দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অকাল বন্যার পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। ভারতের মেঘালয় ও আসামের পাহাড়ি ঢল আর গত কয়েকদিনের টানা ভারী বর্ষণে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও হবিগঞ্জের নদ-নদীতে পানি বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। বর্তমানে এই অঞ্চলের অন্তত আটটি নদীর পানি বিভিন্ন পয়েন্টে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বিশেষ করে সুনামগঞ্জের নালজুর, নেত্রকোনার বাউলাই ও সোমেশ্বরী এবং হবিগঞ্জের কুশিয়ারা নদীর পানি বাড়ায় হাওর সংলগ্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ২০০৪ বা ২০২২-এর বন্যার বিভীষিকা নতুন করে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।
উজান থেকে ধেয়ে আসা পানি ও বর্তমান চিত্র
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, উজানে ভারতের মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হওয়ায় পাহাড়ি ঢল হু হু করে নামছে বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলে। নেত্রকোনার জারিয়াজঞ্জাইলে ৭৪ মিলিমিটার এবং হবিগঞ্জে ৭৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর ফলে সুরমা, কুশিয়ারা ও ধনু নদীর পানি সমতলও বৃদ্ধি পেয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস বলছে, আগামী তিন দিন এই অঞ্চলে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে, যা পরিস্থিতিকে আরও অবনতির দিকে ঠেলে দিতে পারে। সিলেট ও সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চলে ইতোমধ্যেই পানি ঢুকতে শুরু করেছে, যা গবাদি পশু ও গোলার ধান নিয়ে কৃষকদের নতুন দুশ্চিন্তায় ফেলেছে।
মাঠে নেমেছে প্রশাসন: মন্ত্রীদের সুনামগঞ্জ সফর
বন্যার এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে এবং ত্রাণ কার্যক্রম তদারকি করতে আজ মঙ্গলবার সুনামগঞ্জ সফরে যাচ্ছেন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দুই মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। কৃষি ও মৎস্য মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলুসহ প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সুনামগঞ্জ সার্কিট হাউজে জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করবেন। এরপর তারা বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার দুর্গত এলাকায় সরাসরি ত্রাণ সহায়তা বিতরণ করবেন। কৃত্রিম বা অকাল বন্যায় ফসলের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কৃষকদের নগদ অর্থ ও অন্যান্য সহযোগিতা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার।
কবে থামবে এই বৃষ্টি? আবহাওয়া দপ্তরের বার্তা
টানা দুর্যোগের মধ্যে অবশেষে একটি আশার খবর শুনিয়েছে আবহাওয়া দপ্তর। পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ৭ মে থেকে বৃষ্টিপাত কমতে শুরু করবে। এরপর ৮ মে থেকে ১৮ মে পর্যন্ত টানা ১০ দিন সারা দেশে রৌদ্রোজ্জ্বল ও কড়া রোদের সম্ভাবনা রয়েছে। কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশও নিশ্চিত করেছেন যে, ৭ মের পর মেঘমুক্ত আকাশের দেখা মিলবে। এই ১০ দিনের রোদেলা আবহাওয়া কেবল বন্যার পানি নামাতেই সাহায্য করবে না, বরং কৃষকদের হাওর থেকে ধান কেটে শুকাতে এবং নিরাপদে ঘরে তুলতেও বড় সুযোগ করে দেবে।
পরিশেষে, আগামী ৭২ ঘণ্টা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষের জন্য অত্যন্ত সংকটময়। যদি উজানে বৃষ্টি থামে এবং বাংলাদেশের আবহাওয়া দপ্তরের রোদেলা পূর্বাভাস সত্য হয়, তবে বড় ধরণের দীর্ঘমেয়াদী বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে পারে বাংলাদেশ। স্থানীয় প্রশাসনকে নদী তীরবর্তী নিচু এলাকার মানুষকে সতর্ক থাকার এবং প্রয়োজনে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সরকারের দ্রুত ত্রাণ তৎপরতা এবং প্রকৃতির অনুকূল আচরণই এখন দুর্গত মানুষের একমাত্র ভরসা।