আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে মোটা অঙ্কের টোল আদায় শুরু করেছে ইরান। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম লয়েড’স লিস্ট এবং তুরস্কের ‘তুর্কিয়ে টুডে’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিজেদের জলসীমার নিরাপত্তা ও পর্যবেক্ষণের যুক্তিতে ইরান এই পদক্ষেপ নিয়েছে এবং ইতোমধ্যে একটি তেলের ট্যাঙ্কারকে এই পথ ব্যবহারের জন্য প্রায় ২০ লাখ ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে।
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে পার হতে হলে এখন থেকে জাহাজগুলোকে ইরানের বিশেষ তল্লাশির মুখে পড়তে হবে। ইরানের লারাক দ্বীপের কাছে একটি বিশেষ ‘নিয়ন্ত্রিত করিডোর’ নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে অন্তত নয়টি জাহাজ পার হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। মূলত ইরানি কর্তৃপক্ষের সরাসরি পর্যবেক্ষণে জাহাজগুলোকে স্ক্রিনিং করাই এর লক্ষ্য।
তেহরান বর্তমানে এমন একটি আইন তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার মাধ্যমে এই জলপথ ব্যবহারকারী প্রতিটি জাহাজের ওপর আনুষ্ঠানিক ট্রানজিট ফি এবং ট্যাক্স আরোপ করা হবে। ইরান জানিয়েছে, আইআরজিসি (ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর) পরিচালিত নিবন্ধন ও যাচাইকরণ ব্যবস্থার অধীনে জাহাজ চলাচলের এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। এর আগে ইরানের সংসদ সদস্য সোমায়ে রাফিইও এমন একটি আইন নিয়ে কাজ করার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই পরিবাহিত হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরান তাদের অনুমোদন ছাড়া জাহাজ চলাচল নিষিদ্ধ করায় এই রুটটি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত, পাকিস্তান, ইরাক, মালয়েশিয়া এবং চীন বর্তমানে তেহরানের সঙ্গে জাহাজ চলাচলের ছাড়পত্র নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ২০টিরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে বলে খবর প্রকাশ হয়েছে, যার মধ্যে ১৭টি ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করা গেছে। এমন নিরাপত্তাহীনতার কারণে ‘ওয়ার রিস্ক ইন্স্যুরেন্স’ বা যুদ্ধকালীন ঝুঁকি বিমার প্রিমিয়াম বহুগুণ বেড়ে গেছে, ফলে অনেক শিপিং কোম্পানি হরমুজ ছেড়ে অন্য রুট ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছে।
বর্তমানে প্রায় ২ হাজার জাহাজ এবং ২০ হাজার নাবিক এই অঞ্চলে আটকা পড়ে আছেন, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় ধরনের স্থবিরতা সৃষ্টি করেছে। আটকে পড়া জাহাজ ও ক্রুদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা একটি জরুরি অধিবেশন ডেকে একটি সুরক্ষিত কাঠামোর দাবি জানিয়েছে।
এই অচলাবস্থার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্ববাজারে। জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে সর্বোচ্চ ১১৯ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। ইরান কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, অনুমতি ছাড়া জলপথে প্রবেশকারী যেকোনো জাহাজ তাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। এমন কঠোর অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইন ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।