দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি ও অর্থনৈতিক মানচিত্রে এক অভাবনীয় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাই-ভোল্টেজ বৈঠকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি চীন পর্যন্ত একটি বিশাল ‘ইকোনমিক করিডর’ বা অর্থনৈতিক করিডরের প্রস্তাব দিয়েছে বেইজিং। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই করিডর বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ সড়ক ও রেলপথে চীনের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হবে, যা দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনীতির ব্যাপ্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
সফরের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি। চীন সরাসরি আগ্রহ প্রকাশ করেছে চট্টগ্রাম এবং মোংলা বন্দরকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের ‘রিজিওনাল হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য। বেইজিংয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই আধুনিকায়নের ফলে চট্টগ্রাম বন্দর শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং পুরো দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে। একইভাবে মোংলা বন্দরকেও প্রগ্রেসিভ ও সার্ভিস ওরিয়েন্টেড করার লক্ষ্যে অবকাঠামোগত ও কারিগরি সহায়তা দেবে চীন। এছাড়া তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং দেশের সার্বিক নদী ব্যবস্থাপনায় চীনের সর্বাত্মক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
এই সফরের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো প্রথমবারের মতো চীনের সাথে বাংলাদেশের ‘টু প্লাস টু’ (Two Plus Two) কৌশলগত সংলাপের সূচনা। এর আওতায় দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিরা নিয়মিত বৈঠক করবেন, যা সামরিক ও কূটনৈতিক আস্থার এক নতুন মাত্রা যোগ করবে। চীন স্পষ্ট করেছে যে, তারা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা এবং টেরিটোরিয়াল ইন্টিগ্রিটির প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল। বেইজিংয়ের মতে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় গঠিত সরকারের স্বাধীন ও সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতিকে বিশ্বের প্রতিটি দেশেরই সম্মান জানানো উচিত।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে বেইজিং ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। চীন মিয়ানমারের সাথে যেকোনো দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করবে বলে আশ্বাস দিয়েছে, যাতে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ উপায়ে রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরতে পারে। পাশাপাশি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক জোট ‘ব্রিক্স’-এর সদস্যপদ পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আবেদনকে চীন পূর্ণ সমর্থন দেবে বলে জানিয়েছে।
এছাড়া স্বাস্থ্য খাতে রোবটিক সার্জারি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা ব্যবস্থায় চীনা ভাষা বা ম্যান্ডারিনকে অগ্রাধিকার এবং বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য চীনা ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণের বিষয়েও বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সামার দাভোস এবং বেইজিংয়ে এই মেগা সফর বাংলাদেশের কূটনীতিতে এক ঐতিহাসিক যুগের সূচনা করল। আত্মনির্ভরতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে বাংলাদেশ এখন তার নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণে আগের চেয়ে অনেক বেশি সংহত।
এই মেগা করিডর এবং প্রতিরক্ষা চুক্তি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানে কতটা সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন আনবে—এখন সেটাই দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকরা।
তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ