ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক পালাবদল ঘটল। রাজ্যের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনীত হয়েছেন দাপুটে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী। আজ শুক্রবার (৮ মে ২০২৬) কলকাতায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের উপস্থিতিতে নবনির্বাচিত বিজেপি বিধায়কদের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। আজই রাজভবনে গিয়ে রাজ্যপালের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার গঠনের দাবি জানাবেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর গুরুদায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি বিধানসভার পরিষদীয় দলনেতা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবেন মেদিনীপুরের এই দাপুটে নেতা।
আজ বেলা ১১টার পর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে বহনকারী বিশেষ বিমান কলকাতা বিমানবন্দরে অবতরণ করে। সেখান থেকে তিনি সোজা চলে যান দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দিরে। মন্দিরে পূজা অর্চনা শেষে তিনি ওঠেন নিউ টাউনের একটি হোটেলে। এরপর দুপুরে বিশ্ব বাংলা কনভেনশন সেন্টারে বিজেপির জয়ী বিধায়কদের নিয়ে এক মেগা বৈঠকে বসেন অমিত শাহ। সেখানেই সর্বসম্মতিক্রমে রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর নাম চূড়ান্ত করা হয়। জানা গেছে, অমিত শাহ আজ নিউ টাউনের হোটেলেই রাত্রিযাপন করবেন এবং আগামীকাল শনিবার সোজা চলে যাবেন কলকাতার ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে। সেখানেই এক বিশাল জনসমুদ্রের সামনে শপথ নেবেন পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
পশ্চিমবঙ্গের এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং শুভেন্দু অধিকারীর উত্থান যেন এক দীর্ঘ রাজনৈতিক উপাখ্যান। ১৯৭০ সালের ১৫ ডিসেম্বর পূর্ব মেদিনীপুরে জন্মগ্রহণ করা শুভেন্দু অধিকারী দীর্ঘ তিন দশক ধরে রাজনীতির মাঠে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। একসময় তিনি ছিলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম ছায়াসঙ্গী। ১৯৯৫ সালে কাঁথি পৌরসভার কাউন্সিলর হিসেবে তার রাজনৈতিক জীবনের হাতেখড়ি। এরপর ২০০৬ সালে দক্ষিণ কাঁথি থেকে প্রথমবার বিধায়ক নির্বাচিত হন। তবে ২০০৭-০৮ সালের ঐতিহাসিক নন্দীগ্রাম আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি রাজ্য রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন এবং জাতীয় স্তরেও পরিচিতি লাভ করেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভায় দীর্ঘদিন পরিবহণ ও সেচ দপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন শুভেন্দু। তবে আদর্শগত ও রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে ২০২০ সালে তৃণমূল কংগ্রেস ত্যাগ করে বিজেপিতে যোগদান তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নিজের গড় নন্দীগ্রামে খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করে তিনি ‘জায়ান্ট কিলার’ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেন। এরপর রাজ্য বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা হিসেবে শাসকদলের প্রধান প্রতিপক্ষ ও কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন তিনি।
তবে ২০২৬ সালের এই বিধানসভা নির্বাচন শুভেন্দুর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে এক অনন্য মাইলফলক হয়ে থাকবে। অভাবনীয় রাজনৈতিক সাহস দেখিয়ে তিনি এবার নিজের দুর্গ নন্দীগ্রামের পাশাপাশি খোদ মুখ্যমন্ত্রীর খাসতালুক ভবানীপুর থেকেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং উভয় কেন্দ্র থেকেই বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। তার এই জাদুকরী নেতৃত্বের ওপর ভর করেই বিজেপি রাজ্যে প্রথমবারের মতো ম্যাজিক ফিগার পার করে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। এবার রাজ্যে ৯২ দশমিক ৪৭ শতাংশের রেকর্ড ভোটার উপস্থিতি এবং ভোটার তালিকা থেকে ৯১ লাখ ‘ভুয়া’ ভোটার বাদ দেওয়ার কঠোর লড়াইকে হাতিয়ার করেই শুভেন্দু আজ বাংলার পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রীর পদে আসীন হচ্ছেন।
কাঁথি হাইস্কুল থেকে স্কুলজীবন শেষ করে প্রভাত কুমার কলেজ এবং পরবর্তীকালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন শুভেন্দু। মেদিনীপুরের প্রভাবশালী অধিকারী পরিবারের দীর্ঘ রাজনৈতিক ঐতিহ্যকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তিনি। বর্তমানে তার বাবা বর্ষীয়ান রাজনীতিক শিশির অধিকারী এবং দুই ভাই দিব্যেন্দু ও সৌমেন্দু—সকলেই বিজেপির ছত্রছায়ায় মেদিনীপুরের রাজনৈতিক একাধিপত্য বজায় রেখেছেন। মেদিনীপুরের সেই ‘সিংহ’ থেকে আজ কলকাতার ক্ষমতার অলিন্দে শুভেন্দুর এই রাজকীয় জয়যাত্রা নিঃসন্দেহে পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।