• সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০৯ অপরাহ্ন

যুদ্ধবিধ্বস্ত মধ্যপ্রাচ্যে ম্লান ঈদের আনন্দ, কাঠগড়ায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র

Reporter Name / ৫৪ Time View
Update : শনিবার, ২১ মার্চ, ২০২৬

ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই শান্তি ও ভ্রাতৃত্বের উৎসব। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর মুসলিম বিশ্বে যখন পবিত্র ঈদুল ফিতরের আনন্দঘন মুহূর্ত নেমে এসেছে, তখন মধ্যপ্রাচ্যের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। গাজা, লেবানন, সিরিয়া থেকে শুরু করে ইয়েমেন ও ইরানের আকাশ আজ উৎসবের আতশবাজির বদলে বারুদ আর ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। ফিলিস্তিনিদের জন্য এবারের ঈদ কোনো উৎসবের বার্তা নিয়ে আসেনি, বরং নিয়ে এসেছে স্বজন হারানোর অবিরাম আহাজারি আর বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রাম। নজিরবিহীন এই মানবিক বিপর্যয় এবং একটি পুরো জাতির উৎসব ম্লান হওয়ার পেছনে বিশ্বজুড়ে আজ তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে ইসরায়েল এবং তাদের প্রধান মিত্র ও পৃষ্ঠপোষক যুক্তরাষ্ট্র।


গাজার আকাশে বারুদের গন্ধ, ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়েছে উৎসব

ঈদের সকালে যেখানে নতুন পোশাক পরে, গায়ে সুগন্ধি মেখে হাসিমুখে ঈদগাহে যাওয়ার কথা, সেখানে গাজার ফিলিস্তিনিরা আজ বোমাবিধ্বস্ত ভবনের ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে ঈদের নামাজ আদায় করছেন।

  • উপাসনালয় ধ্বংস: গত কয়েক মাস ধরে চলা ইসরায়েলি বাহিনীর নির্বিচার হামলায় গাজার হাজার হাজার মসজিদ মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। পবিত্র আল-আকসা মসজিদেও ফিলিস্তিনিদের প্রবেশে কঠোর বিধিনিষেধ ও সামরিক অবরোধ আরোপ করেছে দখলদার বাহিনী।

  • হারিয়ে যাওয়া শৈশব: শিশুদের জন্য ঈদ মানেই সীমাহীন আনন্দ। কিন্তু গাজার শিশুদের কাছে এবারের ঈদ এক জীবন্ত দুঃস্বপ্নের নাম। হাজারো শিশু তাদের পিতা-মাতা হারিয়ে এতিম হয়েছে। নতুন জামা বা সেমাই-পায়েস তো দূরের কথা, দুবেলা পেট ভরে খাওয়ার মতো এক টুকরো রুটি বা একটু বিশুদ্ধ পানিও তাদের জুটছে না।

  • চিকিৎসাহীন আর্তনাদ: বোমার আঘাতে অঙ্গ হারানো অসংখ্য শিশু ও নারী হাসপাতালের মেঝেতে বা পলিথিনের তাঁবুর নিচে ব্যথায় কাতরাচ্ছে। তাদের চোখে ঈদের আনন্দের বদলে শুধুই আতঙ্ক আর আগামীকালের অনিশ্চয়তা।

কাঠগড়ায় ইসরায়েল: অব্যাহত আগ্রাসন ও যুদ্ধাপরাধ

মধ্যপ্রাচ্যের এই অশান্ত পরিস্থিতি ও রক্তপাতের জন্য সরাসরি ইসরায়েলের উগ্র সম্প্রসারণবাদী ও আগ্রাসী নীতিকেই দায়ী করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো।

  • বেসামরিক স্থাপনায় হামলা: গাজার হাসপাতাল, স্কুল, শরণার্থী শিবির থেকে শুরু করে জাতিসংঘের ত্রাণকেন্দ্র—কোথাও ইসরায়েলি জান্তার হামলা থেকে রেহাই পায়নি সাধারণ মানুষ। এটি সরাসরি জেনেভা কনভেনশনের লঙ্ঘন।

  • কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি: যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় আন্তর্জাতিক ত্রাণ সহায়তা প্রবেশে ইসরায়েল প্রতিনিয়ত বাধা সৃষ্টি করছে। ত্রাণের ট্রাকের অপেক্ষায় থাকা ক্ষুধার্ত মানুষের ওপর গুলি চালিয়ে তারা গাজায় এক ভয়াবহ কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ তৈরি করেছে।

  • আন্তর্জাতিক আইনের অবজ্ঞা: জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (ICJ) নির্দেশিকাকে চরম অবজ্ঞা করে নিজেদের সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে তেল আবিব।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা ও দ্বৈত নীতি

ইসরায়েলের এই বেপরোয়া আচরণের পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তির উৎস ও রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার কথা মুখে বললেও, যুক্তরাষ্ট্রের বাস্তব পদক্ষেপগুলো মূলত এই যুদ্ধ ও হত্যাযজ্ঞকেই দীর্ঘায়িত করেছে।

  • অব্যাহত সমরাস্ত্র সরবরাহ: গাজায় যখন লাশের পাহাড় জমছে, তখনো যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা, যুদ্ধবিমান এবং প্রাণঘাতী ২,০০০ পাউন্ডের বোমা সরবরাহ করে যাচ্ছে।

  • কূটনৈতিক অন্ধত্ব: জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে বারবার নিজেদের ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যেকোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা স্থায়ী যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব আটকে দিয়েছে ওয়াশিংটন।

  • প্রহসনের মানবিকতা: একদিকে আকাশ থেকে যৎসামান্য ত্রাণের প্যাকেট ফেলছে যুক্তরাষ্ট্র, অন্যদিকে ইসরায়েলকে এমন সব অত্যাধুনিক অস্ত্র দিচ্ছে যা দিয়ে সেই ত্রাণ নিতে আসা নিরীহ মানুষদেরই হত্যা করা হচ্ছে। এই চরম দ্বৈত নীতি বিশ্ববাসীর কাছে যুক্তরাষ্ট্রের ‘মানবাধিকার রক্ষার’ দাবিকে চরম প্রহসনে পরিণত করেছে।

আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তার: লেবানন থেকে ইরান

গাজার এই যুদ্ধ এখন আর শুধু ফিলিস্তিনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। ইসরায়েলি আগ্রাসন ও মার্কিন উসকানিতে পুরো মধ্যপ্রাচ্য আজ এক সর্বাত্মক আঞ্চলিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে।

  • লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি বিমান হামলায় হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত, যাদের জীবনে ঈদের কোনো অস্তিত্ব নেই।

  • লোহিত সাগরে মার্কিন জোটের সামরিক তৎপরতা এবং ইয়েমেনে বিমান হামলা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করেছে।

  • সিরিয়ায় ইরানি কনস্যুলেটে হামলা এবং পরবর্তীতে ইরান-ইসরায়েল ও মার্কিন বাহিনীর সরাসরি সামরিক সংঘাত পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি ও নিরাপত্তাকে খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছে। এই যুদ্ধাবস্থার কারণে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ মানুষের জীবনে চরম অর্থনৈতিক সংকট ও নিরাপত্তাহীনতা নেমে এসেছে, যা ঈদের সার্বজনীন আনন্দকে পুরোপুরি গ্রাস করে নিয়েছে।

বিশ্ববিবেকের নীরবতা এবং আমাদের দায়

আজকের এই দিনে পশ্চিমা বিশ্বের মানবাধিকারের প্রবক্তারা যখন নিজেদের দেশে উৎসব ও শান্তিতে মগ্ন, তখন তাদেরই পাঠানো অস্ত্রে মধ্যপ্রাচ্যে ঝরছে হাজারো নিরীহ মানুষের রক্ত। বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীরা ফিলিস্তিনের পক্ষে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করলেও, পরাশক্তিগুলোর সরকারপ্রধানরা নির্বিকার। যুদ্ধ শুধু মানুষের বাড়িঘর ধ্বংস করে না, এটি মানুষের আত্মাকেও ক্ষতবিক্ষত করে। এবারের ঈদে ফিলিস্তিনের মায়েদের বুকে কোনো আনন্দ নেই, আছে কেবল বুকফাটা আর্তনাদ। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া প্রিয়জনের পচা-গলা লাশ উদ্ধারের অপেক্ষায় কাটছে অনেকের ঈদের দিন।


মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি সমগ্র মানবসভ্যতা ও বিশ্ববিবেকের কাছে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ, ক্ষমতার দম্ভ ও আধিপত্য বিস্তারের নেশায় যেভাবে একটি পুরো জাতির উৎসব, ভবিষ্যৎ এবং বেঁচে থাকার অধিকার কেড়ে নিচ্ছে, তা ইতিহাসের পাতায় এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে লিপিবদ্ধ থাকবে। যতদিন পর্যন্ত ফিলিস্তিনসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত না হচ্ছে, ফিলিস্তিনিরা তাদের স্বাধীন ও সার্বভৌম ভূখণ্ড ফিরে না পাচ্ছে, ততদিন এই ভূখণ্ডে ঈদের আসল চাঁদ উঠবে না। বিশ্ব সম্প্রদায়ের শুধু মৌখিক সহানুভূতি বা লোকদেখানো বিবৃতি নয়, বরং এই নির্লজ্জ হত্যাযজ্ঞ থামাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ওপর কার্যকর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। রক্তপাত আর বারুদের গন্ধ মুছে গিয়ে একদিন মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবার শান্তির পায়রা উড়বে—এবারের ঈদে মুক্তিকামী মানুষের এটাই একমাত্র প্রার্থনা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category