যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে সম্ভবত এমন অস্থিতিশীল, বিভক্ত ও ঘটনাবহুল সপ্তাহ খুব কমই এসেছে। একদিকে দেশের রাজপথ দখল করে নিয়েছে কট্টর ডানপন্থি ও অভিবাসীবিরোধী লাখো জনতা, অন্যদিকে ফিলিস্তিনপন্থিদের বিশাল সমাবেশ ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র উত্তেজনা। আর ঠিক একই সময়ে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের ভেতরে চলছে এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক ভূমিকম্প। নিজ দলের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের (এমপি) বিদ্রোহের মুখে পড়ে প্রধানমন্ত্রী পদে টিকে থাকার জন্য আক্ষরিক অর্থেই জীবনমরণ লড়াই করছেন লেবার পার্টির নেতা কিয়ার স্টারমার। রাজপথের এই চরম সামাজিক মেরুকরণ এবং সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের এই রাজনৈতিক ভাঙন—সব মিলিয়ে যুক্তরাজ্য এখন এক গভীর এবং বহুমুখী সংকটের আবর্তে নিমজ্জিত।
শনিবার (১৬ মে) লন্ডনের চিত্র ছিল আক্ষরিক অর্থেই এক রণক্ষেত্রের পূর্বপ্রস্তুতির মতো। এদিন মধ্য লন্ডনের রাস্তায় লাখো মানুষের ঢল নামে, যাদের হাতে ছিল ব্রিটিশ ও ইংলিশ পতাকা। ‘ইউনাইট দ্য কিংডম’ বা ‘যুক্তরাজ্যকে ঐক্যবদ্ধ করো’ শীর্ষক এই বিশাল র্যালির নেতৃত্বে ছিলেন যুক্তরাজ্যের সুপরিচিত কট্টর ডানপন্থি রাজনৈতিক কর্মী টমি রবিনসন। হোলবোর্ন থেকে শুরু হয়ে ঐতিহাসিক পার্লামেন্ট স্কয়ারে গিয়ে শেষ হওয়া এই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া মানুষের মূল দাবি ছিল অবিলম্বে দেশে অভিবাসন বন্ধ করা এবং ইউরোপীয় মানবাধিকার কনভেনশন (ইসিএইচআর) থেকে যুক্তরাজ্যের সম্পূর্ণভাবে বেরিয়ে আসা। আটলান্টিকের ওপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক দর্শনের আদলে সমাবেশে আসা অনেককেই ‘মেক ইংল্যান্ড গ্রেট এগেইন’ লেখা লাল টুপি পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়। অনেকে আবার নিজেদের উগ্র জাতীয়তাবাদী ও খ্রিষ্টান পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে কাঠের তৈরি বড় ক্রুশ বহন করছিলেন। বিক্ষোভকারীদের কণ্ঠে ছিল চরম জাতীয়তাবাদী স্লোগান। তাদের স্পষ্ট বার্তা, সবার আগে অভিবাসীবাহী নৌকা আসা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে এবং যেকোনো মূল্যে ব্রিটেনের স্থানীয় জনগণকে চাকরি, আবাসন ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সুবিধায় অগ্রাধিকার দিতে হবে। ক্ষুব্ধ এক বিক্ষোভকারী গণমাধ্যমকে জানান, তিনি চান ইংল্যান্ড যেন তার পুরোনো পরিচয়ে ফিরে যায় এবং রাজনীতিবিদরা যেন কেবল নিজেদের স্বার্থ না দেখে বর্তমান ও ভবিষ্যতে সাধারণ ব্রিটিশ নাগরিকদের কথা ভাবেন।
লন্ডনের রাস্তা যখন কট্টর ডানপন্থিদের দখলে, ঠিক তখনই শহরের আরেক প্রান্তে ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভকারীরা নাকবা দিবস উপলক্ষে এক বিশাল ও পাল্টাপাল্টি সমাবেশের আয়োজন করেন। হাতে ফিলিস্তিনের পতাকা ও উগ্র ডানপন্থি-বিরোধী প্ল্যাকার্ড নিয়ে হাজার হাজার মানুষ সেখানে জড়ো হন। তাদের স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ। এই সমাবেশে কেবল ইসরায়েলের আগ্রাসনের প্রতিবাদই করা হয়নি, বরং যুক্তরাজ্যের বর্তমান সরকার ও তার দুর্নীতিগ্রস্ত নীতির বিরুদ্ধেও তীব্র ক্ষোভ উগরে দেওয়া হয়। ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, গাজায় চলমান গণহত্যার বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সরকার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। তাদের দাবি, পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রযন্ত্র আজ দুর্নীতিগ্রস্ত। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এবং পিটার ম্যান্ডেলসনের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ করে তারা বলেন, এই নেতারা ভয়ানক দুর্নীতির মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজেদের আখের গোছাচ্ছেন এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন করছেন।
পরস্পরবিরোধী এবং সম্পূর্ণ দুই মেরুর এই বিশাল সমাবেশ ঘিরে পুরো লন্ডন শহরজুড়ে এক চরম ভীতিকর ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও দাঙ্গার আশঙ্কায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দেশটির ইতিহাসে রেকর্ডসংখ্যক প্রায় চার হাজার পুলিশ সদস্য মাঠে নামানো হয়। শুধু লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশ দিয়ে এই বিশাল জনসমুদ্র সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না বুঝতে পেরে, নিরাপত্তা জোরদারে বাইরের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী তলব করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এটি ছিল লন্ডনে পুলিশের অন্যতম বড় একটি নিরাপত্তা অভিযান, যা প্রমাণ করে যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
রাজপথের এই চরম অরাজকতা ও জনরোষের ঠিক সমান্তরালেই ওয়েস্টমিনস্টারে চলছে আরেক নাটকীয় অধ্যায়। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার তার নিজের দলের ভেতরেই এক অভূতপূর্ব ও প্রকাশ্য বিদ্রোহের মুখোমুখি হয়েছেন। গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত ইংল্যান্ডজুড়ে স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টির চরম ভরাডুবি ঘটে। এই নির্বাচনে দলটি তাদের প্রায় দেড় হাজার কাউন্সিলর পদ হারায়, যা দলের ভেতরে এক বিশাল রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা দেয়। এই শোচনীয় পরাজয়ের পর লেবার পার্টির এমপিদের মধ্যে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে। তারা মনে করছেন, স্টারমারের বর্তমান নেতৃত্ব ও অজনপ্রিয় নীতির কারণে দল আগামী দিনে আরও বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ রূপ নিয়েছে যে, খোদ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদসহ মন্ত্রিসভার বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী সদস্য প্রধানমন্ত্রীকে অবিলম্বে দায়িত্ব ত্যাগের সময়সূচি ঘোষণার জন্য প্রকাশ্যে আহ্বান জানিয়েছেন। জেস ফিলিপস এবং মিয়াট্টা ফানবুলেহ-এর মতো মন্ত্রীরা ইতিমধ্যে সরকার থেকে পদত্যাগ করে স্টারমারের ওপর চাপ আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন।
তবে এত কিছুর পরও কিয়ার স্টারমার এত সহজে হার মানতে নারাজ। সাপ্তাহিক মন্ত্রিসভার এক রুদ্ধদ্বার ও উত্তপ্ত বৈঠকে তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, চরম চাপের মুখে থাকলেও তার পদত্যাগ করার কোনো ইচ্ছা নেই। উল্টো তিনি তার সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছেন, সাহস থাকলে লেবার নেতা হিসেবে তাকে যেন আনুষ্ঠানিকভাবে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়। দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, একজন বর্তমান নেতাকে চ্যালেঞ্জ করতে হলে ৮১ জন সহকর্মী বা লেবার এমপির অন্তত ২০ শতাংশের প্রকাশ্য সমর্থন প্রয়োজন। যদিও এর আগে প্রায় ৮০ জন লেবার এমপি প্রকাশ্যে স্টারমারকে অবিলম্বে পদত্যাগ বা প্রস্থানের একটি রূপরেখা তৈরির আহ্বান জানিয়েছিলেন, কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে চ্যালেঞ্জ করার উদ্যোগ বা অনাস্থা প্রস্তাব এখনো কেউ আনেননি।
মন্ত্রিসভার ওই রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর আবাসন মন্ত্রী স্টিভ রিড এবং কর্ম ও পেনশনমন্ত্রী প্যাট ম্যাকফ্যাডেনের মতো স্টারমারের প্রধান মিত্ররা সাংবাদিকদের জানান যে, তারা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি তাদের সমর্থন অব্যাহত রাখবেন। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সতর্ক নজর ছিল সম্ভাব্য নেতৃত্বপ্রত্যাশী এবং উদীয়মান নেতা স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংয়ের দিকে। ডাউনিং স্ট্রিট ছেড়ে যাওয়ার সময় সাংবাদিকরা তাকে দলের এই ভাঙন নিয়ে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করলেও তিনি পুরোপুরি নীরবতা পালন করেন, যা রাজনৈতিক মহলে স্টারমারের বিদায়ঘণ্টা বাজার ইঙ্গিত হিসেবেই দেখা হচ্ছে। স্টারমারের আরেক মিত্র ও পররাষ্ট্র দপ্তরের মন্ত্রী জেনি চ্যাপম্যান স্বীকার করেছেন যে, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্ব নিয়ে দলের ভেতরে ‘তীব্র আলোচনা’ চলছে, তবে মন্ত্রিসভার বৈঠকে সরাসরি কেউ তাকে চ্যালেঞ্জ করেননি বলে তিনি দাবি করে সাময়িক স্বস্তি খোঁজার চেষ্টা করেছেন।
স্টারমারের এই রাজনৈতিক পতনের পেছনে শুধু স্থানীয় নির্বাচনের ভরাডুবিই একমাত্র কারণ নয়। সম্প্রতি বর্ষীয়ান ও চরম বিতর্কিত লেবার রাজনীতিবিদ পিটার ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার যে অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত স্টারমার নিয়েছেন, তা দলের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। জনমত জরিপগুলোতে এমনিতেই লেবার পার্টির অবস্থান ও স্টারমারের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। তার ওপর এই ধরনের বিতর্কিত নিয়োগ সাধারণ মানুষ ও দলের তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। রাজপথের ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভকারীদের মুখেও সরাসরি ম্যান্ডেলসনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ শোনা গেছে, যা প্রমাণ করে যে সরকারের এই সিদ্ধান্তটি কতটা অজনপ্রিয় ও আত্মঘাতী হয়েছে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাজ্য আজ এমন এক ক্রান্তিলগ্নে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে রাজপথের সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং পার্লামেন্টের ভেতরের রাজনৈতিক অবিশ্বাস এক বিন্দুতে এসে মিলেছে। একদিকে অভিবাসন নীতি ও অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে কট্টর ডানপন্থিদের উগ্র উত্থান, অন্যদিকে বৈদেশিক নীতি ও মানবাধিকার প্রশ্নে ফিলিস্তিন সমর্থকদের ক্ষোভ—এই দুই মেরুর চরমপন্থার মাঝখানে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ ব্রিটিশ জনতা। আর এই পুরো পরিস্থিতি সামাল দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছেন কিয়ার স্টারমার। নিজের দলের ভেতরেই তিনি এখন পুরোপুরি কোণঠাসা। যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখন রাজপথ ও পার্লামেন্ট—উভয় জায়গা থেকেই কোনো প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তীব্র অনাস্থা তৈরি হয়, তখন তার মসনদে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। আগামী কয়েকটা দিন কিয়ার স্টারমারের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং পুরো যুক্তরাজ্যের সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য যে অত্যন্ত নির্ধারক হতে যাচ্ছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।