ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সামরিক সংঘাতে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহারের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মজুতে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশদ প্রতিবেদনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার তথ্যমতে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামের এই যুদ্ধে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০০ কোটি (১ বিলিয়ন) ডলার ব্যয় করছে যুক্তরাষ্ট্র। মাত্র ৩৮ দিনের এই সংঘাতে পেন্টাগনের মোট খরচ গিয়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ থেকে ৩৫ বিলিয়ন ডলারে। মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানা যায়, শুধু যুদ্ধের প্রথম দুই দিনেই প্রায় ৫৬০ কোটি ডলারের অস্ত্র ব্যবহার করেছে তারা।
অস্ত্র ব্যবহারের হিসাব ঘাঁটলে দেখা যায়, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মার্কিন বাহিনী জ্যাসম-ইআর (JASSM-ER) নামক প্রায় ১ হাজার ১০০টি দূরপাল্লার স্টেলথ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। ১১ লাখ ডলার মূল্যের এই আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রের বর্তমান মজুত নেমে এসেছে মাত্র ১ হাজার ৫০০টিতে। একই সাথে এক হাজারেরও বেশি টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক ক্রয় পরিমাণের প্রায় দশ গুণ। এছাড়া ৪০ লাখ ডলারেরও বেশি মূল্যের ১ হাজার ২০০টির বেশি প্যাট্রিয়ট মিসাইল সিস্টেম ইন্টারসেপ্টর এবং এক হাজারের অধিক প্রিসিশন স্ট্রাইক ও এটিএসিএমএস (ATACMS) স্থলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এই অল্প সময়ে ১৩ হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী, যদিও বাস্তবে এই সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অস্ত্রের এই বিপুল ব্যবহার যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী সামরিক সক্ষমতা নিয়ে শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। মার্কিন সিনেটের সশস্ত্র বাহিনী কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট জ্যাক রিড সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা দিয়ে ব্যবহৃত এসব অত্যাধুনিক অস্ত্রের শূন্যস্থান পূরণ করতে কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (CSIS) জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ও অবসরপ্রাপ্ত মেরিন কর্নেল মার্ক ক্যানসিয়ান জানিয়েছেন, কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থল হামলা ও আকাশ প্রতিরক্ষার গোলাবারুদ যুদ্ধের আগে থেকেই কম ছিল, যা এখন আরও তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। যদিও হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এই শঙ্কাকে ‘ভিত্তিহীন’ দাবি করে বলেছেন, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের মজুতে প্রয়োজনের চেয়েও পর্যাপ্ত অস্ত্র ও গোলাবারুদ রয়েছে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়ছে ইউরোপ এবং এশিয়াতেও। বিশ্লেষকদের মতে, ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সামরিক প্রস্তুতি মারাত্মক চাপের মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, পরিস্থিতি সামাল দিতে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে দক্ষিণ চীন সাগর থেকে ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপকে মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নিয়েছে এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় থাকা থাড (THAAD) সিস্টেমের ইন্টারসেপ্টরও স্থানান্তর করেছে। ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল স্যামুয়েল পাপারো সম্প্রতি স্বীকার করেছেন যে, যেকোনো দেশেরই অস্ত্রভান্ডারের একটি নির্দিষ্ট সীমা থাকে। দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের উচ্চমাত্রার সামরিক ব্যয় ও মজুত সংকট বৈশ্বিক নিরাপত্তার ভারসাম্যকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা।