• শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ১২:২১ পূর্বাহ্ন

ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের ঘোষণা শেখ হাসিনার

রয়টার্স / ৩ Time View
Update : শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬
ডিসেম্বরে দেশে ফিরব, দলের নেতাদের সঙ্গে আদালতে আত্মসমর্পণ করব: রয়টার্সের কাছে দাবি হাসিনার

ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক নাটকীয় ও উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ রাজনৈতিক ঘোষণা দিয়েছেন। ভারতের নির্বাসন থেকে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক বিশেষ টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, আগামী ডিসেম্বর মাসের দিকে তিনি এবং তাঁর দলের শীর্ষ নেতারা স্বদেশে ফিরে আসবেন এবং আদালতের কাছে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করবেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার নজিরবিহীন গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর এই প্রথম তিনি প্রকাশ্যে তাঁর দেশে ফেরার সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করলেন। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যেখানে তাঁর দল আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেছে এবং দেশের আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছে, সেই বৈরী পরিস্থিতিতে তাঁর এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের বার্তাটি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে এক প্রচণ্ড আলোড়ন ও নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করেছে।

‘গ্রেপ্তার বা মৃত্যু হলেও আমি যাবই’

রয়টার্সের সাথে প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী দীর্ঘ ফোনালাপে ৭৮ বছর বয়সী এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী নিজের জীবনের চরম ঝুঁকির কথা স্বীকার করেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আমি দেশে ফিরলে তারা আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে, এমনকি তারা আমাকে মেরেও ফেলতে পারে”। কিন্তু তা সত্ত্বেও দেশে ফেরার বিষয়ে নিজের অনড় অবস্থানের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “তবুও আমাকে যেতেই হবে”। দেশে ফিরে আসার পেছনে নিজের প্রধান কারণ হিসেবে তিনি বাংলাদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতা-কর্মীদের ওপর চলমান পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেন। শেখ হাসিনা বলেন, “আমার দলের নেতা ও কর্মীরা সেখানে প্রচণ্ড দমন-পীড়নের শিকার হচ্ছে। যদি আমার মৃত্যু আসতেই হয়, তবে আমি চাই তা যেন আমার নিজের মাটিতেই আসে—যে মাটিতে আমার মা-বাবা সমাহিত আছেন এবং যেখানে তাদের রক্ত ঝরেছে”। তিনি আরও নিশ্চিত করেছেন যে, তাঁর এই পরিকল্পিত স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এবং আদালতের মুখোমুখি হওয়ার বিষয়ে ঢাকার বর্তমান কর্তৃপক্ষের সাথে তাঁর কোনো স্তরের যোগাযোগ বা আলোচনা হয়নি।

 ট্রাইব্যুনালের রায় ও আইনি প্রেক্ষাপট

শেখ হাসিনার এই চাঞ্চল্যকর ঘোষণাটি এমন এক সময়ে এলো, যার কিছুদিন আগেই বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) এক ঐতিহাসিক রায়ে তাঁকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও দলীয় ক্যাডারদের দিয়ে রক্তক্ষয়ী ক্র্যাকডাউন চালানো, বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি বর্ষণের নির্দেশ দেওয়া অথবা তা বন্ধ করতে ব্যর্থ হওয়ার দায়ে আদালত তাঁকে এই সর্বোচ্চ সাজা প্রদান করেন। একই রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও মৃত্যুদণ্ড এবং সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আদালত শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। নির্বাসন থেকে রয়টার্সের কাছে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে শেখ হাসিনা দাবি করেছেন, তিনি আদালতে উপস্থিত হয়ে আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চান এবং দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি তুলবেন।

দলের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে প্রত্যাবর্তনের ছক

সাক্ষাৎকারে জানা যায়, শেখ হাসিনা একাকী নন, বরং ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন প্রবীণ ও শীর্ষ নির্বাসিত নেতাকে সাথে নিয়ে একযোগে বাংলাদেশে প্রবেশ করবেন। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ অন্যান্য আত্মগোপনে থাকা নেতারাও এই ডিসেম্বর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে একসাথে আদালতে গিয়ে আত্মসমর্পণ করতে পারেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি আওয়ামী লীগের একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক জুয়া বা ‘হাই-স্টেকস পলিটিক্যাল গ্যাম্বিট’। দলটির লক্ষ্য হলো, শীর্ষ নেতাদের একসাথে আদালতে দাঁড় করিয়ে আইনি প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতাকে বৈশ্বিক দরবারে চ্যালেঞ্জ করা এবং একই সাথে গত দুই বছর ধরে চরম কোণঠাসা ও আত্মগোপনে থাকা দলীয় তৃণমূল কর্মীদের মাঠের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হওয়ার একটি বার্তা দেওয়া।

ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সমীকরণ

শেখ হাসিনার দীর্ঘস্থায়ী নির্বাসন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বিশাল বড় কাঁটা বা অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ঢাকা বারবার নয়াদিল্লির কাছে শেখ হাসিনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যর্পণ বা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে আসছিল, যা নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে এক ধরণের শৈত্যপ্রবাহ দেখা দেয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, শেখ হাসিনা যদি আগামী ডিসেম্বরে নিজেই স্বেচ্ছায় বাংলাদেশে ফিরে আসেন, তবে তা দিল্লির ওপর থেকে এক বিশাল কূটনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাপ লাঘব করবে। তবে অন্যদিকে, এই প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের বৈশ্বিক বাজার রক্ষা এবং গত দুই বছরের অস্থিতিশীলতা কাটিয়ে দেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার যে চেষ্টা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার করছে, তাতে নতুন করে তীব্র মেরুকরণ ও বিভাজনের জন্ম দিতে পারে।

মাঠের রাজনীতি ও আগামী দিনের অনিশ্চয়তা

বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ এবং গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতারা সাবেক প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণাকে কীভাবে গ্রহণ করবেন, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হতে শুরু করেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একাংশ তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছে, গণহত্যার প্রধান আসামিকে বাংলার মাটিতে স্বাগত জানানো হবে কেবলই ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলানোর জন্য, কোনো রাজনৈতিক পুনর্বাসনের জন্য নয়। অন্যদিকে, দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী এই বিষয়টিকে সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করছে।

ডিসেম্বর মাস বাংলাদেশের জন্য বিজয়ের মাস। এই ঐতিহাসিক মাসেই দীর্ঘ দুই বছরের প্রবাস জীবন শেষে দেশের সবচেয়ে দীর্ঘ মেয়াদের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী যখন আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর উদ্দেশ্যে পা রাখবেন, তখন দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দেওয়া প্রশাসনের জন্য হবে এক অগ্নিপরীক্ষা। রয়টার্সের এই এক্সক্লুসিভ নিউজটি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, বাংলাদেশের ক্ষমতার মঞ্চ থেকে বিদায় নিলেও শেখ হাসিনা নিজেকে এখনই ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলতে রাজি নন, বরং বিজয়ের মাসেই তিনি দেশের মাটিতে এক চূড়ান্ত আইনি ও রাজনৈতিক মহানাটকের অবতারণা করতে চলেছেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category