• শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ১২:১৯ পূর্বাহ্ন

আট পরিত্যক্ত বিমানবন্দর চালুর ঘোষণা কেবলই কাগুজে আশ্বাস

Reporter Name / ৪ Time View
Update : শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬

দেশের আটটি পরিত্যক্ত বিমানবন্দর সংস্কার করে দ্রুত পুনরায় সচল করা হবে—বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) শীর্ষ কর্মকর্তাদের মুখ থেকে গত দুই বছর ধরে এমন আশ্বাস বারবার শোনা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, দেশের আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ পর্যটনের বিকাশ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে এই বন্ধ বিমানবন্দরগুলো সচল করার মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। মন্ত্রণালয় ও বেবিচকের নানা হাঁকডাক ও প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরির মধ্যেই আটকে আছে পুরো প্রক্রিয়া; কাজের কোনো বাস্তব অগ্রগতি নেই। এমনকি বিমানবন্দরগুলো সচলের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে কোনো ‘সম্ভাব্যতা যাচাই’ বা কারিগরি জরিপের (টেকনিক্যাল সার্ভে) উদ্যোগও এখন পর্যন্ত নেওয়া হয়নি। ফলে বাজেট নির্ধারণ, রানওয়ের সীমানা পুনর্নির্ধারণ কিংবা নতুন ভূমি অধিগ্রহণের মতো জটিল বিষয়গুলো বহুদূরের পথ হয়েই রয়ে গেছে।

অ্যাভিয়েশন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, সড়কে তীব্র যানজটের বিড়ম্বনা এড়াতে দেশের মানুষ এখন ক্রমবর্ধমান হারে আকাশপথ বেছে নিচ্ছেন, যার ফলে অভ্যন্তরীণ রুটগুলো দিন দিন লাভজনক হয়ে উঠছে। বর্তমানে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ চট্টগ্রাম, সিলেট, কক্সবাজার, যশোর, সৈয়দপুর, বরিশাল ও রাজশাহীর সচল বিমানবন্দরগুলো দিয়ে নিয়মিত ফ্লাইট ওঠানামা করছে। অথচ এর বাইরে দেশের আরও আটটি বিমানবন্দর দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকেই এই বিমানবন্দরগুলোর মধ্যে অন্তত চারটি সংস্কারের পরিকল্পনা শোনা গিয়েছিল। পরবর্তীতে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারও এগুলো চালুর বিষয়ে কয়েক দফা বৈঠক করলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। বর্তমানে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই অচল বিমানবন্দরগুলোর ইস্যুটি নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনায় এসেছে এবং পর্যায়ক্রমে সবকটি চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। তবে বেবিচকের কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী ৫ বছরের মধ্যে অন্তত তিনটি বিমানবন্দর চালু করার একটি প্রাথমিক চিন্তাভাবনা থাকলেও এখন পর্যন্ত কাজের কোনো অগ্রগতি নেই। এমনকি সচল থাকা বরিশাল বিমানবন্দরে পুনরায় ফ্লাইট চালু করতে বিভিন্ন বেসরকারি এয়ারলাইনসের সঙ্গে বেবিচক বৈঠক করলেও কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি。

অ্যাভিয়েশন খাতের আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো বন্ধ বা নতুন বিমানবন্দর চালু করতে হলে সবার আগে একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ সম্ভাব্যতা যাচাই করা বাধ্যতামূলক। সেখানে উড়োজাহাজ ওঠানামার জন্য রানওয়ের পিসিএন (পেভমেন্ট ক্লাসিফিকেশন নাম্বার) কেমন হবে, রুটটি বাণিজ্যিক এয়ারলাইনসগুলোর জন্য লাভজনক হবে কিনা, আশপাশে কোনো নেভিগেশনাল বাধা আছে কিনা, যাত্রী টার্মিনাল ও ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ার নির্মাণে কত ব্যয় হবে এবং মোট কত বাজেটের প্রয়োজন—তার বিস্তারিত হিসাব জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদে (একনেক) উপস্থাপন ও পাস করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কোনো নামগন্ধও নেই। বেবিচকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নীতিনির্ধারকেরা বাস্তব পরিস্থিতি না বুঝেই আকাশকুসুম স্বপ্ন দেখছেন এবং জোর করে বেবিচকের ওপর বিমানবন্দর চালুর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছেন। যেমন সব প্রস্তুতি থাকার পরও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় কক্সবাজার বিমানবন্দরকে এখনো আন্তর্জাতিক রূপ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, ঠিক একইভাবে এই পরিত্যক্ত বিমানবন্দরগুলোও কবে সচল হবে তা নিশ্চিত করে বলা অসম্ভব।

বর্তমানে সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা আটটি বিমানবন্দর হলো—ঈশ্বরদী, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, বগুড়া, শমশেরনগর (মৌলভীবাজার), কুমিল্লা, বাগেরহাট (খানজাহান আলী) এবং পটুয়াখালী। এই বিমানবন্দরগুলো সচল না থাকায় স্থানীয় অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। যেমন হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের বাসিন্দাদের বাধ্য হয়ে দূরবর্তী সিলেট বিমানবন্দর ব্যবহার করতে হচ্ছে, অথচ শমশেরনগর বিমানবন্দরটি চালু হলে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক চিত্র বদলে যেত। কুমিল্লার নেউরা-ঢুলিপাড়ার বিমানবন্দরটি ১৯৯৪ সালে যাত্রীসঙ্কটের কারণে বন্ধ হয়ে যায়। এর পাশে ইপিজেড থাকলেও বিমান যোগাযোগ না থাকায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। একইভাবে লালমনিরহাটে আশির দশকের পর এবং ঠাকুরগাঁওয়ে ১৯৮০ সালের পর থেকে কোনো ফ্লাইট চলেনি। বাগেরহাটের খানজাহান আলী বিমানবন্দরটি ২০১৫ সালে একনেকে অনুমোদন পেয়ে ৪১.৩০ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ ও মাটি ভরাট করা হলেও চারপাশের দেয়াল নির্মাণ ছাড়া এক দশকেরও বেশি সময়ে আর কোনো কাজই হয়নি। অথচ মোংলা বন্দর, মোংলা ইপিজেড এবং সুন্দরবনের পর্যটন শিল্পের বিকাশের জন্য এই বিমানবন্দরটি অত্যন্ত জরুরি।

কুমিল্লা থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, সেখানকার ৭৭ একর জায়গাজুড়ে নির্মিত বিমানবন্দরের রানওয়েতে এখন ঘাস ও লতাপাতা জন্মেছে এবং সীমানা ঘেঁষে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে আবাসিক ভবন ও গরুর খামার। তবে এর মধ্যেও বিমানবন্দরটির সিএনএস প্রকৌশলী নাসির উদ্দিন আহাম্মদ জানান যে, তাদের ডিভিওআর, ডিএমই ও ভিস্যাট প্রযুক্তির মাধ্যমে ভারত, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় ৩০টি উড়োজাহাজকে প্রতিদিন নেভিগেশন সেবা দেওয়া হচ্ছে, যা থেকে বছরে কয়েক কোটি টাকা রাজস্ব আয় হচ্ছে। উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার বগুড়া বিমানবন্দরটি চালু করার জন্য স্থানীয় ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে আকুল আবেদন জানিয়ে আসছেন। বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি সাইরুল ইসলাম জানান, এই অঞ্চল থেকে তেল, পাটজাত পণ্য ও টুপি বিদেশে রপ্তানি হয়, ফলে বিমানবন্দর চালু হলে বিদেশি বিনিয়োগের দুয়ার খুলে যাবে। একইভাবে পাবনার ঈশ্বরদী বিমানবন্দরটি ১৯৬২ সালে ৪৩৬.৬৫ একর জায়গার ওপর চালুর পর ২০১৩ সালে কিছুদিনের জন্য সচল হলেও পরের বছরই বন্ধ হয়ে যায়। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং এই অঞ্চলের বিশাল কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির স্বার্থে ঈশ্বরদী বিমানবন্দরটি আবার সচল করার দাবি এখন গণদাবিতে পরিণত হয়েছে।

টেকনিক্যাল দিক থেকে এই পরিত্যক্ত বিমানবন্দরগুলোর প্রধান সমস্যা হলো এদের রানওয়ের দৈর্ঘ্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বা পাকিস্তান আমলের হালকা বিমানের উপযোগী এই রানওয়েগুলোর দৈর্ঘ্য মাত্র ৪ থেকে ৫ হাজার ফুটের মধ্যে। কিন্তু বর্তমানে অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলকারী আধুনিক এটিআর বা ড্যাশ-৮ বিমান ওঠানামার জন্য ন্যূনতম সাড়ে পাঁচ হাজার থেকে সাড়ে ছয় হাজার ফুট রানওয়ে প্রয়োজন। ফলে রানওয়ে সম্প্রসারণ করতে হলে সরকারকে নতুন করে বিপুল পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। এছাড়া আধুনিক ডিভিওআর, আইএলএস এবং উন্নত এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ার স্থাপন না করলে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (আইকা)-র অনুমোদন পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এর ওপর বড় সংকট হলো, পরিত্যক্ত বিমানবন্দরগুলোর বিশাল জমি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল ও অবৈধ দখলদাররা গ্রাস করে নিয়েছে। কোথাও গড়ে উঠেছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, আবার কোথাও বসতঘর বানিয়ে মানুষ বসবাস করছে, যা উচ্ছেদ করতে বেবিচককে বেগ পেতে হচ্ছে।

অবশ্য সম্প্রতি বেবিচকের বোর্ড সভায় এই পরিত্যক্ত বিমানবন্দরগুলো সচল করার বিষয়ে কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। বেবিচকের সদস্য (পরিচালনা ও পরিকল্পনা) এয়ার কমোডর আবু সাঈদ মেহবুব খান জানান, আটটি বিমানবন্দর সচল করার প্রাথমিক উদ্যোগ হিসেবে এগুলো আসলে বাণিজ্যিক বিমান পরিচালনার জন্য কারিগরি ও অর্থনৈতিকভাবে উপযোগী কি না, সে বিষয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে। এরপর একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে এবং বাজেট অনুমোদন সাপেক্ষে কাজ শুরু হবে। সার্বিক বিষয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক বলেন, “আমরা পরিত্যক্ত বিমানবন্দরগুলো আবার চালু করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছি। এর মধ্যে আমরা উত্তরবঙ্গের বগুড়া বিমানবন্দরকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিচ্ছি এবং রানওয়ের বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করতে আমি নিজে সরেজমিনে পরিদর্শন করেছি। আশা করছি খুব অল্প সময়ের মধ্যে বগুড়া বিমানবন্দরের সংস্কার কাজ শুরু করতে পারব।” তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, সম্ভাব্যতা যাচাই, বাজেট অনুমোদন এবং ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতা কাটিয়ে এই কাগুজে পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ নিতে আরও দীর্ঘ সময় লেগে যাবে।

 

দেশ রূপান্তর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category