ঢাকার রাজনীতি আর মির্জা আব্বাস—এই দুটি নাম গত পাঁচ দশক ধরে প্রায় সমার্থক। বর্তমানে মস্তিষ্কের রক্তনালীতে ব্লকের কারণে স্ট্রোক করে তিনি যখন হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণে জীবনযুদ্ধ চালাচ্ছেন, ঠিক তখনই রাজনীতির মাঠ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যন্ত তাকে নিয়ে চলছে এক বিশাল স্নায়ুযুদ্ধ। প্রশ্ন উঠেছে, তার এই অসুস্থতা কি কেবলই শারীরিক, নাকি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক চাপ ও ধারাবাহিক অপপ্রচারের এক করুণ পরিণতি?
মির্জা আব্বাস কেবল একজন রাজনীতিবিদ নন, তিনি ঢাকার আদি বাসিন্দাদের সামাজিক প্রভাব আর বিএনপির রাজনৈতিক শক্তির এক বিরল সংমিশ্রণ। আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান—সবখানেই তিনি ছিলেন সামনের সারির নেতা। সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার সাথে মিলে তিনি ঢাকাকে বিএনপির ‘অজেয় দুর্গে’ পরিণত করেছিলেন। কার্ফিউ আর ১৪৪ ধারার তোয়াক্কা না করে অলিগলি থেকে মিছিল বের করার যে রণকৌশল তিনি তৈরি করেছিলেন, তাই তাকে দলের এক বিশ্বস্ত ‘ভ্যানগার্ড’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, মির্জা আব্বাসের তিনটি বিশেষ শক্তি তাকে প্রতিপক্ষের জন্য সবসময় ‘বিপজ্জনক’ করে রেখেছে: ১. সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ: ঢাকার মাঠপর্যায়ের কর্মীদের ওপর তার গভীর প্রভাব। ২. সামাজিক ভিত্তি: শাজাহানপুরের আদি জমিদার পরিবার বা ‘ল্যান্ডেড জেন্ট্রি’ হওয়ার কারণে স্থানীয় সমাজে তার শিকড় অনেক গভীরে। ৩. অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা: ঢাকা ব্যাংকের মতো স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠানের অংশীদারিত্ব তাকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাঝেও আর্থিকভাবে শক্তিশালী রেখেছে।
এই তিনটি শক্তির সমন্বয় খুব কম নেতার মাঝেই দেখা যায়। ফলে তাকে দুর্বল করতে পারলে ঢাকার রাজনীতিতে বিএনপির ঐতিহ্যগত শক্তিতে ধস নামানো সম্ভব—এমন ধারণা থেকেই একটি মহল তাকে লক্ষ্য করে ক্রমাগত ‘শব্দ বোমা’ ছুড়ে যাচ্ছে।
৫ আগস্টের পর যখন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা শুরু হলো, তখন থেকেই একটি মহল তাকে কোণঠাসা করার মিশনে নামে। দলীয় মনোনয়ন থেকে শুরু করে বিভিন্ন ব্যক্তিগত হামলায় তাকে জড়িয়ে অপপ্রচার চালানো হয়েছে। এমনকি ‘এক পরিবারে এক মনোনয়ন’ নীতির কারণে তার স্ত্রী আফরোজা আব্বাসকে মনোনয়ন না দেওয়া হলেও, তিনি দলের সিদ্ধান্তের প্রতি অনুগত থেকেছেন। তাসত্ত্বেও ওসমান হাদীর ওপর হামলার মতো ঘটনায় তাকে জড়িয়ে চরিত্র হনন করার চেষ্টা থেমে থাকেনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মির্জা আব্বাসকে নিয়ে এই বিতর্কের পেছনে কেবল ব্যক্তিগত বিদ্বেষ নেই; বরং এটি ঢাকার ক্ষমতার ভারসাম্যের লড়াই। তাকে সাইডলাইনে রাখতে পারলে একদিকে যেমন বিএনপির পুরোনো নেতৃত্ব দুর্বল হবে, অন্যদিকে তেমনি ইশরাক হোসেনের মতো নতুন প্রজন্মের নেতাদের সামনেও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ বাড়বে।
রাজনীতির দাবাবোর্ডে চাল পাল্টাবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মির্জা আব্বাসের মতো একজন পরীক্ষিত নেতাকে যখন অসুস্থ অবস্থায়ও রাজনৈতিক আক্রমণের শিকার হতে হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে আমাদের রাজনৈতিক শিষ্টাচার নিয়ে। ঢাকার রাজপথে আজ যে শূন্যস্থান তৈরির চেষ্টা চলছে, তা কি সুস্থ ধারার রাজনীতির পথ প্রশস্ত করবে, নাকি নতুন কোনো অস্থিরতার জন্ম দেবে? সময় এবং ইতিহাসই হয়তো এই প্রশ্নের উত্তর দেবে। তবে আপাতত মির্জা আব্বাস কেবল একজন অসুস্থ রাজনীতিবিদ নন, তিনি ঢাকার রাজনীতির এক জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণের নাম।