যায় আমদানির চাপ কতটা বাড়ছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারির বিল ছিল ১ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার। এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের বিল ছিল ১ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার, জুলাই ও আগস্টে ১ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলার এবং মে ও জুনে ১ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার। এবারের ১ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলারের বিল সেই ধারারই অংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে আমদানি ব্যয় ১৫ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ১৯ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলারে। চলতি হিসাবের ঘাটতিও ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এই চাপই রিজার্ভের ওপর পড়ছে।
তবে দীর্ঘ মেয়াদে তাকালে রিজার্ভের চিত্র এখনো পুনরুদ্ধারের গল্প। ২০২১ সালের আগস্টে দেশের রিজার্ভ ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৪৮ দশমিক শূন্য ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। এরপর আমদানির চাপে তা কমতে কমতে ২০২৪ সালের আগস্টে নেমে আসে ২৫ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাবে তখন রিজার্ভ ছিল মাত্র ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার। সেই তলানি থেকে গত দুই বছরে মোট রিজার্ভ বেড়েছে ৪৬ দশমিক ৬ শতাংশ, আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাবে বেড়েছে ৫৮ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে মোট রিজার্ভ ছিল ২৪ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে তা ৩৬ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। চলতি বছরের জুনে মোট রিজার্ভ ৩৭ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারে উঠেছিল, যা ছিল ২০২৬ সালের সর্বোচ্চ।
এই পুনরুদ্ধারের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের। ২০২৫ সালে প্রবাসীরা রেকর্ড ৩২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন। শুধু ডিসেম্বর মাসেই এসেছে ৩ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলার, যা নয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ মাসিক প্রবাহ। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে রেমিট্যান্স এসেছে ১৬ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার, আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৮ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। এর পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনে রিজার্ভ বাড়িয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ব্যাংকগুলো থেকে ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি কেনা হয়েছে। আমদানির ঋণপত্র খোলা কম থাকায় ডলারের চাহিদাও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
রিজার্ভের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি এড়াতে তিনটি হিসাব বোঝা জরুরি। মোট রিজার্ভ হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে থাকা সব বৈদেশিক মুদ্রার যোগফল। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব পদ্ধতিতে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের মতো কিছু অর্থ বাদ দিয়ে হিসাব করা হয়, তাই এই সংখ্যা মোট রিজার্ভের চেয়ে কম হয়। আর ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ হলো স্বল্পমেয়াদি দায় ও অন্যান্য বাধ্যবাধকতা বাদ দিয়ে যে অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে খরচ করা যায়। গত আগস্টে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ ছিল প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার। মাসে গড়ে ৫ বিলিয়ন ডলারের আমদানি বিল ধরলে এই অর্থ দিয়ে সাড়ে পাঁচ মাসের বেশি আমদানি ব্যয় মেটানো যায়। সাধারণত তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো রিজার্ভকে নিরাপদ ধরা হয়। সেই হিসাবে বর্তমান রিজার্ভ এখনো নিরাপদ সীমার ওপরে রয়েছে।
সামনের দিনগুলোতে রিজার্ভ আবার বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বহুপাক্ষিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর কিস্তি ছাড় হওয়ার কথা রয়েছে। রেমিট্যান্সের ধারাও শক্তিশালী রয়েছে। তবে ঝুঁকিও কম নয়। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম চড়া থাকলে আমদানি বিল আরও বাড়বে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম গত ২৪ অক্টোবর ব্যারেলপ্রতি ১১৭ দশমিক ৩৮ ডলারে উঠেছিল। জ্বালানি আমদানিতে জুলাই ও আগস্টে ব্যয় হয়েছে ২ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের প্রায় দ্বিগুণ। এই চাপ সামলাতে রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের ধারা ধরে রাখা জরুরি।
সব মিলিয়ে আকুর বিল পরিশোধের পর রিজার্ভ ৩০ বিলিয়নের নিচে নামা কোনো সংকটের সংকেত নয়, বরং দুই মাস পরপর ঘটে যাওয়া একটি চক্রের অংশ। আসল প্রশ্ন হলো, আমদানির বিল যত বাড়ছে, রপ্তানি ও রেমিট্যান্স সেই গতিতে বাড়ছে কি না। রিজার্ভের ইতিহাস বলছে, ২০২৪ সালের তলানি থেকে দেশ অনেকটাই উঠে এসেছে। এখন পরীক্ষা হলো এই পুনরুদ্ধার ধরে রাখা। পরের আকু বিল আসবে দুই মাস পর। ততদিনে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় কতটা আসে, তার ওপরই নির্ভর করবে রিজার্ভ আবার ৩০ বিলিয়নের ওপরে উঠবে কি না।
তথ্যসূত্র: দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড