প্রকৃতির রুদ্ররোষে ক্ষতবিক্ষত নেপালের পাহাড়ি জনপদে সময় যত গড়াচ্ছে, নিখোঁজ মানুষদের জীবিত উদ্ধারের ক্ষীণ আশাটুকুও ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে| অবিরাম ভারী বর্ষণ, বিধ্বংসী বন্যা এবং তীব্র পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত হওয়া এলাকাগুলোতে এখন কেবলই স্বজনহারা মানুষের বুকফাটা আর্তনাদ| জীবিত উদ্ধারের আশা ছেড়ে দিয়ে বহু পরিবার এখন বাধ্য হয়ে নদীর পাড়ে শেষকৃত্যের প্রতীকী আচার বা ‘নারায়ণবালি’ পালনে সমবেত হচ্ছেন| নদীর তীরে সারি সারি লাল শাড়ি ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার উপকরণ সাজিয়ে প্রিয়জনের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনায় চোখের জলে আনুষ্ঠানিকতা সারছেন স্বজনেরা| প্রকৃতির এমন ধ্বংসযজ্ঞের সামনে মানুষ কতটা অসহায়, তা এই দৃশ্যগুলোতে অত্যন্ত নির্মমভাবে ফুটে উঠেছে|
এই ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ চলমান দুর্যোগের সঙ্গে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ যোগসূত্র জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন| তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, হিমালয় অঞ্চলে ঘন ঘন এবং অতিমাত্রায় পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যা আঘাত হানার বিষয়টি কোনো বিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক ঘটনা নয়| এটি মূলত বিশ্বজুড়ে দ্রুত বদলে যাওয়া জলবায়ুর এক অত্যন্ত বিপজ্জনক ও গুরুতর সংকেত| তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে হিমালয় সংলগ্ন দেশগুলোতে পরিবেশগত বিপর্যয় ও জীবনহানির ঝুঁকি আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে গেছে এবং এই সত্যটি উপলব্ধি করার সময় এখনই| জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ শিকার হয়ে নেপাল যে মানবিক ও অবকাঠামোগত সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, তা বিশ্বমঞ্চে আরও বলিষ্ঠভাবে তুলে ধরার তাগিদ দেন তিনি|
উদ্ভূত এই জরুরি পরিস্থিতিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও বহু আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা নেপালের দুর্গত মানুষের পাশে এসে দাঁড়ালেও মাঠপর্যায়ের উদ্ধার তৎপরতা এক চরম অচলাবস্থার মুখে পড়েছে| পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসের কারণে দেশটির প্রধান মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সংযোগ সড়কগুলো ধসে পড়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে| বহু ত্রাণবাহী ট্রাক ও পিকআপ সামগ্রী নিয়ে দুর্গত অঞ্চলের উদ্দেশে রওনা দিলেও ভাঙাচোরা ও বিধ্বস্ত সড়কের কারণে তারা মাঝপথেই আটকে পড়ছে| বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও অতি দুর্গম পাহাড়ি গ্রামগুলোতে সড়কপথে খাদ্য, সুপেয় পানি ও জরুরি ওষুধ পৌঁছানো কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না| বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এই অঞ্চলগুলোতে যোগাযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করাই এখন উদ্ধারকারী দলগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে|
সড়কপথে সহায়তা পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়ায় আকাশপথে হেলিকপ্টার ব্যবহারের বিকল্পটি সামনে এলেও তার কার্যকারিতা অত্যন্ত সীমিত| প্রতিকূল আবহাওয়া, পাহাড়ি বৈরী বাতাস এবং দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে বড় পরিসরে মানুষকে উদ্ধার করা যাচ্ছে না| একই সঙ্গে আকাশপথে যে সামান্য পরিমাণ খাদ্য ও সামগ্রী ফেলা সম্ভব হচ্ছে, তা চাহিদার তুলনায় সাগরে এক ফোঁটা বারিবিন্দুর মতো| সার্বিক ত্রাণ তৎপরতায় এই মারাত্মক ঘাটতির কারণে দুর্যোগকবলিত এলাকাগুলোতে বেঁচে থাকা হাজার হাজার মানুষ এখন খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় উপকরণের চরম সংকটে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন| অবিলম্বে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো মেরামত করে জরুরি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে, এই বন্যা ও ভূমিধসের পরবর্তী ধাপে অনাহার ও পানিবাহিত রোগের কারণে নেপালে আরেকটি ভয়াবহ মানবিক ট্র্যাজেডি নেমে আসার তীব্র আশঙ্কা তৈরি হয়েছে|