• বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৪৩ অপরাহ্ন
Headline
আদর্শের লড়াইয়ে বিজেপিকে কেবল কংগ্রেসই হারাতে পারে: রাহুল গান্ধি বিধানসভা নির্বাচন: পশ্চিমবঙ্গবাসীর প্রতি প্রধানমন্ত্রী মোদির বিশেষ বার্তা দুই দশক পর গাজার দেইর আল-বালাহ শহরে পৌর নির্বাচন হরমুজ প্রণালীতে টোল আদায়: ইরানের কোষাগারে জমা হলো প্রথম আয় গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও উপসর্গে ৫ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১২৯৫ শান্ত-লিটনের ব্যাটে ঘুরে দাঁড়িয়ে নিউজিল্যান্ডকে ২৬৬ রানের টার্গেট দিলো বাংলাদেশ শিক্ষার্থীদের বই পড়ার অভ্যাস বাড়াতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ কিলোমিটারে বাস ভাড়া বাড়ল ১১ পয়সা এক রিফাইনারিতেই খুঁড়িয়ে চলছে পাঁচ দশক: জ্বালানি নিরাপত্তায় সেনাপ্রধানের উদ্বেগ যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানে যাচ্ছে বাংলাদেশের জরুরি ওষুধ

জাতীয় সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হলে যেসব সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়

Reporter Name / ৪ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জাতীয় সংসদ সদস্যরা (এমপি) হলেন জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। তাঁরা রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন, গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণ, জাতীয় বাজেট পাস এবং নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকার মানুষের অভাব-অভিযোগ ও উন্নয়নের বিষয়গুলো জাতীয় সংসদে তুলে ধরার মতো অত্যন্ত গুরুদায়িত্ব পালন করে থাকেন। রাষ্ট্রের এই গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল দায়িত্ব পালন করার জন্য একজন সংসদ সদস্যকে সার্বক্ষণিক ব্যস্ত থাকতে হয়। তাঁদের কাজের পরিধি যেমন বিশাল, তেমনি দায়িত্বও অনেক। তাই তাঁদের জীবনযাপন, যাতায়াত এবং দাপ্তরিক কাজগুলো যেন নির্বিঘ্নে, মসৃণভাবে ও স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন হয়, সে জন্য রাষ্ট্র তাঁদের বেশ কিছু আর্থিক ও লজিস্টিক সুবিধা প্রদান করে থাকে। ১৯৭৩ সালের ‘সংসদ সদস্যদের বেতন ও ভাতা আদেশ’ (The Members of Parliament Remuneration and Allowances Order, 1973) এবং এর সময় সময় হওয়া সংশোধনী অনুযায়ী বাংলাদেশের সংসদ সদস্যরা এই সুবিধাগুলো পেয়ে থাকেন। একজন সংসদ সদস্য (এমপি) রাষ্ট্র থেকে কী কী সুযোগ-সুবিধা পান, তা নিচে তুলে ধরা হলো:

১. মাসিক মূল বেতন (Basic Salary)

অনেকেরই ধারণা থাকতে পারে যে, সংসদ সদস্যরা হয়তো কেবল ভাতাই পান, তাঁদের কোনো নির্দিষ্ট বেতন নেই। কিন্তু এই ধারণা ভুল। অন্যান্য সরকারি চাকরিজীবীদের মতো সংসদ সদস্যদেরও একটি নির্দিষ্ট মাসিক বেতন রয়েছে। একজন সংসদ সদস্য প্রতি মাসে ৫৫,০০০ (পঁচান্ন হাজার) টাকা মূল বেতন হিসেবে গ্রহণ করে থাকেন। এই বেতনের পাশাপাশি তাঁরা আনুষঙ্গিক আরও অনেক ভাতা পেয়ে থাকেন, যা তাঁদের দৈনন্দিন জীবন ও দাপ্তরিক কাজ পরিচালনায় সহায়তা করে।

২. শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির বিশেষ সুবিধা (Duty-Free Car Import Facility)

সংসদ সদস্যদের পাওয়া সুবিধাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং আলোচিত সুবিধাটি হলো শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা। বাংলাদেশে বিদেশ থেকে যেকোনো ব্যক্তিগত গাড়ি আমদানি করতে গেলে গাড়ির ইঞ্জিন ক্যাপাসিটির ওপর ভিত্তি করে ১০০ শতাংশ থেকে শুরু করে ক্ষেত্রবিশেষে ৫০০ শতাংশ বা তারও বেশি আমদানি শুল্ক বা ট্যাক্স পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু একজন সংসদ সদস্য তাঁর মেয়াদের মধ্যে সম্পূর্ণ শুল্কমুক্তভাবে (ট্যাক্স ফ্রি) বিদেশ থেকে নিজের ব্যবহারের জন্য একটি গাড়ি আমদানি করতে পারেন। একবার এই সুবিধায় গাড়ি আমদানির পাঁচ বছর পর, তিনি যদি পুনরায় নির্বাচিত হন, তবে আবারও এই একই সুবিধা ভোগ করতে পারেন। এর মাধ্যমে তাঁরা কোটি টাকা মূল্যের বিলাসবহুল গাড়িও নামমাত্র মূল্যে দেশে আনার সুযোগ পান। তবে উল্লেখ্য যে, সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে বর্তমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ একটি অনন্য নজির স্থাপন করেছে। এই সংসদের সদস্যরা সর্বসম্মতিক্রমে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে এই ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি এবং প্লট সুবিধা গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

৩. যাতায়াত ও ভ্রমণ ভাতা (Travel Allowances)

একজন সংসদ সদস্যকে তাঁর নির্বাচনি এলাকা থেকে রাজধানী ঢাকায় এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারি কাজে প্রতিনিয়ত যাতায়াত করতে হয়। সরাসরি সরকারি গাড়ির সুবিধা সব এমপির জন্য সার্বক্ষণিকভাবে বরাদ্দ না থাকলেও, তাঁদের যাতায়াতের জন্য আকর্ষণীয় ভাতার ব্যবস্থা রয়েছে। সড়কপথে যাতায়াতের ক্ষেত্রে একজন সংসদ সদস্য প্রতি কিলোমিটারে ১০ টাকা হারে যাতায়াত ভাতা পেয়ে থাকেন। এর বাইরেও বছরে যাতায়াত বা ভ্রমণের জন্য তাঁরা ১,২০,০০০ (এক লাখ বিশ হাজার) টাকা পর্যন্ত ‘ট্রাভেল পাস’ বা ভ্রমণ ভাতা পেয়ে থাকেন। এই অর্থের মাধ্যমে তাঁরা দেশের ভেতরে বিমান, ট্রেন বা নৌপথে যাতায়াতের খরচ মেটাতে পারেন।

৪. নির্বাচনি এলাকার ভাতা ও অফিস পরিচালনা খরচ (Constituency & Office Allowance)

সংসদ সদস্যদের মূল কাজের জায়গা হলো তাঁদের নিজস্ব নির্বাচনি এলাকা। সেখানে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে তাঁদের নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করতে হয়। জনগণের অভাব-অভিযোগ শোনা এবং দাপ্তরিক কাজ পরিচালনার জন্য নিজ নির্বাচনি এলাকায় একটি কার্যালয় বা অফিস থাকা অপরিহার্য। এই অফিস পরিচালনার ব্যয়ভার যেন এমপির ব্যক্তিগত অর্থের ওপর চাপ সৃষ্টি না করে, সে জন্য রাষ্ট্র থেকে প্রতি মাসে ১৫,০০০ (পনেরো হাজার) টাকা অফিস পরিচালনা বা রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা দেওয়া হয়। এই টাকা দিয়ে অফিসের ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল বা সহকারীর বেতন আংশিক মেটানো সম্ভব হয়।

৫. আপ্যায়ন ভাতা (Entertainment Allowance)

একজন জনপ্রতিনিধির কাছে প্রতিদিন শত শত মানুষ নানা প্রয়োজনে আসেন। নির্বাচনি এলাকার সাধারণ মানুষ, দলীয় নেতাকর্মী কিংবা স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা যখন এমপির কার্যালয়ে বা বাসভবনে আসেন, তখন তাঁদের ন্যূনতম আপ্যায়নের প্রয়োজন হয়। এটি বাঙালি সংস্কৃতিরও একটি অংশ। এই আপ্যায়নের খরচ মেটানোর জন্য রাষ্ট্র একজন সংসদ সদস্যকে প্রতি মাসে ৫,০০০ (পাঁচ হাজার) টাকা করে বিশেষ ‘আপ্যায়ন ভাতা’ প্রদান করে থাকে।

৬. স্বেচ্ছাধীন তহবিল বা বিশেষ অনুদান (Discretionary Grant)

সংসদ সদস্যরা তাঁদের নিজ এলাকার দরিদ্র, অসহায় মানুষ বা বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা প্রদান করে থাকেন। এই জনকল্যাণমূলক কাজগুলো করার জন্য রাষ্ট্র তাঁদের একটি ‘স্বেচ্ছাধীন তহবিল’ বা বিশেষ অনুদান প্রদান করে। একজন এমপি বছরে সর্বোচ্চ ৫,০০,০০০ (পাঁচ লাখ) টাকা পর্যন্ত এই বিশেষ অনুদান হিসেবে পান। তবে এই টাকা ব্যয়ের ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট সরকারি শর্ত ও নীতিমালা রয়েছে। স্থানীয় মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির উন্নয়ন, দুস্থদের চিকিৎসায় সাহায্য বা গরিব মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহায়তায় এই অর্থ ব্যয় করা হয়ে থাকে।

৭. স্বাস্থ্য, মৃত্যু ও অক্ষমতা বিমা (Life and Disability Insurance)

রাজনীতি বা জনপ্রতিনিধিত্বের পেশায় সার্বক্ষণিক শারীরিক পরিশ্রম এবং ঝুঁকি থাকে। দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চলতে গিয়ে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এই ঝুঁকির কথা বিবেচনায় নিয়ে সরকার সংসদ সদস্যদের জন্য একটি বিশেষ বিমা বা ইনস্যুরেন্স সুবিধা চালু রেখেছে। দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে কোনো দুর্ঘটনায় যদি কোনো সংসদ সদস্যের মৃত্যু হয় অথবা তিনি শারীরিকভাবে স্থায়ী অক্ষমতার শিকার হন, তবে তাঁর পরিবার বা তিনি বিমা বাবদ ১০,০০,০০০ (দশ লাখ) টাকা ক্ষতিপূরণ পান। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই বিমার প্রিমিয়ামের সম্পূর্ণ খরচ সরকার নিজেই বহন করে, এমপির ব্যক্তিগত বেতন থেকে কোনো অর্থ কাটা হয় না।

৮. টেলিফোন ও যোগাযোগ সুবিধা (Telephone & Communication Perks)

বর্তমান যুগে দ্রুত যোগাযোগের কোনো বিকল্প নেই। একজন এমপিকে সার্বক্ষণিক প্রশাসন, দলীয় হাইকমান্ড এবং সাধারণ জনগণের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হয়। এই কারণে সংসদ সদস্যদের বাসভবনে সরকারি খরচে ল্যান্ডলাইন টেলিফোন সংযোগ দেওয়া হয়। শুধু সংযোগ দিয়েই সরকার দায় সারে না, এই টেলিফোন বা যোগাযোগের বিল বাবদ প্রতি মাসে ৭,৮০০ (সাত হাজার আটশ) টাকা পর্যন্ত বিল পরিশোধের সুবিধা রাষ্ট্র বহন করে। এর ফলে যোগাযোগজনিত খরচের কোনো চাপ এমপির ওপর পড়ে না।

৯. করমুক্ত সুবিধা (Tax Exemptions)

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলোর মধ্যে একটি হলো আয়কর সুবিধা। একজন সংসদ সদস্য মাসিক যে ৫৫ হাজার টাকা মূল বেতন পান, কেবল সেটির ওপর তাঁকে আয়কর বা ট্যাক্স দিতে হয়। কিন্তু এর বাইরে তিনি আপ্যায়ন ভাতা, অফিস রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা, যাতায়াত ভাতা বা টেলিফোন বিলসহ যত ধরনের আর্থিক ভাতা পান, তার সবগুলোই সম্পূর্ণ ‘আয়কর মুক্ত’ (Tax-free)। অর্থাৎ, এই বিশাল অঙ্কের ভাতার ওপর তাঁদের সরকারকে কোনো ট্যাক্স প্রদান করতে হয় না।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের একজন সংসদ সদস্য রাষ্ট্র থেকে বেশ ভালো অঙ্কের আর্থিক ও লজিস্টিক সুবিধা পেয়ে থাকেন। বেতন, যাতায়াত ভাতা, শুল্কমুক্ত গাড়ি, চিকিৎসাবিমা, বিশেষ অনুদান এবং করমুক্ত ভাতার মতো এই সুবিধাগুলো দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো—জনপ্রতিনিধিরা যেন আর্থিক দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত হয়ে তাঁদের মেধা, সময় ও শ্রম পুরোপুরি দেশ ও জনগণের কল্যাণে নিয়োগ করতে পারেন। রাষ্ট্র তাঁদের এই বিপুল সম্মান ও সুবিধা প্রদান করে এই প্রত্যাশায় যে, তাঁরা সততা, নিষ্ঠা ও জবাবদিহির সঙ্গে তাঁদের ওপর অর্পিত আইনি ও সামাজিক দায়িত্ব পালন করবেন। জনগণের করের টাকায় দেওয়া এই সুবিধাগুলো যেন কোনোভাবেই অপব্যবহার না হয়, সেটি নিশ্চিত করাও একজন আদর্শ জনপ্রতিনিধির নৈতিক দায়িত্ব।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category