ভূ-রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ যখন চরম রূপ নিয়েছে, ঠিক তখনই বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ ‘হরমুজ প্রণালী’ (Strait of Hormuz) নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক নতুন উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষা এবং ইরানি হামলা বন্ধের দাবিতে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের উত্থাপিত একটি প্রস্তাবের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে ইরান। তেহরান সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, এই প্রস্তাবের পেছনে থাকা বা সমর্থনকারী দেশগুলোকে ভবিষ্যতে যেকোনো সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির ‘আন্তর্জাতিক দায়’ বহন করতে হবে।
জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের স্থায়ী মিশন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) প্রকাশিত এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই কড়া বার্তা দেয়।
ইরানি মিশনের বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত চতুরতার সাথে হরমুজ প্রণালী নিয়ে উত্থাপিত এই প্রস্তাবের সহ-সমর্থক বা সহ-উদ্যোক্তাদের তালিকাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। ওয়াশিংটন মূলত এর মাধ্যমে তাদের ‘অবৈধ কর্মকাণ্ড ও সম্ভাব্য সামরিক আগ্রাসনের’ পক্ষে একটি ভুয়া আন্তর্জাতিক সমর্থনের ধারণা তৈরি করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে অন্য দেশগুলোকে সতর্ক করে বলা হয়েছে, “কোনো রাজনৈতিক অজুহাত বা কূটনৈতিক আড়াল (যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রস্তাবকে সমর্থনকারী দেশগুলোকে) তাদের আন্তর্জাতিক দায় থেকে মুক্ত করতে পারবে না।” অর্থাৎ, এই প্রস্তাবে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোকেও ইরান তাদের শত্রু শিবিরের অংশ হিসেবেই বিবেচনা করবে।
যুক্তরাষ্ট্র, বাহরাইন এবং অন্যান্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর যৌথ সমর্থনে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এই খসড়া প্রস্তাবটি উত্থাপন করা হয়। প্রস্তাবে মূলত ওমান উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীসহ সামগ্রিক উপসাগরীয় জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর সাম্প্রতিক ইরানি হামলা ও জাহাজ জব্দের ঘটনার তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে। একই সাথে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এই জলসীমায় বাণিজ্যিক নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা অবিলম্বে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার দাবি জানানো হয়েছে।
বিশ্বের মোট খনিজ তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ (২০ শতাংশ) এই হরমুজ প্রণালী হয়েই বিভিন্ন দেশে পরিবাহিত হয়। ফলে এই সংকীর্ণ জলপথের সামান্যতম সামরিক উত্তেজনাও বিশ্ব অর্থনীতি এবং জ্বালানি বাজারের জন্য এক বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিংয়ে যখন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যকার আসন্ন শীর্ষ বৈঠকে ইরান ইস্যু নিয়ে আলোচনার প্রস্তুতি চলছে, ঠিক তখনই জাতিসংঘে ওয়াশিংটনের এই প্রস্তাব পাসের চেষ্টা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে আরও বহুমুখী ও জটিল করে তুলবে। ওপার বাংলায় কোরবানির বিধি-নিষেধ বা দেশে ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতার মতোই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হরমুজ প্রণালীর এই নতুন দ্বন্দ্ব ২০২৬ সালের বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম প্রধান নিয়ামক হয়ে উঠছে।