জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অর্জিত নতুন বাংলাদেশে পুলিশের আমূল সংস্কার ছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি। ছাত্র-জনতার ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া এই নতুন বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল এমন একটি পুলিশ বাহিনী, যা হবে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, জনবান্ধব এবং জবাবদিহিমূলক। কিন্তু অভ্যুত্থানের প্রায় দুই বছর অতিক্রান্ত হতে চললেও পুলিশ বাহিনীর চরিত্রের দৃশ্যমান ও গুণগত পরিবর্তনের বিষয়টি এখনো ধূম্রজালের আড়ালে। মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের কার্যক্রম এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের দিকে তাকালে সাধারণ মানুষ ও বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলছেন—পুলিশ সংস্কারের নামে আসলে কি বাহিনীর ভেতর থেকে পুরনো ফ্যাসিবাদী খোলস ঝেড়ে ফেলা সম্ভব হচ্ছে, নাকি চশমা বদলে কেবল পুরনো কায়দাতেই রাষ্ট্র পরিচালনার প্রক্রিয়া চলছে?
সংস্কারের লক্ষ্য ও বাস্তবতার ব্যবধান
পুলিশ সংস্কারের মূল লক্ষ্য ছিল বাহিনীকে দলীয়করণের অভিশাপ থেকে মুক্ত করা, নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি বন্ধ করা এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি পেশাদার বাহিনী গড়ে তোলা। সংস্কার কমিশনের সুপারিশের তালিকায় বল প্রয়োগের সীমা নির্ধারণ, স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন এবং নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা আনার মতো যুগান্তকারী প্রস্তাব ছিল। কিন্তু বাস্তব চিত্রটি ভিন্ন। সংস্কার কমিশনের ১৩টি আশু বাস্তবায়নযোগ্য প্রস্তাব বাছাই করা হলেও, স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের মতো বড় কাঠামোগত সংস্কারগুলো এখনো রাজনৈতিক ঐকমত্যের দোহাই দিয়ে ঝুলে আছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুলিশের সমস্যা কেবল আইনের অভাব নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির সংকট। ফ্যাসিবাদী আমলে গড়ে ওঠা জবাবদিহিহীনতা ও রাজনৈতিক তোষামোদির সংস্কৃতি এতই গভীরে প্রোথিত যে, কেবল নেতৃত্বের পরিবর্তন বা রুটিন বদলি আদেশে এই বাহিনীতে প্রকৃত পরিবর্তন আসা অসম্ভব। গত ১৮ জুন আইজিপি স্বাক্ষরিত আদেশে ১২ জন কর্মকর্তাকে বদলি করা হলেও পুলিশ সদর দপ্তরের অন্দরমহলে খবর নিয়ে জানা যায়, এসব বদলি ও পদোন্নতির পেছনে যোগ্যতা-ভিত্তিক মূল্যায়নের চেয়ে রাজনৈতিক লবিং ও তদবিরই এখনো বড় ভূমিকা রাখছে।
রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে পুলিশ
পুলিশের ওপর রাজনৈতিক নির্ভরতা যে কমেনি, তার বড় প্রমাণ মেলে সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনায়। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকায় একটি নিষিদ্ধ সংগঠনের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ১৮ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে ব্যবহারের পাশাপাশি বিজিবি ও সেনাবাহিনীকে মাঠে নামানো হয়। রাজনৈতিক সংকট রাজনৈতিকভাবেই সমাধানের পথ না খুঁজে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এভাবে মাঠে নামানোয় ক্ষোভ জানিয়েছেন বাহিনীর অনেক সদস্যই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা আক্ষেপ করে বলেন, “জুলাই বিপ্লবের পর আমাদের স্বপ্ন ছিল আমরা জনগণের পুলিশ হব। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আবারও আমাদের রাজনৈতিক ময়দানে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়ানো হচ্ছে।” পুলিশের একটি বড় অংশ মনে করছে, সরকারের পক্ষ থেকে পুলিশ সংস্কারের যে শর্তগুলো ছিল, তা কাগজে-কলমে রেখে দিয়ে বাস্তবে পুরনো কায়দায় বলপ্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবেই পুলিশকে ব্যবহার করা হচ্ছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে, যা জনমনে পুলিশের প্রতি অস্থার বদলে বিরূপ ধারণা তৈরি করছে।
দুর্নীতির অক্টোপাস: নিয়োগ ও বদলি-বাণিজ্য
পুলিশ সংস্কার কমিশন বাহিনীর ভেতর দুর্নীতির যে চিত্র তুলে ধরেছে, তা রীতিমতো ভয়াবহ। কমিশন তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, কনস্টেবল পদে নিয়োগের জন্য জনপ্রতি ১০ লাখ টাকা বা তারও বেশি ঘুষ লেনদেন হচ্ছে। পুলিশের ভেতরে ৯টি বিশেষ খাত চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির চর্চা হয়। এর মধ্যে অপরাধীদের সাথে পুলিশের গোপন যোগসাজশ, মাদক ও অস্ত্র ব্যবসায় সহায়তা এবং অর্থের বিনিময়ে নিরীহ মানুষকে ফাঁসিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক।
তদবিরের সংস্কৃতি ও বদলি-বাণিজ্য এখন বাহিনীর ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি মন্ত্রণালয় পর্যায়ের প্রশাসনিক স্তর পর্যন্ত বিস্তৃত। গত মে মাসে রামপুরা থেকে গোয়েন্দা পুলিশের হাতে আটক একটি চক্রের সদস্যরা প্রমাণ করেছে যে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মচারীদের সহায়তায় বদলি-পদায়নের একটি সংগঠিত নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। এই চক্রটি কর্মকর্তাদের বায়োডাটা আদান-প্রদান করে ঘুষ লেনদেন করছিল। অর্থাৎ, পুলিশে যে পরিবর্তনের সুর শোনানো হয়েছিল, তার নিচে সক্রিয় রয়েছে আরও শক্তিশালী দুর্নীতির এক ‘সমান্তরাল অর্থনীতি’।
জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি ও নির্যাতনের ধারা
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশেও থানা পর্যায়ে হেফাজতে নির্যাতনের ঘটনা থেমে নেই। গত নভেম্বরে নেত্রকোনা সদর থানায় এবং ডিসেম্বরে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ থানায় পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) অনুসন্ধানে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩ থাকা সত্ত্বেও পুলিশ কেন এমন অপরাধ থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না?
এর মূল কারণ, জবাবদিহিতার অভাব। প্রমাণিত অপরাধের ক্ষেত্রেও অধিকাংশ সময় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে কেবল সাময়িক বরখাস্ত বা বদলিকেই বেছে নেওয়া হয়। স্থায়ী বিচার বা কঠোর শাস্তির নজির না থাকায় পুলিশ সদস্যদের মধ্যে অপরাধ করার প্রবণতা কমছে না। সিলেটে রায়হান হত্যার মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনার মূল অভিযুক্তদের বিচার প্রক্রিয়া আজও ঝুলে আছে। সাবেক আইজিপি বাহারুল আলম এ বিষয়ে বলেন, “পুলিশ সংস্কারের শর্ত ছিল রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা বর্তমানে এর কোনো ইতিবাচক আলামত দেখছি না। যা ঘটছে তা সবই আগের মতো রাজনৈতিক প্রভাব থেকেই।”
জনগণের আস্থা ও কাঠামোগত সংকট
পুলিশ সংস্কার কমিশনের করা জনমত জরিপ থেকে একটি চাঞ্চল্যকর পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে—প্রায় ৮৮ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ মনে করেন, পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা সবচেয়ে জরুরি। জনগণ আর কোনো দলীয় পুলিশ দেখতে চায় না। কিন্তু বর্তমানের পরিস্থিতি বলছে, বড় বড় সংস্কারের বদলে ছোট ছোট বদলিতেই সীমাবদ্ধ থাকছে পুরো প্রক্রিয়া। সাবেক আইজিপি নূরুল হুদার মতে, পুলিশের ওপর রাজনৈতিক চাপ যেভাবে চলছে, তাতে পুলিশ এখন আগের চেয়েও বেশি অস্থির।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ১২১টি প্রস্তাবের মধ্য থেকে ১৩টি বাছাই করলেও, স্বাধীন কমিশন গঠনের মতো মূল চাবিকাঠিটি এখনো আলোচনা ও মতবিরোধের বেড়াজালে আবদ্ধ। পুলিশের নিয়োগ-বাণিজ্য রোধে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের সুপারিশ করা হলেও মাঠপর্যায়ে এর কোনো কার্যকারিতা দেখা যাচ্ছে না। বরং নিয়োগ ও পদোন্নতির জন্য অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের তদবির ও প্রভাবশালী মহলের সাথে লবিং করার খবর গণমাধ্যমে আসছে।
পরিবর্তনের পথে বাধা কোথায়?
পুলিশের এই অস্বচ্ছতা ও জবাবদিহিহীনতার মূল কারণ রাজনৈতিক নেতৃত্বের সদিচ্ছার অভাব। বিপ্লব হয়েছে, সরকার বদল হয়েছে, পুলিশের নেতৃত্বেও পরিবর্তন এসেছে; কিন্তু পুলিশের প্রতি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়নি। পুলিশকে কি কেবল রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে, নাকি আইনের সেবক হিসেবে গড়ে তোলা হবে—এই সিদ্ধান্তটিই এখন স্পষ্ট নয়। সংস্কারের নামে যা ঘটছে, তা যদি কেবল পুরনো পদ্ধতির নবরূপায়ণ হয়, তবে তা ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে।
পুলিশ সংস্কার কেবল কয়েকটি পদোন্নতি বা বদলি আদেশের সমষ্টি নয়; এটি একটি জাতির নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য অঙ্গীকার। সংস্কারের নামে যদি কেবল চশমা বদলে পুরনো খোলসটিকে টিকিয়ে রাখা হয়, তবে তা হবে জুলাই বিপ্লবের ত্যাগের সঙ্গে প্রতারণা। বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ পুলিশকে কেবল একটি রাষ্ট্রীয় বাহিনী হিসেবে নয়, বরং নিজের সুরক্ষক হিসেবে দেখতে চায়। আর তা সম্ভব হবে যখন পুলিশ তার সব ধরণের রাজনৈতিক পরিচয় ঝেড়ে ফেলে কেবল সংবিধান ও আইনের অনুগত হবে।
পুলিশ সংস্কারে আর সময়ক্ষেপণ করার সুযোগ নেই। স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন, স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ এবং হেফাজতে নির্যাতনের মতো অমানবিক কর্মকাণ্ডের জন্য দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধানই পারে পুলিশকে প্রকৃত অর্থে ‘জনবান্ধব’ করতে। সরকার যদি পুলিশকে সত্যি জনবান্ধব করতে চায়, তবে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের ওপর রাজনৈতিক চাপ কমিয়ে তাদের পেশাগত স্বাধীনতা দিতে হবে। নতুবা, এই সংস্কারের গল্পও ভবিষ্যতে কেবল ব্যর্থতার ইতিহাস হিসেবেই গণ্য হবে। পুলিশ বাহিনীকে নতুন করে খোলস বদলে নতুন রূপে সাজিয়ে তোলার এটাই মোক্ষম সময়, অন্যথায় রাষ্ট্র তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভটি হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।
তথ্যসূত্র: নয়া দিগন্ত