• বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৫৬ অপরাহ্ন
Headline
মতুয়া চমক: ভোটের অংকে সংরক্ষিত আসনে এমপি বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি: ৫৬ হাজার কোটির দায় কেন জনগণের কাঁধে? লোগো নকল, দাম আকাশছোঁয়া: সংসদের কেনাকাটায় এ কোন জাদুকরি হিসাব? তীব্র গরমে হঠাৎ ঘাম বন্ধ? হিট স্ট্রোক নয় তো! অবশেষে বোনদের পথ ধরে হজে যাচ্ছেন চম্পা অনুমতি ছাড়া ভিডিও করলে দ্রুত বিচার আইনে ব্যবস্থা: তথ্যমন্ত্রী ইরানের তেল বাণিজ্য সম্পূর্ণ অচল করার কড়ার হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি কি কৌশল না ইসলামাবাদের মধ্যস্থতা ‘অবৈধ যুদ্ধ’ আড়াল করতেই হুমকি: ইরানি-মার্কিন কংগ্রেসওম্যান ইয়াসামিন আনসারি বিশ্বমঞ্চে ‘শান্তিদূত’ পাকিস্তান: আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার আড়ালে ধুঁকছে ঘরোয়া রাজনীতি

ইরান ও ইসরায়েলের উত্থান: মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে দিশেহারা ও নতুন পথের সন্ধানে সৌদি আরব

Reporter Name / ৪ Time View
Update : বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬

গত ছয় সপ্তাহ ধরে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র জোটের মধ্যে যে ভয়াবহ ও প্রকাশ্য সংঘাত চলছে, তার মাঝে একটি বিষয় আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করেছে—আর তা হলো সৌদি আরবের অভাবনীয় সংযম ও নীরবতা। সংঘাত শুরুর প্রায় পরপরই যুদ্ধের আঁচ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ ও কৌশলগত অবকাঠামোতে ইরানের একের পর এক পাল্টা হামলা, বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম লাইফলাইন হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া এবং এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পাল্টা অবরোধ—সব মিলিয়ে কয়েক দশক ধরে চলে আসা মধ্যপ্রাচ্যের চেনা নিরাপত্তাকাঠামো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। অথচ, এই পুরোনো নিরাপত্তাকাঠামোর ওপর ভর করেই একসময় উপসাগরীয় দেশগুলো, বিশেষ করে সৌদি আরব তাদের অর্থনীতির এক বিস্ময়কর উত্থান ঘটাতে সক্ষম হয়েছিল।

যুদ্ধের এই চরম উত্তেজনার মধ্যে সৌদি আরব মার্কিন বাহিনীকে তাদের মাটিতে থাকা সামরিক ঘাঁটিগুলো ব্যবহারের অনুমতি দিলেও, তারা নিজেরা সরাসরি কোনো ইরানি হামলার জবাব দেয়নি। রিয়াদ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সংক্ষিপ্ত কূটনৈতিক বার্তা দিয়েছে মাত্র। তারা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো সরাসরি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য কোনো উসকানিমূলক আহ্বান জানায়নি, কিংবা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক যুদ্ধাভিযানে সরাসরি যোগ দেওয়ার কোনো প্রতিশ্রুতিও দেয়নি। আবার অন্যদিকে, ওমান বা কাতারের মতো ইরানের সঙ্গে প্রকাশ্যে ও সক্রিয়ভাবে কূটনৈতিক যোগাযোগও বাড়ায়নি। তবে পর্দার আড়ালে নীরবে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় উত্তেজনা কমানোর যে প্রচেষ্টা চলছে, তাকে পূর্ণ সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে রিয়াদ।

সৌদি আরবের এই আপাত ‘দিশেহারা’ বা ‘নিষ্ক্রিয়’ অবস্থান মূলত তাদের দীর্ঘদিনের ভারসাম্য রক্ষার এক জটিল কৌশলেরই সম্প্রসারিত রূপ। ফরেন অ্যাফেয়ার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবের এই অবস্থান, তাদের ভীতি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার একটি বিশদ চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো।

ভারসাম্য রক্ষার নিরন্তর চেষ্টা ও পুরোনো ভীতি

সৌদি আরব ঐতিহাসিকভাবেই একটি শক্তিশালী ও আধিপত্যবাদী ইরানকে ভয় পায়। রিয়াদ সব সময়ই চেয়েছে এমন একটি নিয়ন্ত্রিত ও দুর্বল ইরান, যে কিনা কখনোই সৌদি আরবের জাতীয় নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক রূপকল্পের (যেমন- ভিশন ২০৩০) জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে উঠতে পারবে না। ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের পর থেকেই সৌদি আরব গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করেছে যে, আরব বিশ্বে—বিশেষ করে সিরিয়া, লেবানন এবং ইরাকে—ইরানের প্রভাব অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে বাড়ছে।

তবে রিয়াদের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায় তাদের একেবারে ঘরের কাছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের প্রতি ইরানের প্রকাশ্য সমর্থন। এর জেরে ২০১৫ সালে সৌদি আরব ইয়েমেনে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করে, যা ইরানের সঙ্গে তাদের উত্তেজনাকে চরমে নিয়ে যায়। ২০১৬ সালে তেহরানে সৌদি দূতাবাসে বিক্ষুব্ধ জনতার হামলার পর দুই দেশের মধ্যকার আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন হয়ে যায়।

এরপর ২০১৯ সালে ঘটে এক নাটকীয় ঘটনা। ইরানের ইন্ধনে হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর (Aramco) গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনায় ভয়াবহ ড্রোন ও মিসাইল হামলা চালায়। এই হামলার ফলে সাময়িকভাবে সৌদি আরবের অর্ধেক তেল উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। এই সরাসরি হামলা সৌদি নেতৃত্বকে হতবাক করেছিল ঠিকই, কিন্তু তাদের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি দিয়েছিল তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া। বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মিত্রদের রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও, তৎকালীন ওয়াশিংটন প্রশাসন এই হামলার কোনো দৃঢ় বা সামরিক জবাব দেয়নি।

এই তিক্ত অভিজ্ঞতা রিয়াদকে এই রূঢ় বাস্তবতা বিশ্বাস করতে বাধ্য করে যে, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘নিরাপত্তা গ্যারান্টি’ বা প্রতিশ্রুতির ওপর আর অন্ধভাবে নির্ভর করা যাবে না। এই অবিশ্বাসের জায়গা থেকেই তারা নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে বিপুল বিনিয়োগ শুরু করে, দরকারে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের প্রচ্ছন্ন হুমকি দেয় এবং সবচেয়ে চমকপ্রদ পদক্ষেপ হিসেবে বেইজিংয়ের মধ্যস্থতায় ২০২৩ সালে তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেয়।

গাজা যুদ্ধ ও ইসরায়েলের নতুন রূপ: সমীকরণে নতুন জট

চীনের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হলেও, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেও রিয়াদ সমান আশঙ্কার চোখে দেখতে শুরু করেছে। সৌদি আরব কোনোভাবেই চায় না যে, এই অঞ্চলে ইরান বা ইসরায়েল—কেউই একক আধিপত্যবাদী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হোক।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাসের ইসরায়েলে আকস্মিক হামলা এবং এর জবাবে গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার ও ব্যাপক সামরিক অভিযান সৌদি আরবের সামনে এক সম্পূর্ণ নতুন ও জটিল বাস্তবতা হাজির করে। এই যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্র প্রবলভাবে আশা করেছিল যে, ইসরায়েল ও সৌদি আরবের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের চুক্তি হবে, যা হবে মার্কিন-সৌদি বৃহত্তর প্রতিরক্ষা চুক্তির পূর্বশর্ত। কিন্তু গাজায় ইসরায়েলের নারকীয় সামরিক অভিযান সেই স্বাভাবিকীকরণের পথকে অন্তত স্বল্প ও মধ্যম মেয়াদের জন্য রাজনৈতিকভাবে অসম্ভব করে তুলেছে।

একই সঙ্গে, এই গাজা যুদ্ধ ইসরায়েলকে এমন এক বেপরোয়া সামরিক শক্তিতে পরিণত করেছে, যারা কিনা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিজেদের খেয়ালখুশিমতো গড়ে তুলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সৌদি আরব মনে করে, ইসরায়েল এই চলমান যুদ্ধকে ব্যবহার করে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোকে পুরোপুরি নিজেদের ওপর নির্ভরশীল করে তুলতে চাইছে। ইসরায়েলের লক্ষ্য হলো ইরান ও সৌদি আরবকে একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে আটকে রাখা, যাতে করে উপসাগরীয় দেশগুলো কেবল ‘তেল উৎপাদক রাষ্ট্র’ হিসেবেই টিকে থাকে এবং তাদের নিজস্ব কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব চিরতরে হারিয়ে যায়।

ভরসাকেন্দ্রের পরিবর্তন: বিকল্প মিত্র ও নতুন জোটের উদ্ভব

সৌদি আরব একদিকে যেমন ইরানকে ভয় পায়, ঠিক তেমনি অন্যদিকে এমন কোনো আঞ্চলিক ব্যবস্থায় নিজেকে বন্দী করতেও রাজি নয়, যার পুরো নিয়ন্ত্রণ থাকবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। এই দ্বিমুখী সংকট থেকে বাঁচতে এবং নিজেদের কৌশলগত স্বাধীনতা বাড়াতে রিয়াদ গত বছর পাকিস্তানের সঙ্গে একটি যুগান্তকারী পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে।

এই চুক্তিটিই এখন একটি বৃহত্তর ও শক্তিশালী আঞ্চলিক জোটের ভিত্তি হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। জানা যাচ্ছে, এই জোটে খুব শিগগিরই মিসর ও তুরস্ক যুক্ত হতে যাচ্ছে। এই চার দেশীয় জোটের (সৌদি আরব, পাকিস্তান, মিসর, তুরস্ক) মূল লক্ষ্য হলো—ইরান ও ইসরায়েল উভয়ের দিক থেকেই সৌদি ও সুন্নি স্বার্থের প্রতি ধেয়ে আসা যেকোনো সম্ভাব্য হুমকি ঠেকানো এবং নিয়ন্ত্রণ করা।

এই দেশগুলোকে বেছে নেওয়ার পেছনে রিয়াদের গভীর কৌশলগত হিসাব রয়েছে। মিসর, পাকিস্তান ও তুরস্ক—এই তিন দেশেরই সুবিশাল ও সুদক্ষ সামরিক বাহিনী রয়েছে। তাদের কাছে রয়েছে প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত অস্ত্রভান্ডার। এর মধ্যে পাকিস্তানের কাছে রয়েছে পারমাণবিক সক্ষমতা, আর তুরস্ক হলো পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর (NATO) গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। এই সমন্বয়ই বর্তমান সংঘাতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতার পথ তৈরি করে দিয়েছে। এটা স্পষ্ট যে, রিয়াদ এখন ওয়াশিংটনের বাইরে নতুন নিরাপত্তা অংশীদার খুঁজছে এবং তারা বিশ্বাস করে, এই চারটি দেশ ঐক্যবদ্ধভাবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর যে ভূ-রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারবে, তা একা সৌদি আরবের পক্ষে কোনোদিনই সম্ভব নয়।

জিসিসি-র অভ্যন্তরীণ ফাটল ও রিয়াদের ‘মাঝামাঝি’ অবস্থান

এই যুদ্ধে গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের (জিসিসি) দেশগুলোও কোনো একক বা ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিতে পারেনি, যা রিয়াদের জন্য আরেকটি মাথাব্যথার কারণ। এই মেরুকরণের মধ্যে সৌদি আরব নিজেকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মাঝামাঝি অবস্থানে রেখেছে।

একদিকে, তারা সংঘাত থেকে নিজেদের পুরোপুরি দূরে রাখা ওমান ও কাতারের মতো দেশগুলোর কাতারে থেকেছে এবং যুদ্ধ শেষে ইরানের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে, তারা বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো প্রতিবেশী মিত্রদের সঙ্গে কৌশলগত দূরত্ব বজায় রেখেছে, যারা কিনা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ক্রমাগত উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে ইরানকে সামরিকভাবে দুর্বল বা পুরোপুরি ভেঙে ফেলার জন্য। বিশেষ করে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সৌদির নীতিগত পার্থক্যটি এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট। কারণ, যেদিন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার কথা ভাবছিল, ঠিক সেই দিনই আমিরাত স্বপ্রণোদিত হয়ে ইরানের দুটি তেল স্থাপনায় হামলা চালিয়ে বসে।

হরমুজ প্রণালির কৌশল এবং ইরানের নতুন সমীকরণ

যদি সৌদি আরব নিরপেক্ষ থেকেও যায় এবং এই যুদ্ধ খুব দ্রুত শেষও হয়, তবু রিয়াদের সামনে এক জটিল ভবিষ্যতের হাতছানি রয়েছে। যুদ্ধে আহত কিন্তু আত্মবিশ্বাসী এক ইরান তার উপসাগরীয় প্রতিবেশী এবং পারস্য উপসাগরের সামুদ্রিক নিরাপত্তার জন্য সব সময়ই একটি বড় হুমকি হয়ে থাকতে পারে।

তেহরানের বর্তমান হিসাবনিকাশ খুবই পরিষ্কার। তারা উপলব্ধি করেছে যে—হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ভবিষ্যৎ যেকোনো পশ্চিমা আগ্রাসন ঠেকাতে তাদের জন্য একটি শক্তিশালী কৌশলগত হাতিয়ার বা ‘তুরুপের তাস’ হতে পারে। তেহরানের নীতিনির্ধারণী মহলে এখন প্রকাশ্যে বলা হচ্ছে, ইরান যদি আরও আগে থেকেই এই ‘হরমুজ কার্ড’ ব্যবহার করত, তাহলে হয়তো দেশটিকে কখনোই এত বছর ধরে এত কঠিন পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা বা যুদ্ধের মুখে পড়তে হতো না।

শুধু তাই নয়, ইরান এখন হরমুজ প্রণালিকে তাদের সম্ভাব্য রাজস্বের একটি বড় উৎস হিসেবেও দেখছে; ঠিক যেমনটা সুয়েজ খাল দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য মিসর বিপুল অঙ্কের টোল আদায় করে থাকে। ইরান ইতিমধ্যেই উপসাগরীয় দেশগুলোকে কড়া ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছে যে, ভবিষ্যতে আবার যুদ্ধ শুরু হলে যারা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহারের অনুমতি দেবে, তাদের ওপর ভয়াবহ পাল্টা আক্রমণ চালানো হবে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যখন যুদ্ধ পুনরায় শুরু হয়, তখন ইরান শুধু সেই হুমকিই বাস্তবায়ন করেনি, বরং জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালিয়ে এবং হরমুজ প্রণালি আংশিক বন্ধ করে দিয়ে প্রমাণ করেছে যে তারা যা বলে, তা করতেও পারে।

ইরানের দেওয়া এই কঠোর বার্তার মূল উদ্দেশ্য হলো—উপসাগরীয় দেশগুলোকে এটি বোঝানো যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যতই শক্তিশালী জোট গড়ে তোলা হোক না কেন, তা তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না। বরং, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি টিকিয়ে রাখতে হলে তাদের অবশ্যই ইরানের সঙ্গে আপস করে চলতে হবে।

ভূগোলের অমোঘ বিধান ও ভবিষ্যতের রূপরেখা

মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের একচ্ছত্র আধিপত্য মেনে নেওয়া অথবা ইরানের চলমান ও নিরবচ্ছিন্ন হুমকি মেনে নেওয়ার মতো দুটি চরম অপছন্দনীয় বিকল্পের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রিয়াদ এখন নতুন জোট গঠনের মাধ্যমেই নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইছে।

তবে দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে হলে সৌদি আরবকে পারস্য উপসাগরীয় নিরাপত্তার জন্য সম্পূর্ণ নিজস্ব একটি কাঠামো কল্পনা করতে হবে। যেখানে জিসিসি-র অন্যান্য দেশ এবং পাকিস্তান-মিসর-তুরস্ককে একত্র করে উপসাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে ইরানের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক অনাক্রমণ চুক্তির (Non-aggression pact) পক্ষে সমর্থন জোগাড় করতে হবে।

এই চুক্তির রূপরেখা হতে পারে এমন: ইরান চাইবে, সৌদি আরব যেন শক্তভাবে নিশ্চিত করে যে তার ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো কখনোই ইরানের ওপর হামলার জন্য ব্যবহার করা হবে না। অন্যদিকে, সৌদি আরব চাইবে এই শতভাগ নিশ্চয়তা—যেন তাদের ভূখণ্ড বা তেল স্থাপনা আর কখনোই ইরান বা তার প্রক্সি মিত্রদের (যেমন হুতি বা হিজবুল্লাহ) প্রতিশোধমূলক হামলার লক্ষ্যবস্তু না হয়।

রিয়াদ যদিও তেহরানের বর্তমান কট্টরপন্থী নতুন নেতৃত্বকে গভীর অবিশ্বাসের চোখে দেখে এবং তাদের একটি কার্যকর আঞ্চলিক নিরাপত্তাকাঠামো গঠনে অত্যন্ত অনিশ্চিত অংশীদার বলে মনে করে; কিন্তু দিন শেষে রিয়াদকে একটি চরম সত্য মেনে নিতেই হবে। আর তা হলো—ইরান ও সৌদি আরব চিরকাল প্রতিবেশীই থাকবে। ভূগোল তাদের এই অবস্থান পরিবর্তনের কোনো বিকল্প সুযোগ দেয় না। ইতিবাচক সহাবস্থান ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার বিকল্প হলো একটানা ধ্বংসাত্মক সংঘাতের এক অন্তহীন চক্র, যা শেষ পর্যন্ত ইরান এবং উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলো—সবার জন্যই চরম অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ধ্বংস ডেকে আনবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category